Saturday, May 16, 2020

সঙ্গীহীন

~এক~
উনত্রিশ বছর বয়সে বিয়েটা ভাঙার পরে মোহন আর বিয়ে করার চেষ্টা করেননি। পাঁচ বছরের প্রেমের পরেও সব বন্ধু, সব আত্মীয় যে বিয়েকে রাজযোটক বলেছিলেন, সে বিয়ের অমন পরিণতি হবে কে ভেবেছিল? বিয়ের আগেও দু-জনের নিত্য ঝগড়া হত। বিয়ের পরেও ছবিটা বদলায়নি মোটেই। একই রকম ঝগড়া মারামারি হয়েছে, শুধু এবারে তাতে যোগ দিয়েছেন মোহনের মা আর ভাই, আর মোহিনীর বাড়ির অজস্র আত্মীয়স্বজন। যেটা মোহনের খুব খারাপ লাগত, তা হল এই, যে মা-ও মোহিনীর হয়েই বলতেন। ওরও যে কোনও দোষ থাকতে পারে, মা মানতেন না। মোহন নিজে শুনেছিলেন মা মোহিনীকে বলছেন, “ওর বাবা আমাকে সারা জীবন জ্বালিয়েছে। আমি প্রথম দিকে অনেক চেষ্টা করেছিলাম, কিন্তু কোনও তফাতই হয়নি। মেরে মেরে কিছু রাখত না আর। এখন দেখছি যেমন বাবা, তেমনি ছেলে। এখনও গায়ে হাত তুলেছে? না হলেও... কোনও দিন গায়ে হাত দিতে দিবি না...”
মারতে চেষ্টা করেছিলেন মোহনও। কিন্তু প্রথম চড়টা মারার সঙ্গে সঙ্গে মোহিনী হাতে কাপড় কাটার কাঁচি তুলে নিয়ে বলেছিল, “এসো, দেখি, কার গায়ে কত জোর...” তারপর থেকে আর মারধর করেননি। কিন্তু কথা শোনাতে ছাড়েননি। কোনও ভাবেই বউকে বাগে না পেয়ে গালাগালি, অপমান আর কটূক্তিতে ভরিয়ে দিয়েছেন দুজনের নির্জন মুহূর্ত।
একদিন সত্যিই চলে গিয়েছে মোহিনী। মোহনের হাজার ধমকানি, অনুরোধ, কাকুতি মিনতি আটকাতেও পারেনি, ফিরিয়েও আনতে পারেনি ওকে। মোহন গিয়েছিলেন শ্বশুরবাড়ি। শ্বশুরমশাই দরজা থেকে বের করে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, ভবিষ্যতে যদি কখনও আবার আসার চেষ্টা করে, তাহলে ফল ভালো হবে না। বলেছিলেন পার্ভার্ট কোথাকার।
কিছুদিন পরে বাড়িতে একটা কোর্টের নোটিস এসেছিল। কী লেখা ছিল মোহন অত বোঝেননি। মা, বা ভাই তো আরও কম বোঝে। হঠাৎ ১৪৪ ধারা? সে তো কার্ফু-টার্ফু হলে কাগজে লেখা থাকে। দু-দিন আরও অপেক্ষা করে, মোহিনীকে অজস্র ফোন করে, মেসেজ লিখে যখন বুঝলেন সবই ব্লক করা, তখন একদিন গিয়ে হাজির হয়েছিলেন মোহিনীর অফিসে। আর তখনই জানতে পেরেছিলেন, ১৪৪ ধারা কাকে বলে। থানায় গিয়ে। অফিসার বেশ ভদ্রলোক ছিলেন। বলেছিলেন, উনি চাইলে তখনই মোহনকে অ্যারেস্ট করে হাজতে রাখতে পারেন। কিন্তু ছেড়ে দিয়েছিলেন। বলেছিলেন, আর কোনও দিন যেন মোহিনীকে কোনওভাবেই বিরক্ত না করে।
বিয়ে করা বউকে কাছে চাওয়া বিরক্ত করা হল? আর মোহিনী যে সারা পাড়ার পুরুষদের সঙ্গে প্রেম করত? মোহনের ভাইয়ের দিকেও আড়চোখে তাকায়? তাকে শাসন করা যাবে না? মোহনের মাথায় ঢোকে না। তবে এর পরে আর বেশিদিন বউ থাকেনি। ডিভোর্স চেয়ে আদালতে গেছে। মোহনের উকিল লড়তে চেয়েছিলেন। শুধু ডোমেস্টিক ভায়োলেনস বললে একরকম – ওসব মোহন যুক্তি দিয়ে উড়িয়ে দিতেন। কিন্তু ওকে মানসিক রোগী এবং সহবাসে অক্ষম বলে অভিযোগ করেছে মোহিনী - সেটা যেদিন জানতে পেরেছেন, সেদিন থেকে লড়াইয়ের ইচ্ছে চলে গিয়েছিল মোহনের। “যথেষ্ট হয়েছে, যেতে দিন,” বলেছিলেন উকিলকে।
উকিল বলেছিলেন, “আপনার কপাল ভালো টাকাকড়ি চাননি।”
মোহন জানতেন কেন অর্থ দাবী করেনি মোহিনী। শুধুমাত্র মোহনের দেবার ক্ষমতা নেই বলে নয়। সাত তাড়াতাড়ি বিয়েটা চুকিয়ে দিয়ে প্রেমিকের সঙ্গে নতুন সংসার করার তাগিদেই। তবে যতদিন খবর রেখেছিলেন, মোহিনী আর বিয়ে করেনি। কেন, সেটা আজও মোহন মাঝে মাঝে ভাবেন।
~দুই~
মোহন নিজেও তারপর থেকে একা। নারী তাঁর জীবনে আসেনি এমন না, কিন্তু কারওর সঙ্গেই তিনি জীবন কাটাবেন বলে এগোননি, এবং শুরুতেই সে কথা পরিষ্কার বলেছেন। দেখতে দেখতে শুরু হয়েছে কথা কাটাকাটি, ঝগড়া গালাগালি, এবং সুযোগ পেলেই হাতের সুখ করেছেন মোহন। মোহিনীর মতো কেউ রুখে দাঁড়ায়নি। অনেকে তো অকথ্য মার খেয়েছে - যতদিন না অসহ্য হয়েছে বলে চলে গিয়েছে। এরা কেউ মোহিনীর মতো মোহনের সম-স্টেটাসের নয়। হিসেব করে মোহন বেছে নিয়েছেন তাদের, যারা রুখে দাঁড়াবার আগে দু-বার ভেবে দেখবে।
যা-ই হোক, সম্পর্ক টেঁকেনি কারওর সঙ্গেই। তাই মোহন একা। মাকেও ত্যাগ করেছিলেন ডিভোর্সের পর থেকেই। মনে হয়েছিল মা-ই মোহিনীকে তাতিয়েছিলেন ছেড়ে চলে যেতে। আজ মা নেই, কিন্তু ভাইয়ের সঙ্গেও যোগাযোগ নেই। ভাই বোধহয় ইংল্যান্ডে - ইউরোপেও হতে পারে।
তাই যখন ম্যারিয়ট হোটেলের কনভেনশনে নাম লেখাতে গিয়ে মেয়েটাকে প্রথম দেখেছিলেন, তখন কিছুই তেমন মনে হয়নি। আজকের মোহন সেই প্রথম জীবনের মোহন নেই। আজ মোহনকে লোকে এম-পি বলে। সামনাসামনি বলে এমপি-স্যার। স্বীয় মহীমায় আজ মোহন উজ্জ্বল। লোকে মানে যে ভদ্রলোকের ব্যক্তিগত জীবন যেমনই হোক, কর্মক্ষেত্রে যে কার্যদক্ষতা দেখিয়েছেন, যে পর্যায় থেকে ক্রমান্বয়ে উন্নতির ফলে যেখানে পৌঁছেছেন, সাতচল্লিশ বছর বয়সে খুব কম লোকই পেরেছে এদেশে। ফলে কোথাও যদি মোহনের লেকচার থাকে, সেখানে অনেক লোকেরই ভীড় হয়।
আজ অবশ্য মোহন লেকচার দিতে আসেননি। এসেছেন বিশিষ্ট অতিথির আসন আলো করতে। আজকের অনুষ্ঠানে তিনজন বিশেষ অতিথি। তার মধ্যে মোহনের নজর কেবল লীলা চায়নাস-এর দিকে। গত পাঁচ বছরে তাঁর একটাই উদ্দেশ্য... লীলার সঙ্গে একটা বিজনেস ডিল নামিয়ে ফেলা... গত পাঁচ বছর ধরে মোহন এমন কোনও অনুষ্ঠান, মিটিং, বা কনভেনশন মিস করেননি যেখানে লীলা গিয়েছেন। কিন্তু হাজার চেষ্টাতেও লীলার সঙ্গে দুটো মিনিট আলাদা কথা বলতে পারেননি। আজ একটা সলিড অ্যাটেম্পট নিতে হবে।
মোহনের নজর ছিল যে দরজা দিয়ে লীলাকে এস্কর্ট করে হলের ভেতরে নিয়ে যাওয়া হচ্ছে, সেদিকে। তাই যে মেয়েটা ওঁর হাতে কলম দিয়ে, “স্যর, প্লিজ সাইন হিয়ার,” বলে জায়গাটা দেখিয়ে দিয়েছে, তার দিকে তাকাননি। লীলা হলে ঢুকে যাবার পরে দেখলেন মেয়েটা ওঁর কোটের লেপেলে একটা ব্যাজ লাগাচ্ছে। মনটা ওদিকেই ছিল, তাই খেয়াল করলেন না, যে মেয়েটার হাতটা কোটের ভেতরে যেন একটু বেশিক্ষণই বুকের সঙ্গে লেগে রইল। তারপরে রুপোলি রাংতা-মোড়া একটা গোলাপফুল হাতে দিয়ে বলল, “প্লিজ, স্যর, এ দিকে।” বলে অন্য হলের অন্য দরজাটার দিকে এগিয়ে গেল।
হাতে গোলাপফুল, কনফারেনস ফাইল, ব্যাগ-ট্যাগ নিয়ে যখন দরজায় এসে পৌঁছলেন, তখন মেয়েটা দরজা খুলে দাঁড়িয়ে। এগিয়ে এসে হাত থেকে ফাইল আর ব্যাগটা নিয়ে বলল, “স্যরি স্যর, আসুন।” বলে আবার দরজাটা খুলে দাঁড়াল। দরজা দিয়ে ঢুকেই দুটো সিঁড়ি নামতে হয়। হাত বাড়িয়ে মোহনের হাত ধরে বলল, “সাবধানে নামবেন, স্যর।” মোহন খেয়াল করলেন, মেয়েটার হাতটা খুব নরম আর ঠাণ্ডা। মনে হল, আহ, এই হাতটা যদি অনেকক্ষণ ধরে থাকতে পারতাম...
হলে ঢুকে দেখলেন লীলা তখনও সিটে পৌঁছতে পারেননি। সঙ্গিনীর দিকে নজর দিলেন আবার। বুকের আঁচলে নেম-ট্যাগ। বললেন, “থ্যাঙ্ক ইউ, লিসা।”
মেয়েটা চট করে চোখ নামাল নিজের বুকের দিকে। স্লিভলেস ব্লাউজের ওপর দিয়ে সাবধানে টানটান করে লুকোনো সেফটিপিনে এঁটে রাখা শাড়ির আঁচল। কোথাও কিছু দেখা যাচ্ছে না, তবু মোহন তলপেটে উত্তেজনার টগবগানি অনুভব করলেন। লিসা হাসল, দাঁতগুলো কী সুন্দর। বলল, “আমার নাম মোনালিসা।”
একটা ভুরু তুলে মোহন বললেন, “তবে লিসা লেখা কেন?”
একটু অভিমানী ঠোঁট উলটে লিসা বলল, “মা-বাবা মোনালিসা নাম রেখেছিল। ভীষণ বোকাবোকা। বাঙালি মেয়ের নাম মোনালিসা হবে কেন?”
বলতে বলতে মোনালিসার দৃষ্টি চলে গিয়েছিল মোহনের মাথা পেরিয়ে। ঘুরে দেখেছিলেন, লীলা চায়নাস কথা বলতে বলতে প্রায় এসে গিয়েছেন। ওঁর সঙ্গেও স্লিভলেস ব্লাউজ এবং মোনালিসার মতো একই রঙের শাড়ি পরা আর একটি মেয়ে, আর, লীলা চায়নাস বলেই উদ্যোক্তাদের প্রায় সকলেই একই সঙ্গে হেঁটে আসছেন।
এম-পি-স্যারকে অভ্যর্থনা জানানোর জন্য কেউ ছিল না, সেটা বুঝতে পেরে উদ্যোক্তারা একটু হকচকিয়ে গিয়েছেন, সেই ফাঁকে মোহন নিজেই পরিচয় করে নিলেন লীলার সঙ্গে। দুজনে ভিজিটিং কার্ড আদানপ্রদান করলেন, মোহন বললেন, “আমি অনেক দিন ধরেই চেষ্টা করছি আপনার সঙ্গে দেখা করার, কিন্তু আমার দুর্ভাগ্য, হয়ে ওঠেনি।”
মেকি আন্তরিকতায় লীলা বললেন, “ও, মা! তাই নাকি! ছিছি, কেন বলুন তো?”
কনফারেনসে এসেই, পরিচয়পর্ব সমাধা হতে না হতেই বিজনেসের কথা মোহন বলবেন না, তাই বললেন, “তার সময় পরে হবে। বসুন। আপাতত কনফারেনস তো শুরু হোক...”
ঘাড় ঘুরিয়ে দেখলেন লীলার সঙ্গের মেয়েটি, আর মোনালিসা, দুজনেই একই সঙ্গে বেরিয়ে যাচ্ছে হল থেকে। ওদের দায়িত্ব বোধহয় শেষ হয়েছে।
সারা দিনই দফায় দফায় দেখা হল মোনালিসার সঙ্গে। বিশেষ অতিথির সম্বর্ধনার সময়ে এসকর্ট করা, টি-ব্রেক, এবং লাঞ্চ-এর সময়ে চা, প্লেট, খাবার এগিয়ে দেওয়া, এমনকী বিদায়ের সময়েও ব্যাগ ইত্যাদি বয়ে নিয়ে গাড়িতে তুলে দেওয়া, সব সময়েই মোনালিসা-রা তাদের যার যার গেস্টদের সঙ্গে রইল। বুদ্ধি করে লীলা বেরিয়ে যাবার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই ব্যাগ তুলে বাইরে রওয়ানা দিয়েছিলেন মোহন। তাই উদ্যোক্তারা সকলে এগিয়ে গিয়েছিল লীলা চায়নাস-এর সঙ্গেই। উনি একাই হাঁটছিলেন মোনালিসার পাশে, বাইরে বেরোনর লম্বা করিডোর ধরে।
জানতে পেরেছিলেন, মোনালিসা কোথায় কাজ করে। জানতে পেরেছিলেন, মাইনে ভালো না। জানতে পেরেছিলেন, ভালো মাইনের কাজ পেলে মোনালিসা নতুন কাজে জয়েন করতে রাজি। চট করে নিজের ভিজিটিং কার্ড বের করে দিয়ে বলেছিলেন, “কালই ফোন করবে আমাকে। দেখি তোমার কী ব্যবস্থা করা যায়...”
~তিন~
করেছিলেন। সবরকম ব্যবস্থা করেছিলেন। শুধু একটা ব্যবস্থাই করতে পারেননি। মোনালিসাকে নিজের বাড়িতে নিয়ে আসতে পারেননি। নিজেকেই যেতে হয়েছিল ওর বাড়িতে থাকতে। বাড়ি বলতে একটা আট-ফ্ল্যাটের বাড়ির ছাদে একটা এক-কামরার ফ্ল্যাট। মোহনের নিজের যে কটা ফ্ল্যাট আছে, কোনওটাই তিন হাজার স্কোয়ার ফিটের কম নয়। কিন্তু মোনালিসা শুনতেই চায়নি। বলেছিল, ওর পোষাবে না। অগত্যা মোহনকেই এসে উঠতে হয়েছে মোনালিসার বাড়িতে। তবে পাকাপাকিভাবে না। সপ্তাহে দু-তিন দিন।
আর সেই সঙ্গে শুরু হয়েছে সন্দেহ আর ঝগড়া। মোনালিসা কেন থাকবে না মোহনের বাড়িতে? কেন রোজ নিজের বাড়িতেই শুতে হবে? মোহন যখন বাইরে যান, তখন মোনালিসা কোথায় যায়? কেন কাজ থেকে ফিরতে দেরি হল? একঘণ্টা লেগে যাবার তো কথা নয়, ইত্যাদি।
মেরেছেন। প্রায় অকারণে। কিন্তু মোনালিসাকে মারা যায় না। এমনভাবে তাকায়, যে মোহনের সব রাগ জল হয়ে যায়। আর তারপরে মোনালিসা আস্তে আস্তে ওর জামা খুলতে থাকে। তারপরে নিজেকে সম্বরণ করা কঠিন হয়। রাগ পড়ে গেলে, প্রেম আরও জমে ওঠে।
মোহন মানতে বাধ্য হন যে মোনালিসাকে সন্দেহ করা কঠিন। ওর চলাফেরা, হাবভাব, কোথাও বেচাল নেই। পথে-ঘাটে, রেস্টুরেন্টে, সঙ্গীতানুষ্ঠানে, নাটকে-সিনেমায়, পার্টিতে কোথাও কখনও মোহনের পাশ থেকে কোথাও চলে যায়নি, কখনও দেখেননি চোখ তুলে বা আড়-চোখেও অন্য কোনও পুরুষের দিকে তাকাতে। কখনও কোনও বড়ো পার্টিতে মোহন যদি বা ওকে রেখে গেছেন কোথাও, ওখান থেকে নড়েনি। অন্য পুরুষ ওর সঙ্গে হেসে কথা বলতে এলে কখনও দেখেননি প্রত্যুত্তরে হেসেছে। গম্ভীর মুখে মাথা নিচু করে সরে গেছে অন্য কোথাও। কখনও যে সময় বলে বেরিয়েছে, তার চেয়ে এক মিনিটও দেরি করেনি ফিরতে। গত কয়েক মাস ধরে মোহনের মনে মনে একটা অদ্ভুত চিন্তা ঘুরপাক খাচ্ছে - যে রকম চিন্তা পনেরো বছরে একবারের জন্যও আসেনি ফিরে। মোনালিসাকে বিয়ে করে সংসার করার চিন্তা।
ওকে বলেননি কিছুই। এখনও ওর সমন্ধে জানার অনেক বাকি আছে। ওর অতীতটা এখনও ভালো করে জানেন না। অনেক জিজ্ঞেস করেও জানতে পারেননি মা-বাবার কথা। শুধু জানেন, মাসে একটা রবিবার ও যায় মা-বাবার সঙ্গে কাটাতে। কোথায় যায়, কী ভাবে যায়, কিছু বলে না। শুধু দেখেন, সে দিনটা শাড়ি পরে না, আটপৌরে সালোয়ার কুর্তা পরে যায়, দোপাট্টা জড়ায় যত্ন করে, মেক-আপ লাগায় না - এমনকী একটু লিপস্টিক-ও দেয় না ঠোঁটে, হিল তোলা জুতো পরে না... ট্যাক্সি ডাকে না, রাস্তার মোড়ে অটোর লাইনে দাঁড়ায়। সারাদিন থাকে না। ওই একদিন-টা নিয়েও ঝগড়া করেছেন মোহন। অনেকবার। কিন্তু কেন জানি, ঝগড়ায় জোর পাননি। আর মোনালিসা ফিরে ঝগড়া করেনি। শুধু আড়চোখে চেয়ে লাস্যময়ী ভঙ্গীতে সালোয়ারটা খুলে পেছন ফিরেছে যাতে মোহন দেখতে পান কী ভাবে হাত তুলে ব্রা-র হুক খুলছে মোনালিসা। ভঙ্গীটার কথা ভাবলেই উত্তেজনা অনুভব করেন মোহন। আজও করলেন।
আজ সেই রবিবারের সকাল। মোনালিসা নেই। কালচে সবুজ রঙের কামিজ আর গাঢ় লাল সালোয়ারটা পরে বেরিয়ে গেছে নিয়মমতো, সকাল সাতটায়। মন দিয়ে লক্ষ করেছেন মোহন। বাড়ি থেকে বেরিয়ে যাবার পর জানলায় দাঁড়িয়ে থেকেছেন। তবে আজ অন্য কারওর জন্য। মোনালিসার পেছন পেছন পান চিবোতে চিবোতে, দুলকি চালে যে মহিলা গিয়ে লাইনে দাঁড়িয়েছে, তাকে মোহন চেনেন। অনেক খুঁজে শেষে নিখিল রক্ষিত প্রাইভেট ডিটেকটিভ এজেনসি-র অফিসে এমন একজন মহিলা ডিটেকটিভের খোঁজ পেয়েছেন মোহন, যে বোকা নয়, এবং যাকে নজরে পড়া কঠিন।
~চার~
কিন্তু পরদিন সকালে মহিলা এসে মোহনের দেওয়া খাম ফিরিয়ে দিল। বলল, “আপনার কাজ কাল উদ্ধার করতে পারিনি স্যার। আমাকে নিখিল স্যার বললেন আপনাকে বিল করা যাবে না।”
মোহনকে খুশি রাখলে পরে অন্য কাজ পাওয়া যেতে পারে। তাই নিখিল রক্ষিত রেজাল্ট দিতে না-পেরে টাকা ফিরিয়ে দিচ্ছে। বললেন, “কী সমস্যা হল?”
মহিলা বললেন, “মনে হয় ধরে ফেলেছিল। অনেকটা রাস্তাই একসঙ্গে যেতে হয়েছে। প্রথমে অটোতে বাসস্ট্যান্ড, তারপরে বাস। অটোতে পাশাপাশিই বসেছিলাম, কিন্তু বাসও ফাঁকা ছিল। আমাকে কাছাকাছি বসতে হয়েছে, ও কোথাকার টিকিট কাটে জানতে। শেয়ালদার টিকিট কেটেছিল। রাস্তা পেরিয়ে নর্থ স্টেশনে গিয়ে টিকিট কাউন্টারে লাইন দিয়েছে। আবার কাছাকাছি থাকতে হয়েছিল কোন স্টেশনের টিকিট কেটেছে জানার জন্য। কাঁচরাপাড়ার টিকিট কাটল। কিন্তু তারপরে আর দেখতে পাইনি। আমি তাড়াতাড়ি গিয়ে পরের ট্রেনেই উঠেছি, কাঁচরাপাড়া পৌঁছে দেখি ওই ট্রেনে আসেনি। তাই আমি স্টেশনের কাছেপিঠে বসে ছিলাম সারা দিন, যদি অন্য ট্রেনে আসে, সেই আশায়। তবে আসেনি।”
মোহন বললেন, “কাঁচরাপাড়ার-ই টিকিট কেটেছে, সে বিষয়ে সন্দেহ নেই?”
মহিলা বলল, “টিকিট কাঁচরাপাড়ারই, তবে নিখিল স্যার বললেন যে ও যদি আগেই আমাকে সন্দেহ করে থাকে, তাহলে হয়ত ভুল টিকিট কেটে আমার চোখে ধুলো দিয়ে ওখানেই কোথাও অপেক্ষা করে আমি চলে যাবার পরে আসল টিকিট কেটেছে?”
মোহন মৃদু হেসে টাকার খামটা নিয়ে ওতে আরও টাকা দিয়ে মহিলার হাতে দিয়ে বললেন, “মিঃ রক্ষিতকে বলবেন, আমার কাজ মিটে গেছে। ইনফরমেশনটা সম্ভবত ঠিক। সুতরাং থ্যাঙ্ক ইউ। বাকি টাকাটা আপনার হাতেই দিয়ে দিলাম। পরে দরকার হলে আবার যোগাযোগ করব, আসুন।”
মহিলা গদগদ স্বরে “থ্যাঙ্ক ইউ, স্যার...” বলতে বলতেই মোহন টেবিলের নিচের কলিং বেলের বোতাম টিপেছেন, দরজার বাইরে অপেক্ষমান বেয়ারা মহিলা ডিটেকটিভকে বাইরে নিয়ে যাওয়ার পরে মোহন ফোন তুলে রক্ষিত এজেনসির মালিককেও একই খবর দিলেন, যাতে টাকাটা মার না যায়।
কাঁচরাপাড়া। খবরটা ঠিক হবারই সম্ভাবনা বেশি, কারণ, কাল সারা দিনে মোহন তন্নতন্ন করে সারা বাড়ি খুঁজে একটা অদ্ভুত জিনিস পেয়েছেন। এই প্রথম তল্লাশি না, কিন্তু কাল কী মনে হয়েছে, বিছানার ম্যাট্রেসটা ভালো করে টিপে টুপে দেখতে গিয়ে একটা জায়গায় ভেতরে শক্ত-মতো কী একটা অনুভব করে বুঝেছেন, ম্যাট্রেসের পাশে একটা লম্বা কাটা জায়গা আছে। হাত ঢুকিয়ে হাতড়ে হাতড়ে বের করে এনেছেন একটা বাক্স। ভেতরে কিছু গয়নাগাটি - দুল, হার, আংটি - কোনওটাই দামী নয়, কয়েকটা ঝিনুক – সমুদ্রতির থেকে তুলে আনা যেন, আর, ঢাকনার ভেতর দিকে মোনালিসার নাম-ঠিকানা। মোনালিসা নয়, লিসা লেখা। দুটো ঠিকানা। একটা বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের, আর একটা ভিলেজ – কাঁপা, কাঁচরাপাড়া, নর্থ টোয়েন্টিফোর পরগনাস। মোনালিসারই হাতের লেখায়। গুগল ম্যাপস খুলে কাঁপা কোথায় দেখে নিয়েছেন মোহন। আজই সকালে অফিসে আসার পথে বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটা দেখে এসেছেন। মাল্টি-স্টোরিড ফ্ল্যাট। কিন্তু মোনালিসার ঠিকানায় একটা সাবেকি বাড়ির নাম ছিল। অফিসে এসে প্রথমেই ফোন করেছেন সাদিককে। সাদিক আলি বহু বছর ধরে মোহনের জমি-জায়গা-প্রপার্টির এজেন্ট। আজ অবশ্য মোহনের কাজের বহর শুনে অবাকই হয়ে গেছিল – বলেছিল, “শুধু ইনফরমেশন চাই? আর কিছু না? ঠিক আছে।”
দিন শেষ হবার আগেই অর্ধেক খবর এসেছিল। বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের বাড়িটা এক সময় বিপ্লবী পল্লব রায়চৌধুরীর ফ্যামিলির বাড়ি ছিল। রায়বাহাদুর প্রদ্যুম্ননাথ সেন বানিয়েছিলেন। বাড়ির শেষ মালিক ছিলেন ওদেরই ফ্যামিলির অধীর রায়চৌধুরী। উনি বিক্রি করে দেন প্রোমোটারকে। বলা ভালো, বাধ্য হয়ে বিক্রি করেন। গলার মধ্যে শব্দ করে হেসেছিল সাদিক। বলেছিল, “জানেন স্যার, এই অধীর রায়চৌধুরী আই-এ-এস ছিলেন। মহা ধুরন্ধর লোক। উনি একটা চালাকি আবিষ্কার করেছিলেন। কলকাতার পুরোনো প্রাইম প্রপার্টির ট্যাক্স বাড়িয়ে দেওয়ার চালাকি। তখন তো কম্পিউটার ছিল না, সুতরাং হাতে লেখা ট্যাক্স ক্লেইম আসত। হঠাৎ দেখা যেত, একটা বাড়ির ট্যাক্স বছরে একশো তিন টাকার জায়গায় পঞ্চাশ, ষাট, সত্তর হাজার টাকা। এমন বাড়ি, যার মালিক বুড়ো হয়েছে, রোজ কর্পোরেশন দৌড়তে পারবে না, আর তাছাড়া তখন তো নিয়ম ছিল ভুল হলেও ট্যাক্সের টাকা জমা দিয়ে তবে অ্যাপিল করতে হবে। তখনকার দিনে সত্তর হাজার টাকা আজকে হলে কয়েক লাখ টাকা। ফলে বাধ্য হয়ে লোকাল প্রোমোটারকে বাড়ি বিক্রি করে দিতে হত। প্রোমোটার মালিককে বলত, কোনও চিন্তা নেই, ট্যাক্সের ভাবনা আমার। প্রোমোটার কেনার পরই অবশ্য ট্যাক্স ক্যালকুলেশনের ভুলটা ধরা পড়ে যেত। ওই সময় সাউথ ক্যালকাটার অনেক জমি এ-ভাবেই প্রোমোটাররা পেয়েছে। সব লেভেলে টাকা ভাগ হত। এই রায়চৌধুরীও কম নেয়নি।”
এমন গল্প অনেক জানেন মোহন। তবু, এই গল্পের সঙ্গে কোনও ভাবে মোনালিসা জড়িত। তাই বললেন, “তারপরে?”
“নিজের ফাঁদে পড়েছিলেন অধীর রায়চৌধুরী। ওই একই প্রোমোটার, একই ছকে উৎখাত করেছিল ভদ্রলোককে। শুধু ট্যাক্স-ক্লেমটা গিয়েছিল তখনকার ফলস রেট-এর চেয়ে অন্তত চারগুণ বেশি।”
অবাক হলেন মোহন। “কিছু করলেন না ভদ্রলোক? উনি তো নিজে আই-এ-এস অফিসার।”
আবার হাসল সাদিক। বলল, “আরে, বুদ্ধি করে রিটায়ার্মেন্টের প্রায় আট-ন’ বছর পরে কাজটা করেছিল। ফলে যারা তখন চেয়ারে ছিল তারা হয় ভদ্রলোককে চেনে না, নইলে তাদের লোভ খুব বেশি। জানেনই তো স্যার...”
বাকিটা আন্দাজ করতে পারছিলেন, তাও মোহন বললেন, “তা ভদ্রলোক বাড়ি বেচে কী করলেন?”
সাদিক এবারে একটু আমতা আমতা করে বলল, “স্যার, ওখানটাই একটু গড়বড়। বাড়িটায় এখন আঠাশটা ফ্ল্যাট। কিন্তু ওনাদের নামে একটাও ফ্ল্যাট নেই। কখনওই ছিল না। হয় প্রোমোটার ওদের টাকা দিয়েছে। নয়ত অন্য কোথাও ফ্ল্যাট দিয়েছিল। সে সব ডিটেল বেরোতে সময় লাগবে। অনেক দিনের কথা তো...”
মোহন বললেন, “থাক। ওই লাইনটা ছেড়ে দিন। কাঁচরাপাড়ার খবরটা পেয়েছেন?”
সাদিক আবার একটু অপ্রস্তুত হয়ে বলল, “স্যার, ওটাও একটু সময় লাগবে। ও দিকটা আবার আমার কেউ চেনাজানা নেই। লোক লাগিয়েছি...”
সময় লাগলে অসুবিধে নেই বলে লাইন ছেড়ে মোহন আবার ফোন করেছিলেন নিখিল রক্ষিতকে। বলেছিলেন, “কাঁচরাপাড়ায় একটা অ্যাড্রেস দিলে কত তাড়াতাড়ি আমাকে সেই বাড়ি সম্বন্ধে কিছু ডিটেল এনে দিতে পারবেন? যেমন সে বাড়িতে কে থাকেন, তাঁদের পরিচয় কী... ইত্যাদি?”
রক্ষিত বলেছিলেন, পরদিনই দেবেন, কিন্তু বিকেলের মধ্যেই খবর দিয়েছিলেন, ওই বাড়ি রিটায়ার্ড আই-এ-এস অফিসার অধীর রায়চৌধুরীর। থাকেন কেবল উনি আর ওনার স্ত্রী কবরী।
“ছেলেমেয়ে?” জানতে চেয়েছিলেন মোহন। অধীর বলেছিলেন, “স্যার, আপনি কী কী ডিটেল চাইছেন, সেটা আমাকে জানিয়ে দিন, আমি উইদিন ওয়ান উইক সব বের করে দেব।” তারপরে মোহনের পয়েন্টগুলো কথা বলতে বলতেই ওই ফোনেই লিখে নিয়েছিলেন, ক্রমান্বয়ে পিঁক-পিঁক শব্দ সেটা জানিয়ে দিয়েছিল মোহনকে।
বাড়ি ফিরে মোনালিসাকে ফোন করেছিলেন মোহন। অবাক মোনালিসা জানতে চেয়েছিল, “বাড়ি চলে গেছ? আসবে না?” মিথ্যে বলেছিলেন। কাল ভোরবেলা একটা কাজে যেতে হবে বাইরে। সারাদিন ওখানেই কাটবে। অত সকালে ওঠে না মোনালিসা। তাই ওকে বিরক্ত না করার উদ্দেশ্যে বাড়ি এসেছেন, পরদিন আসবেন মোনালিসার বাড়ি।
মোনালিসা ফোন কেটে দিয়েছিল। হেসেছিলেন মোহন। কপাল ভালো থাকলে কালই মোহন এমন কথা বলবেন মোনালিসাকে, তাতে ওর রাগ পড়ে যেতে সময় লাগবে না।
~পাঁচ~
শীতকালে ভোরবেলায় পাঁচটার সময় গাছের ফুল তুলে নিয়ে পুজোয় বসা কবরী রায়চৌধুরীর অভ্যেস। আগে সেটা সকাল আটটা থেকে সাড়ে আটটার মধ্যে করতেন। প্রথম প্রথম আসেপাশে বাড়ি ঘরদোর কম ছিল, সকাল সকাল ফুল চুরি হত না। পরে যখন চুরি শুরু হল, যেদিন কবরী লুকিয়ে জানতে পারলেন প্রধান চুরিটা ওদের রাস্তারই ভটচাজ-গিন্নী করেন, তখন থেকে চুপিচুপি নিজের ফুল চুরি করতে শুরু করলেন। ভটচাজ-গিন্নীর শুতে শুতে দেরি হয়, ফলে গরমকালে ভোর সাড়ে-চারটে, আর শীতে পাঁচটার মধ্যে ফুল তুলে নিলে কবরীর পুজোর ফুলের অভাব হয় না। অবশ্য কবরী কখনওই সব ফুল তুলে নেন না, ভটচাজের জন্য কিছু রেখে দেন – যেটা ভটচাজ কখনওই করেন না। গাছগুলো খালি করে যান।
গত ক’দিন মহিলার শরীর খারাপ। ফলে ফুলগাছ খালি হচ্ছে না। অভ্যেসমতো কবরী গাছে রোজ কিছু ফুল রেখে দেন, পরে সেগুলো তুলে ঘর সাজান। আজও তাই করছেন, ওদিকে বাগানের চেয়ারে অধীর অভ্যেসমতো ঘুমিয়ে পড়েছেন। কেন যে বুড়ো সকাল সকাল উঠে পড়েন... জাগতে পারেন না, তারপরে চেয়ারে বসে ঘুমোন। আজও তাই করছিলেন। কবরীর পুজোর ঘণ্টার শব্দে ঘুম থেকে উঠে বাগানে এসে বসেছেন রোদে বেতের চেয়ার পেতে। চাটা জুড়িয়ে জল হচ্ছে পাশের টেবিলে। এবারে ডেকে বলতে হবে, “চলো, মর্নিং ওয়াক,” তখন বলবেন, “না না, চা খেয়ে যাব।” রোজ দেরি হয় এইজন্যই। আজ ঠিক করেছেন কিছুতেই চা দেবেন না। আগে মর্নিং ওয়াক, ফিরে এসে চা।
মস্তো একটা কালো গাড়ি আস্তে আস্তে রাস্তা দিয়ে এসে একটু দূরে দাঁড়াল। অবাক হয়ে তাকালেন কবরী। কাঁপা গ্রামের এই রাস্তায় শেষ কবে গাড়ি গেছে? জিপ জাতীয় একটা গাড়ি - বিরাট সাইজ।
গাড়িটা এ রাস্তায় কেন? দাঁড়িয়েছেও অদ্ভুতভাবে। রাস্তার ওপারে, দত্ত আর সেনগুপ্তদের বাড়ির মাঝামাঝি। কোথায় এসেছে? দরজাও খুলছে না, কেউ নামছেও না। কালো কাচের ওপারে গাড়ির ভেতরের অন্ধকারে কে আছে বোঝার যো নেই।
কবরীর হঠাৎ মনে হল গাড়িটার দিকে হাঁ করে তাকিয়ে থাকাটা ঠিক হচ্ছে না। উনি ভেতরটা দেখতে না পেলেও ভেতরে যে বা যারা আছে, তারা তো ওঁকে দেখতেই পাচ্ছে। তাড়াতাড়ি সাজিটা নিয়ে ঘুরলেন। ভেতরে যাবার পথে অধীরকে আলতো করে নাড়া দিয়ে বললেন, “ওঠো, মর্নিং ওয়াকের সময় হল...”
ঘরে সাজিটা রেখে, আঁচলটা গাছকোমর করে জড়িয়ে বেরোলেন আবার। দেখলেন অসহায়ভাবে অধীর চেয়ে আছেন, হাতে চায়ের কাপ।
“একেবারে ঠাণ্ডা হয়ে গেছে...”
“হোকগে, এখন চা না। চলো আগে হেঁটে আসবে। সাড়ে আটটা বেজে গেছে...” বলে মুখ তুলে তাকিয়ে কবরী থমকে গেলেন। অপরিচিত একজন লোক গাড়ি থেকে নেমে এগিয়ে এসেছেন ওঁদেরই গেটের দিকে। ওদিকে কাপ নামিয়ে লাঠি হাতে আস্তে আস্তে বাগানের রাস্তার দিকে এগোচ্ছেন অধীর, নজর মাটির দিকে। তাড়াতাড়ি কাছে গিয়ে বললেন, “দাঁড়াও, এসো না। গেটে কে এসেছে, দেখি।”
এগিয়ে গেলেন। ভদ্রলোকও এসে গেটের বাইরে দাঁড়িয়েছেন। কবরী বললেন, “আপনি কি কাউকে খুঁজছেন?”
একটু অস্বস্তিভরা কিন্তু কিন্তু করে মোহন বললেন, “ইয়ে, এটা কি অধীর রায়চৌধুরীর বাড়ি?”
~ছয়~
অত দূর থেকেও মোহন বুঝেছিলেন, এঁরাই মোনালিসার মা-বাবা। অধীর রায়চৌধুরীর নাক আর চিবুক, আর ঠোঁটের আকৃতি কবরীর। গাড়িতে বসে দূরবীন দিয়ে দেখে বুঝেছিলেন চোখদুটো-ও মেয়ে পেয়েছে মায়ের থেকে। তাই কাছে এসেছিলেন কথা বলতে। কিন্তু মহিলা যখন এগিয়ে এসে জানতে চাইলেন, তখন ওই চোখের সামনে কেমন ভেবলে গেলেন। কথাগুলো একটু তুতলে গেল যেন। ভদ্রমহিলা একটু ভুরু কুঁচকে বললেন, “হ্যাঁ। আপনি কোথা থেকে আসছেন? কী ব্যাপারে?”
মোহন বললেন, “আমি কলকাতা থেকে আপনাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছি। তবে আপনারা মনে হচ্ছে বেরোচ্ছিলেন। আমি তাহলে পরে আসব। কখন আসলে আপনাদের অসুবিধে হবে না?”
মহিলা গেট খুলে বললেন, “আপনি এতটা রাস্তা এসেছেন, আমরা যদি একদিন মর্নিং ওয়াকে না যাই, তাহলে নিশ্চয়ই খুব ক্ষতি-বৃদ্ধি হবে না। আসুন। আসুন...” বলে রাস্তা ছেড়ে দিলেন। এর মধ্যে লাঠি ঠুকঠুক করতে করতে অধীর রায়চৌধুরী এগিয়ে এসেছেন। কবরী বললেন, “উনি কলকাতা থেকে আমাদের সঙ্গে দেখা করতে এসেছেন।”
মোহন দু হাত তুলে নমস্কার করলেন, লাঠিশুদ্ধ হাত কপালে ঠেকিয়ে অধীর রায়চৌধুরী বললেন, “আসুন। বাগানে বসতে আপত্তি নেই, আশাকরি... তাহলে আমরা চা খেতে পারি... যে চা-টা আমি পাইনি সকাল থেকে...”
তিনজনে গিয়ে বাগানে বেতের চেয়ারে বসলেন। অধীর হাত বাড়িয়ে একটা রিমোট কলিং বেল বাজালেন। বাড়ির ভেতরে কোথাও চিনচিনে একটা ঘণ্টা বাজল। প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই দ্রুতপায়ে একজন কাজের লোক এসে দাঁড়াল।
কবরী বললেন, “যুগল, স্যারের কাপটা নিয়ে যাও, আর তিনকাপ চা নিয়ে এসো। আর বিস্কিট এনো। দাঁড়াও।” বলে মোহনের দিকে তাকিয়ে বললেন, “স্যরি। আমাদের আবার চা ছাড়া আর কোনও কিছুরই পাট নেই। কফি উনি খান না...” বলে অধীরের দিকে তাকালেন।
অধীর দাঁত আর জিভের মাঝে ছিক করে একটা শব্দ করে বললেন, “কফি আবার মানুষে খায়?”
কবরী কী একটা বলতে শুরু করছিলেন, মোহন হেসে বললেন, “চা চলবে।”
কবরী বললেন, “চায়ে কোনও প্রেফারেনস আছে? আমরা কিন্তু র’ চা খাই। লিকার। চিনি দুধ ছাড়া।”
মোহন বললেন, “দুধ চাই না, তবে যদি একটু চিনি...”
কবরী বললেন, “যুগল, তুমি তিন কাপ চা নিয়ে এসো। আমরা যেমন খাই তেমনই আনবে, শুধু চিনির পট্‌-টা নিয়ে আসবে, কেমন?”
যুগল ঘাড় নেড়ে চলে গেল। অধীর লাঠির ওপরে দু-হাত রেখে সামনে ঝুঁকে পড়ে বললেন, “এবারে আপনি যদি বলেন আপনি আমাদের কাছে কেন এসেছেন... আমরা কে আপনি জানেন, অ্যান্ড আই মাস্ট সে দ্যাট দেয়ার ইউ হ্যাভ দি অ্যাডভান্টেজ অন আস...”
একেবারে আই-এ-এস মেজাজ। মোহন নাম বললেন। মনে মনে একটা আশা ছিল হয়ত নামটা ওঁরা চিনবেন, কিন্তু দুজনের মুখ দেখে মনে হল না যে শুনেছেন কখনও। পরিচয় দেবার উদ্দেশ্যে বললেন, “আমি একজন অন্ত্রপ্রনিয়ঁ। আমি একাধিক ইন্ডাস্ট্রি শুরু করেছি। আপনারা হয়ত কয়েকটার নাম শুনে থাকবেন...” বলতে বলতেই বুঝলেন আই-এ-এস চিনে ফেলেছেন। সোজা হয়ে বসে বললেন, “ও, আপনিই সেই, যিনি আজকাল সিক্‌ ইন্ডাস্ট্রি রিভাইভালের দিকে নজর দিয়েছেন?”
বিনম্র মাথা ঝোঁকালেন মোহন। অধীর বললেন, “আশ্চর্য, আমিও সিক ইন্ডাস্ট্রি নিয়ে কাজ করেছি, কিন্তু আপনার মতো সাকসেস পাইনি।”
মোহন কাজ নিয়ে আলোচনা করতে আসেননি। কিন্তু ভদ্রলোককে চটানো চলবে না। তাই কিছুক্ষণ দুজনে অসুস্থ কারখানাকে নতুন জীবন দেওয়া নিয়ে আলোচনা করলেন। এর মধ্যে চা বিস্কুট এল। কবরী বললেন, “আপনি সকালে নিশ্চয়ই কলকাতা থেকে খেয়ে আসেননি, ব্রেকফাস্ট খাবেন তো?”
হকচকিয়ে গিয়ে মোহন বললেন, “না, মানে, ইয়ে... আমি...”
আধখানা আপত্তি টিঁকল না, যেতে হল খাবার টেবিলে। খেতে খেতে নানা কথা বলেই চললেন অধীর। শেষে, ব্রেকফাস্টের চায়ের পরে কবরী বললেন, “কিছু মনে করবেন না, আমরা দুজনে খালি কথাই বলে চলেছি। আপনি কেন এসেছেন, সেটাই আপনার কাছ থেকে জানতে চাইনি।”
কী কী বলবেন ঠিক করে এসেছিলেন, এতক্ষণ নানা কথায় সেগুলো সব গুলিয়ে গেছে মোহনের। ফলে সাজানো কথাগুলো সব উল্টোপাল্টা হয়ে বেরিয়ে এল।
“আমি, মানে আমি এসেছিলাম, মানে আপনাদের, ইয়ে মেয়ের সম্বন্ধে কথা বলতে।”
কথাগুলো বেরোনোমাত্র বৃদ্ধ-বৃদ্ধার মধ্যে এমন একটা পরিবর্তন এল যে মোহন আরও হকচকিয়ে গেলেন। পাথরের মূর্তির মতো খানিকক্ষণ বসে থেকে দুজন মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। তারপরে তীক্ষ্ণ দৃষ্টিতে মোহনের দিকে তাকিয়ে অধীর বললেন, “আমাদের মেয়ে? কোন মেয়ের কথা বলছেন আপনি?”
মোনালিসার কোনও দিদি বা বোন আছে বলে কখনও ওর মুখে শোনেননি মোহন। তাই আরও গুলিয়ে গেল। বললেন, “ইয়ে, মোনালিসা...”
দুজনেই ঝুঁকে পড়লেন সামনের দিকে। কবরী বললেন, “লিসার সম্বন্ধে কী কথা?”
একটা লম্বা শ্বাস নিয়ে মোহন বললেন, “আমি ঠিক করে বলতে পারছি না। আমি বরং প্রথম থেকে বলি। আমি এখানে আজ এসেছি আপনাদের অনুমতি নিতে। আমি মোনালিসাকে বিয়ে করতে চাই...”
অধীর বললেন, “কিন্তু...” বলেই থেমে গেলেন। তাকালেন পাশে বসা কবরীর দিকে। যদিও দেখতে পাননি, মোহনের মনে হল কবরী অধীরের হাঁটুটা খামচে ধরে আছেন। দুজনে একদৃষ্টে মোহনের দিকে তাকিয়ে। বোধহয় বোঝার চেষ্টা করছেন মোহন মোনালিসার চেয়ে কতোটা বড়ো। মোহন বললেন, “আমি মোনালিসার চেয়ে অনেকটাই বড়ো। আমার বয়স আটচল্লিশ। মোনালিসা উনত্রিশ। আমার সঙ্গে বয়সের ফারাকটা অবশ্য...” থেমে গেলেন, কারণ অধীর রায়চৌধুরী যদিও একাগ্র দৃষ্টিতে চেয়ে আছেন, কবরী কিন্তু উদাস চোখে চেয়ে আছেন অন্যদিকে।
“উনত্রিশ...” আস্তে আস্তে বললেন কবরী। “আপনার সঙ্গে লিসার পরিচয় হল কী করে?”
“আমাকে আপনি বলবেন না, প্লিজ,” বলে ধীরে ধীরে, সাবধানে মোনালিসার সঙ্গে নিজের পরিচয় এবং আলাপের শুরু এবং পরিণতি সবটাই বলতে শুরু করলেন মোহন। সাবধানে, কারণ কোনওভাবেই যেন ওঁদের লিভিং টুগেদারের কথা ওঁদের সামনে বেরিয়ে না পড়ে। যতই হাবেভাবে সাহেব হোন না কেন, সত্তরের ওপর বয়স দুজনের, এমন অনাচার তাঁরা সহ্য করবেন, এমনটা আশা করাই উচিত নয়।
সময় লাগল। বেলা এগারোটা নাগাদ দুজনেই মোহনকে আপনি ছেড়ে তুমি বলতে শুরু করলেন। বারোটা নাগাদ, মোহনের তুমুল আপত্তি উপেক্ষা করে যুগলকে ডেকে বলে দেওয়া হল, “বাবু দুপুরে খাবেন, তিনজনের খানা তৈরি করো।” মোহন গিয়ে ড্রাইভারকে বললেন দুপুরের খাওয়ার খেয়ে আসতে।
মোহনের সব বক্তব্য শেষ হল তখন লাঞ্চ শেষ হয়েছে। কিছুক্ষণ চুপ করে থেকে অধীর বললেন, “মোনালিসা তোমাকে বিয়ে করতে রাজি হয়েছে?”
মোহন মাথা নাড়লেন। সত্যিটা এখনও পুরোটা বললেন না। উনি যে নিজেই মোনালিসার মা-বাবা এবং ব্যাকগ্রাউন্ড না জেনে বিয়ে করতে রাজি ছিলেন না, তা না বলে বললেন, “আমি আপনাদের অনুমতি ছাড়া মোনালিসাকে বিয়ের কথা বলবই না। আপনারা যদি আজ আমাকে আশীর্বাদ করেন, তবেই আমি আজ গিয়ে ওকে বলব...”
আবার অধীর-কবরী মুখ চাওয়া-চাওয়ি করলেন। তারপরে কবরী বললেন, “তুমি আমাদের ঠিকানা পেলে কোথা থেকে?”
মোহন হাসলেন। বললেন, “একটা স্বীকারোক্তি আছে। আমাকে মোনালিসা বলেছিল ও প্রতি মাসে মা-বাবার সঙ্গে একটা রবিবার কাটাতে যায়, কিন্তু আপনারা কোথায় থাকেন সেটা কিছুতেই বলেনি। শেষে ওর একটা পুরোনো বাক্সে একটা কাগজে আপনাদের কলকাতার এবং এখানকার অ্যাড্রেস লেখা দেখে আমি একজনকে বলি এই বাড়িতে কে থাকে যেন জেনে আমাকে জানায়। সেভাবেই জানতে পেরেছি আপনাদের ঠিকানা...”
“মোনালিসা আমাদের সঙ্গে প্রতি মাসে...” অবাক অধীরের কথাটা কেটে কবরী বললেন, “চুপ করো।” বলে আঙুল তুলে মোহনকে বললেন, “সত্যি কথা বলবে - তুমি আর লিসা একই সঙ্গে থাক?”
সরাসরি প্রশ্নের সামনে মিথ্যে বলতে পারলেন না মোহন। মাথা নিচু করে বললেন, “মানে... এই কয়েক দিন...”
“কোথায় থাক?” সামনে ঝুঁকে পড়লেন অধীর। “মানে তোমার বাড়িতে, না...”
মোহন বললেন, “আমার বাড়িতে ও কিছুতেই থাকতে রাজি নয়। তাই ওর ভাড়া ফ্ল্যাটেই, মানে...”
এবার ঝুঁকে পড়লেন কবরী। “কোন ভাড়ার ফ্ল্যাট? কোথায়?”
মেনকা সিনেমার পাশে একটা গলি, সেখান থেকে আরও দুটো মোড় নিয়ে একটা সরু গলিতে একটা ছোটো মাল্টিস্টোরিড বিল্ডিং...
“বাড়িতে আর যারা থাকে, তারা আপত্তি করে না, তোমরা অবিবাহিত অবস্থায় একই ফ্ল্যাটে থাক?”
বুঝতেই পারলেন, আপত্তিটা প্রতিবেশীর নয়, মায়ের। মোহন বললেন, “আসলে বাড়িটা একটু অদ্ভুত। ওখানে সবশুদ্ধ আটটা ফ্ল্যাট। এ ছাড়া টেরেসে একটা এক কামরার ফ্ল্যাটে মোনালিসা ভাড়া থাকে। বাকি ফ্ল্যাটগুলো খালি পড়ে আছে...”
ভুরু কুঁচকে অধীর বললেন, “ওরকম জায়গায় বাড়ি, তার মাত্র একটা ফ্ল্যাট অকুপাইড? কেন? জানো না?”
মোহনের মনে হল, ওই প্রপার্টিটা এতই ফালতু, যে ওটা কী বা কেন, সেটা জানার ইচ্ছে মোনালিসার সঙ্গে পরিচয় হবার পর থেকে মোহনের মনেই আসেনি। সাদিককে বললে এক ঘণ্টাও লাগত না খবরটা পেতে। তাছাড়া, বিয়েটা হয়ে গেলে তো আর সমস্যা থাকবে না, ওই এক কামরার বাড়িতে আর থাকবেন না। কলকাতা শহরে মোহনের তিনটে ফ্ল্যাট আছে, আর শহরের ধার ঘেঁষে রয়েছে আরও দুটো। সবকটাই বিরাট এবং যাকে বলে লাক্সুরি অ্যাপার্টমেন্ট।
আবার বুড়ো-বুড়ি চট করে চোখাচোখি করলেন। তারপরে কবরী বললেন, “তা সত্ত্বেও তুমি লিসার জন্য ওই এক-কামরার ফ্ল্যাটে পড়ে আছ?”
এটা বোঝানো কঠিন। মোহন মাথা নিচু করলেন। তারপরে বললেন, “আমার ডিভোর্সের পরে আমি বহুদিন ধরে এমন একজনকে খুঁজছি যার সঙ্গে নিশ্চিন্তে জীবনটা কাটানো যাবে। কিন্তু পাইনি। আজ আমি শিওর যে মোনালিসা-ই সেই মেয়ে। তাই ওর জন্য আমি যে কোনও স্যাক্রিফাইস করতে রাজি আছি।”
কবরীর চোখদুটো যেন কুরে কুরে মোহনের মাথার ভেতরে ঢুকে যাচ্ছে... “আর তোমার বাড়ির লোক? তাদের এই বিয়েতে সম্মতি আছে? ওরা লিসাকে দেখেছে?”
কতক্ষণে এই প্রসঙ্গ আসবে, ভাবছিলেন মোহন। সব কথা বলা যাবে না। অন্তত প্রথম-দর্শনে তো নয়ই। তবে একেবারে না বললেই নয়, কারণ মোহনের ভাই এবং মায়ের কথা সামান্য খোঁজখবর নিলেই যে কেউ জেনে যাবেন। তাই তৈরি করে আনা গল্পই বললেন মোহন। কেন ভাইয়ের সঙ্গে বিচ্ছেদ, কেন মা ভাই-কে সাপোর্ট করতেন বলে মায়ের সঙ্গেও যোগাযোগ কম... ছিল না বললেই চলে, এই সব।
কতটা বিশ্বাসযোগ্য হল? দুজনেই চুপ করে বসে রইলেন।
বিকেল গড়িয়ে এল। শীতের বেলা তাড়াতাড়ি শেষ হবে। মোহন উঠলেন। ঢোকার সময় নমস্কার করেছিলেন, বেরোবার সময় প্রণাম করলেন, বললেন, “আমি আজই ফিরে গিয়ে মোনালিসাকে বলব। তারপরে ফিরে আসব আবার, একসঙ্গে...”
দুজনে অপেক্ষা করলেন মোহনের গাড়িটা মোড় ঘুরে বেরিয়ে যাবার জন্য, তারপরে অধীর হাঁক দিলেন, “যুগল, গাড়িটা বের কর। কলকাতা যেতে হবে, এক্ষুনি।”
~সাত~
সকালে যে রাস্তা গিয়েছিলেন পৌনে দুঘণ্টায়, সন্ধের পর ফিরতে লাগল প্রায় সাড়ে তিন। মোহনের ইচ্ছে ছিল বাড়ি হয়ে মোনালিসার কাছে যাবেন। কিন্তু গাড়িতে বসে চোখ বুজে সারা দিনের কথা ভাবতে ভাবতে হঠাৎ মনে পড়ল, একটা কথা শুরু হয়েছিল, কিন্তু নানা কথার ভীড়ে সেটা আর এগোয়নি। মোনালিসা প্রতি মাসে একটা রবিবার কাঁপা যায় মা-বাবার সঙ্গে কাটাতে, এই কথাটায় অধীরের যে রি-অ্যাকশনটা হয়েছিল সেটা স্বাভাবিক না। কবরীও যেভাবে ‘চুপ করো,’ বলে থামিয়ে দিলেন, সেটাও সন্দেহজনক। অর্থাৎ, মোনালিসা প্রতি মাসে কাঁপা যায় না। কে জানে, হয়ত কোনও দিনই যায় না। মোহনকে ‘মা-বাবা’ বলে বেরিয়ে গিয়ে কোথায় যায় কে জানে। যত ভাবেন তত মনে হয়, নিশ্চয়ই অন্য কোথাও যায়। নিশ্চয়ই অন্য কারওর কাছে যায়। যত ভাবেন তত মনে হয় মোনালিসা অন্য কোনও পুরুষের কাছে যায়। যত ভাবেন, তত রাগ বাড়ে। ক্রমে মাথার মধ্যে আগুন জ্বলা শুরু হয়। কৈফিয়ত চাই। না, কৈফিয়তের কী আছে, উত্তর তো একটাই হতে পারে... মোনালিসার জীবনে অন্য পুরুষ আছে। ও নিজেই বলেছিল। বলেছিল... আগে ছিল। কিন্তু এখনও নেই কে বলে দিয়েছে? কেউ না। নিশ্চয়ই আছে। আজ ওরই একদিন, কী আমারই এক দিন।
ঝুঁকে পড়ে ড্রাইভারকে বললেন, “বাড়ি নয়। ও-বাড়ি চলো।”
গত আট-মাসে ড্রাইভার এ-বাড়ি আর ও-বাড়ির তফাৎ জেনে গেছে, বিনা বাক্যে ঘাড় নাড়ল।
বাড়ির সামনের রাস্তা সরু। মোহনের গাড়ি ঢোকে কষ্টে। কিন্তু বাড়ির নিচে কিছুটা জায়গা আছে বলে গাড়িটা পার্কিং করা যায়। বাড়ির সামনে গাড়ি দাঁড়ালে নিচের দারোয়ানের ঘর থেকে মানদা বেরিয়ে এসে গেট খুলে দেয়। দারোয়ান ছিল সদানন্দ। মোনালিসা বলেছিল সে মারা যাবার পরে মানদাকে আর ও ছাড়ায়নি। মানদা বুড়ো মানুষ, যাবেই বা কোথায়?
আজ মানদা এসে দাঁড়াল না। ড্রাইভার দু-বার হর্ন দিয়ে শেষে নিজেই নেমে গেট খুলল। মোহন গাড়ি থেকে নেমে বললেন, “তুমি একটু থাকো। আমি ওবাড়ি ফিরব।”
আজ মোহনের মাথায় খুন। মোনালিসা আজ বলবে প্রতি মাসের একটা রবিবার ও কোথায় যায়, হয় বলবে, নইলে ওর কপালে দুঃখ আছে। মোহনের মার খায়নি ও। আজ বুঝবে মারকুটে মোহন কার ডাকনাম ছিল। সেইজন্যই ড্রাইভারকে থাকতে হবে... মারধর করে এখানে থাকবেন না। নিজের বাড়ি ফিরে যাবেন।
মানদার ঘর অন্ধকার। এমনটা আগে দেখেননি কখনও। ঘুরলেন সিঁড়ির দিকে। পুরোনো দিনের বাড়ি, লিফট নেই। সিঁড়ি দিয়ে চারতলায় উঠতে হয় অন্ধকারে। সিঁড়ির বাতি কেটে গেছে, আগে বিরক্ত লাগত, এখন অভ্যেস হয়ে গেছে। মোবাইলের টর্চ জ্বালিয়ে সিঁড়িতে সঞ্চিত নোংরা বাঁচিয়ে উঠলেন মোহন। বাড়িতে কেউ থাকে না, ফলে সাফ করার কেউ নেই।
তিনতলার পর থেকে খটকা লাগতে শুরু করল। মোনালিসার দরজার ওপরে একটা আলো আছে, মোনালিসা বা মোহন যে-ই আগে ফেরে, সে আলোটা সন্ধের পরে জ্বালিয়ে রাখে। সেই আলোর রোশনাই অন্ধকার তিনতলার সিঁড়ি অবধি না পৌঁছলেও একটু আলোর ছোয়া পৌঁছয় তিনতলা পার করার পর থেকে।
আজ সব অন্ধকার।
আজ তো মোনালিসার বেরোনর কথা ছিল না? বলেছিল বাড়িতেই থাকবে। তাহলে আলো কেন জ্বলছে না? ফিউজ উড়েছে, না কারেন্ট নেই? রাস্তায় আলো জ্বলে না কোনও দিনই। বাড়িতে তো একমাত্র এই ফ্ল্যাটেই কেউ থাকে। আসেপাশের বাড়িতে কি আলো জ্বলছিল? খেয়াল করেননি।
মোবাইলের টর্চের আলোতেই দরজার গডরেজ নাইটল্যাচ খুলে ঢুকলেন। জানলায় মোটা পর্দা। ভেতরটা ঘুটঘুটে অন্ধকার। দরজা বন্ধ করে আলোর সুইচগুলো জ্বালালেন। খুট-খুট করে জ্বলল সবকটাই, কিন্তু আলো বা পাখা চলল না।
যাই হোক, তার মানে মোনালিসা বাড়ি নেই। অন্ধকার হবার আগেই বেরিয়েছে, এখনও ফেরেনি। বাড়িতে এসে আলোর সুইচ জ্বালিয়ে আলো না জ্বললে কেউ আবার সুইচ বন্ধ করে রাখে না। মাথার আগুনটা আবার দাউ-দাউ করে জ্বলে উঠল। মৃদুস্বরে, শুধু নিশ্চিত হবার জন্য বললেন, “মোনালিসা?”
একটাই বড়ো ঘর, মাঝখানে পর্দা দিয়ে মোনালিসা একটা আব্রু তৈরি করেছে, বাইরের ঘর আর ভেতরের ঘর বানিয়েছে। সেই ভেতরের ঘরে কেউ নড়ল কি? মোবাইলটা ঘুরিয়ে ওদিকে আলো ফেললেন মোহন। বললেন, “মোনালিসা?” এবার আর একটু জোরে।
উত্তর এল না। আর কোনও নড়াচড়াও টের পেলেন না। কিন্তু মোবাইলের টর্চের মৃদু আলোয় মনে হল পর্দার ওপারে বিছানায় যেন কেউ শুয়ে। দ্রুতপায়ে ঘরের এধার থেকে ওধারে পৌঁছে এক ঝটকায় পর্দাটা টেনে সরিয়ে দিয়ে আলো ফেললেন বিছানায়।
বিছানায় মোনালিসা। গলা অবধি চাদরে ঢাকা, স্থির দৃষ্টিতে তাকিয়ে আছে। দুনিয়া ভুলে যান মোহন ও দুটো চোখের দিকে তাকিয়ে, কিন্তু আজ ভুলবেন না। সাইডবোর্ডের ওপর মোমবাতি থাকে। পুরোনো বাড়ি, যখন তখন ফিউজ উড়ে যায়। মোমবাতি জ্বেলে, মোবাইলের আলো নিভিয়ে বিছানার দিকে ঘুরলেন আবার। মোনালিসা এখনও একদৃষ্টিতে চেয়ে। শীত-গ্রীষ্মে ওর এই ভঙ্গীটা চেনেন মোহন। এই চাহনির অর্থও জানেন। চাদরের নিচে মোনালিসা কিছুই পরে নেই। চাইছে মোহন এসে ওর সঙ্গে শুয়ে পড়ুন। কিন্তু অন্যান্য দিন মোনালিসা কথা বলে, ডাকে। আজ একেবারেই চুপ।
সাইডবোর্ড থেকে বিছানার পাশে এলেন মোহন। একই রকম নিঃশব্দে এক হাত দিয়ে চাদর তুলে মোনালিসা ওর পাশের জায়গাটা দেখিয়ে দিল। মোহনের সব রাগ কোথায় চলে গেল উনি নিজেই জানেন না। জুতো মোজা খুলে ওখানেই ফেলে দিলেন, তারপরে শুয়ে পড়লেন মোনালিসাকে জড়িয়ে।
আধঘণ্টা পরে, তখনও দুজনের ঠোঁট পরস্পরকে ছুঁয়ে আছে, মোহন একটু কেজো সুরে বললেন, “আলো চলে গিয়েছে, না ফিউজ উড়েছে? দেখেছো?” বিছানা থেকে নামবার চেষ্টা করতে গিয়ে বুঝলেন মোনালিসা এখনও আলিঙ্গন আলগা করেনি। বললেন, “কী হল?”
ঠোঁট থেকে ঠোঁট না সরিয়ে ফিসফিস করে মোনালিসা বলল, “কোথায় ছিলে সারা দিন?”
ক্লান্ত মোহন বললেন, “গিয়েছিলাম কাঁচরাপাড়া।”
অবাক হয়ে মোনালিসা বলল, “কাঁচরাপাড়া? কেন?”
মোহন আবার চেষ্টা করলেন উঠে বসতে, কিন্তু এবার মোনালিসার উরু-ও উঠে এল মোহনের কোমরে। হাতের সঙ্গে পা দিয়েও মোহনকে জড়িয়ে ধরেছে মোনালিসা।
“তোমাকে বিয়ে করার আগে তোমার মা-বাবার সঙ্গে দেখা করে অনুমতি নিয়ে এলাম।”
বুকে-পিঠে, কোমরে মোনালিসার বেষ্টনির জোর আরও বাড়ল? ঠোঁট থেকে ঠোঁট সরিয়ে একটু দূরে মাথা নিয়ে গিয়ে মোহনের দিকে মন দিয়ে তাকাল মোনালিসা।
মোহনের রাগ এতক্ষণে জল হয়ে গেছে, তবু বললেন, “কিন্তু তুমি তো যাও না? মাসে একটা রবিবার কোথায় যাও তুমি?”
মৃদুস্বরে মোনালিসা বলল, “মা-বাবার কাছেই যাই। সারাদিন থাকি।”
ভুরু কুঁচকে মোহন বললেন, “তা কী করে হবে? আমি তো সারা দিন আজ কাটিয়ে এলাম। ওঁরা তো পরিষ্কার বললেন...”
মোনালিসা বলল, “আমি দেখা করতে যাই না। ওদের দেখতে যাই।”
এ কথার মানে কী? “মিথ্যে বলছ?” কঠিন হল মোহনের কণ্ঠ। “অতদূর যাও, অথচ দেখা না করে চলে আস? মিথ্যে বলছ কেন?”
আবার মোনালিসার বাহুবেষ্টনী ছাড়িয়ে উঠতে গেলেন। মোনালিসা আরও কাছে টেনে নিল মোহনকে। মোহনের ওঠা হল না। মোনালিসা বলল, “কেন আমি ওদের সঙ্গে দেখা করি না, সে তুমি বুঝবে না। কিন্তু আমি ওখানেই যাই। ওদের সঙ্গেই দিনটা কাটাই। ওদের জানতে দিই না। কিন্তু তুমি আমাকে কিছু না বলে কেন ওদের কাছে গিয়েছিলে, সেটা বলো।”
“বললাম যে, তোমাকে বিয়ে করার অনুমতি নিতে...”
আরও একটু জোরদার হল মোনালিসার আলিঙ্গন। বলল, “আমাকে বিয়ে করতে চাও, আমাকে না জিজ্ঞেস করেই মা-বাবাকে জিজ্ঞেস করতে গেলে?”
গলায় কি অল্প উষ্মা? মোহন বললেন, “তুমি জান, আমি এসব ব্যাপারে একটু ট্র্যাডিশন মেনে চলা পছন্দ করি।”
মোনালিসা অল্প হাসল, বলল, “কিন্তু বিয়ে না করে আমার সঙ্গে শোবার সময় তোমার ট্র্যাডিশন কোথায় থাকে?”
মোহনের এবার সত্যিই কষ্ট হচ্ছে মোনালিসার ক্রমশ গাঢ় হয়ে আসা আলিঙ্গনে। হাতটা ঠেলে উঠতে গেলেন, কিন্তু পারলেন না। চেষ্টা করলেন মোনালিসার উরু নিজের পেটের ওপর থেকে সরিয়ে দিতে, মনে হল উরুটা যেন পাথরের তৈরি, এক চুলও সরাতে পারলেন না। মনে হল পেটে যে চাপ, তার জন্য নিঃশ্বাস নিতে অসুবিধা হচ্ছে। আরও জোর বাড়ালেন, একফোঁটাও নড়ল না মোনালিসার পা। সেই সঙ্গে হাতের চাপ এতটাই বেড়ে গেল যে মোহনের বুকে পিঠে অস্বস্তি হতে শুরু করল।
“বিয়ে করবে? আমাকে?” আবার জিজ্ঞেস করল মোনালিসা। “কেন? যাতে মারতে পারো ধরে ধরে? সে তো এমনিই চেষ্টা করো, করো না?”
মোহনের এখন কষ্ট হচ্ছে। বললেন, “ছাড়ো, ছাড়ো। ব্যথা লাগছে।”
“নিজে মারো যখন? ব্যথার কথা ভাবো?” মোনালিসার গলা হিসহিস করে উঠল। চোখদুটো যেন ধকধক করে জ্বলছে।
এবার দম বন্ধ হয়ে আসছে মোহনের। এইটুকু মেয়ের গায়ে এত শক্তি কী করে আসে? প্রাণপনে দু-হাত দিয়ে ঠেললেন মোনালিসাকে। হল এই, যে মোনালিসা উঠে উবু হয়ে বসল মোহনের দুদিকে দুই হাঁটু দিয়ে। তারপরে দু-হাতে মোহনের গলা টিপে ধরল...
“তোমরা সবাই সমান... তোমরা আসলে ভালোবাসো না। তোমরা মারতে চাও। মেরে মেরে নিজেদের হাতের সুখ করো... তোমরা সবাই সমান...”
মোহন ছটফট করতে করতে দু-হাতে মোনালিসার কবজি ধরে চেষ্টা করলেন হাত আলগা করতে, পারলেন না। বলতে চেষ্টা করলেন, “আমি না। আমি আলাদা... ওরকম নই... ছেড়ে দাও, ক্ষমা করো...” কিন্তু মুখ দিয়ে কোনও শব্দ বেরোল না। চিৎকার করতে পারলেন না। ক্রমে মাথার ভেতরটা কেমন যেন আলগা হয়ে যেতে লাগল। চোখের সামনে একরাশ আলোর ফুলকি ছিটকে সরে গেল, চারিদিক অন্ধকার হয়ে আসতে লাগল। মাথার মধ্যে একটা দুম-দুম শব্দ ক্রমে বাড়তে বাড়তে মনে হল যেন কে একটা কাঠের দরজায় প্রবল ধাক্কা দিচ্ছে...
বাইরের দরজায়... ধাক্কা... শেষ চেষ্টা করলেন মোহন। যতটা সম্ভব মনের জোর দিয়ে ছিটকে পড়লেন খাট থেকে মাটিতে। তারপরে, মোনালিসার জড়িয়ে থাকা শরীরটাকে হিঁচড়ে নিয়ে গিয়ে দরজার কাছে আছড়ে পড়লেন আবার। আবার মোনালিসার হাত মোহনের গলায় চাপ বাড়াতে থাকল। কোনও রকমে হাত তুলে গডরেজের নাইটল্যাচের বোতাম-টা ঘুরিয়ে দরজা খুলে দিয়ে মোহন অজ্ঞান হয়ে গেলেন।
টর্চ হাতে ঢুকল যুগল, পেছনে অধীর এবং কবরী রায়চৌধুরী।
ঝুঁকে পড়ে মোহনের নিরাবরণ বুকে কান রাখলেন অধীর। তারপরে বললেন, “যুগল, মোবাইলে ১০২ ডায়াল কর। দেখবি অ্যাম্বুলেনস থেকে উত্তর দিচ্ছে। আসতে বল, এক্ষুনি।” তারপরে উঠে দাঁড়িয়ে বললেন, “বুঝতে পারছি না, বোধহয় বেঁচে নেই।”
~আট~
হাসপাতালে প্রথম তিন দিন ডাক্তার মোহনের সঙ্গে অধীর আর কবরীকে দেখা করতে দেননি ডাক্তার। তার পরে ওঁরা এলেন মোহনের স্যুইটে। মোহনের সেক্রেটারি দিনরাত বাইরের ঘরে বসে। ও-ই দরজা খুলে দিল, তারপরে বেরিয়ে গেল – লবিতে। শোবার ঘর থেকে মোহন এলেন বসার ঘরে। সঙ্গে নার্স। সোফায় এলিয়ে পড়ে বললেন, “আপনারা আমাকে বাঁচিয়েছেন।”
কবরী উঠে এসে মোহনের পাশে বসে হাত ধরে বললেন, “ভাগ্যিস হাসপাতালে এনে ফেলতে পেরেছিলাম – উনি তো ভেবেছিলেন তুমি আর নেই।”
ওঁরা ওকে নিয়ে যাচ্ছিলেন সরকারী হাসপাতালে। রাস্তায় মোহনের জ্ঞান ফিরেছিল, কিন্তু কথা বলতে পারছিলেন না। মোবাইলে নিজের ডাক্তারের নম্বর বের করে দিয়েছিলেন অধীরকে।
বললেন, “মোনালিসা? মোনালিসা কেমন আছে? ওর কী হয়েছিল? অমন করে আমাকে আক্রমণ করল কেন?”
বুড়োবুড়ি মুখ তাকাতাকি করলেন। তারপরে কবরী মোহনের মাথায় হাত বুলিয়ে দিয়ে বললেন, “মোহন, আজ এসব কথা থাক। পরে কোনও দিন...”
মোহন দু-হাতে কবরীর হাতটা ধরে বলল, “অন্তত এটা বলুন, ও ঠিক আছে? ও তো আমার সঙ্গে একদিনও দেখা করতে আসেনি। আমার সেক্রেটারির কাছে আমার ফোন ছিল। ও একবার ফোনও করেনি। ও কি আমার ওপর এখনও রেগে আছে? কেন রেগে আছে? আমি তো ওকে মারিনি... সেদিন... সেদিন তো...”
অধীর বললেন, “কবরী, হি হ্যাজ দ্য রাইট টু নো...” বলে বললেন, “মোহন, দ্য লং অ্যান্ড দ্য শর্ট অফ ইট ইজ যে আমাদের মেয়ে মোনালিসা আর বেঁচে নেই। শি ইজ ডেড। আজ প্রায় সাত-আট বছর হয়ে গেল।”
উঠে বসতে গিয়ে পারলেন না মোহন। মাথা ঘুরে গেল। মোহনের কাঁধে হাত রেখে কবরী বললেন, “ওই বাড়িটা প্রোমোটার আমাদের দিয়েছিল যখন বালিগঞ্জ সার্কুলার রোডের জমিটা নিয়ে নিল। দুটো ফ্ল্যাট দিয়েছিল, আমরা একটা নিই-ইনি। আর ওই ছাদের ফ্ল্যাটে থাকিওনি কখনও। রেখেছিলাম শুধু যদি কখনও কোনও কাজে কলকাতায় থাকতে হয়। লিসা যখন চাকরি করতে এল, তখন ওখানে উঠেছিল।”
কবরীর গলা ধরে এল। অধীর বললেন, “মেয়েটা বড়ো জেদি ছিল। আমার বলে দেওয়া কোনও পথেই গেল না। কোনও ক্রমে স্কুল পাশ করে কলেজের পাট চুকিয়ে দিল ফার্স্ট ইয়ার শেষ হবার আগেই। কোন ইভেন্ট ম্যানেজমেন্ট কম্পানি টোপ দিয়েছিল, হাজার বারণ সত্ত্বেও গেল ওদের সঙ্গেই কাজ করতে। একটা গাইয়ের পাল্লায় পড়েছিল...”
গাই? ইংরিজিতে ব্যক্তি, না বাংলায় গোরু? কী বলতে চাইছেন অধীর?
“আঃ, ওরকম বলতে নেই,” মৃদু ভর্ৎসনার সুরে বললেন কবরী। “গাইয়ে না, বেশ নাম করা গায়ক। উজ্জ্বল ভবিষ্যৎ ছিল। দুজনে বিয়ে করবে ঠিক করে। এসেওছিল আমাদের বাড়ি বেশ কয়েকবার। কিন্তু ভীষণ রগচটা, আর মারকুটে। ভীষণ মারত লিসাকে। কতবার লিসা বাড়ি এসেছে, ঠোঁট কাটা, চোখে কালশিটে, গালে পাঁচ আঙুলের দাগ... কিন্তু ভীষণ ভালোবাসত। ছাড়তে পারত না। কতবার বলেছিলাম, শুনত না। সুস্থ হয়েই ফিরে যেত...”
এর পরে দুজনেই চুপ করে রইলেন কিছুক্ষণ। শেষে মোহন বললেন, “তারপর?”
আস্তে আস্তে কবরী বললেন, “শেষে কী হয়েছিল তো কেউ জানে না। শুধু এইটুকু জানি, যে দিনের পর দিন ফোন না পেয়ে, আমরা শেষে কালকের মতো দরজা ভেঙে ঢুকেছিলাম ফ্ল্যাটে। তখন লিসার দেহে আর প্রাণ নেই। বেশ কয়েকদিনের পুরোনো মৃতদেহ উদ্ধার করতে হয়েছিল। সেই গায়ক তখন বিদেশে। ও ফিরে এসে বলেছিল ও এসব কিছু জানে না। ও যখন গিয়েছিল, তখন লিসা ঠিক ছিল। তবে মৃত্যুর আগে গিয়েছিল, না পরে গিয়েছিল, সেটা বোঝা যায়নি বলে... থাক, জোরে জোরে আর নামটা বোলো না।”
সাত আট বছর আগের কথা, তাই তক্ষুনি মোহনের খেয়াল হয়নি। খবরটা কাগজেও বেরিয়েছিল। অনেক দিন ধরে লেখালেখি হয়েছিল। খুন-জখমের খবরে মোহনের ইন্টারেস্ট চিরকালই কম, সেলেব্রিটিদের নিয়েও মাথাব্যথা নেই। তাই নাম-গুলো মনে ছিল না। বললেন, “কিন্তু সেই গাইয়ে... মানে গায়কও তো...”
অধীর বললেন, “তিন মাসের মধ্যেই। ওই ওখানেই। ঠিক ওইভাবে। সে নিয়েও খুব সমস্যাও হয়েছিল আমাদের। পুলিশ সন্দেহ করেছিল আমরাই বুঝি কোনওভাবে ওকে মেরেছি। দিনের পর দিন তো আমরা কলকাতা আসিই না। তারপরে ওর ডেডবডিও পাওয়া গেছিল মারা যাবার বেশ ক’দিন পরে। সেলিব্রিটি বলেই তাড়াতাড়ি হয়েছিল। আমরা প্রমাণ করতে পেরেছিলাম আমরা ওই সময়ের মধ্যে আমরা কলকাতায় আসিইনি। আর পুলিশও কিছু করতে পারেনি। লিসার মৃত্যুরও কোনও কিনারা হয়নি।”
অধীর বললেন, “তুমি বোধহয় জানো না, যে গত সাত আট বছরে আরও পাঁচজনের মৃতদেহ পাওয়া গিয়েছে ওই ফ্ল্যাটে? সকলেরই মৃত্যু সন্দেহজনক অবস্থায়, কারোরই মৃত্যুর কোনও সমাধান হয়নি?”
পাঁচজন? অর্থাৎ সবশুদ্ধ সাতজন মারা গেছে ওই বাড়িতে?
কবরী বললেন, “তাই তুমি সেদিন যখন আমাদের বললে তুমি লিসাকে বিয়ে করতে চাও, আমার খটকা লেগেছিল। তাই বারবার করে জিজ্ঞেস করেছিলাম কোথায় দেখা করো লিসার সঙ্গে। এই বাড়ির কথা শুনে তো আমার ওখানেই অজ্ঞান হয়ে যাবার জোগাড়! কিন্তু তুমি যখন ভেতরে গেলে বাথরুমে, দুজনে আলোচনা করলাম, যে তোমাকে তখন কিছু বলব না। ব্যাপারটা কী, সত্যি বলছ কি না, নিজে থেকে ওখানে গেছ কি না, কী করে ঢুকলে, তোমাকে কেউ ট্র্যাপ করছে কি না, আমাদের জানতে হবে। তাই তোমার পেছনে পেছনে এসেছিলাম। সমস্যা হল এই, যে তোমার গাড়ি চলে জোরে, আর আমাদের যুগল তোমার ড্রাইভারের মতো পোক্ত নয়। তাই আমাদের পৌঁছতে তোমার চেয়ে অন্তত একঘণ্টা বেশি সময় লেগেছে।”
অনেকগুলো কথা ঘুরছে মোহনের মাথায়। “তাহলে মোনালিসা বলে আমার সঙ্গে... বন্ধুত্ব... করেছিল কে? আর আপনি বললেন, আপনারা দরজা ভেঙে ঢুকেছেন। কিন্তু আমি তো দরজা খুলে দিয়েছিলাম...”
মাথা নাড়লেন অধীর। বললেন, “আমরা তালা ভেঙে ঢুকেছি। মর্চে পড়ে গেছিল বলে চাবি ঘুরছিল না। তুমি দরজা কোথায় খুললে? তুমি তো অজ্ঞান ছিলে বিছানাতেই। আমরা দেখে বুঝতে পারিনি তোমার শরীরে প্রাণ আছে কি নেই। সম্পূর্ণ অন্ধকার ঘর – ও বাড়িতে তো কোনও ইলেক্ট্রিক কানেকশন নেই...”
মোহন বললেন, “না, ইলেক্ট্রিক ছিল তো। আলো, পাখা, এ-সি সবই চলত... শুধু সেদিন...”
অধীর একটু জোর দিয়ে বললেন, “মোহন, ওই বাড়িটায় কোনও ইলেকট্রিক কানেকশন নেই... শুধু ফ্ল্যাটে না, সারা বাড়িতেই নেই। ও বাড়িতে কেউ থাকে না। ওটা পোড়ো বাড়ি।”
মোহনের খেয়াল হল, বললেন, “কিন্তু কেউ থাকে না কেন? শহরের ওরকম প্রাইম এলাকায়...”
অধীর বললেন, “ওটা ওই প্রোমোটারের নিজের বাড়ি ছিল। খুব খারাপ কনস্ট্রাকশন। আলো-হাওয়া নেই, জল নেই, লিফট নেই... ওতে সেই সব ফ্যামিলিদের টেম্পোরারিলি থাকতে দিত, যাদের জমি নিয়ে নতুন ফ্ল্যাটবাড়ি বানাচ্ছে। বাড়ি হয়ে গেলে শিফট করে দিত। কোনও কিছুই ঠিক নেই ও বাড়ির – এমনকি প্ল্যানিং পারমিশনও ছিল না। তারপরে রাজারহাটে না কোথায় দু-নম্বরী করতে গিয়ে কী একটা পলিটিক্যাল ঝামেলায় অ্যারেস্ট হয়ে গেল। পুলিস কাস্টডিতে হার্ট অ্যাটাক হল, কিছুদিন পরে মরেও গেল। বাচ্চা ছেলে, কত আর বয়স হবে, তিরিশের কোঠায়। কিন্তু ভীষণ খেত আর ওভারওয়েট ছিল। ওর বাবা আর প্রোমোটারি করে না। ও বাড়িও আর কোনও কাজে লাগে না। বিক্রি-টিক্রি করার চেষ্টা করেছে, কিন্তু ওটা কে কিনবে? আজকাল আইন অনেক কড়া। ওই সরু গলিতে অত উঁচু বাড়ি করতে দেবে না। আর অন্তত আট-দশটা ফ্ল্যাট না হলে পড়তায় পোষাবেও না। সুতরাং...”
মোহনের মাথায় আবার প্রধান প্রশ্নটা ফিরে এল। “কিন্তু মেয়েটা? যে মেয়েটা আমার সঙ্গে... ও লিসা নয়? তাহলে ও কে?”
এবার দুজনেই কিছুক্ষণ চুপ করে রইলেন। তারপরে কবরী বললেন, “তুমি তো আমাদের বাড়িতে লিসার অনেক ছবি দেখলে – ছোটো থেকে বড়ো অবধি। তুমি বলতে পারবে না, মেয়েটা কে?”
শিরদাঁড়া দিয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নেমে গেল মোহনের। হতবাক হয়ে চেয়ে রইলেন, কিছু বলতে পারলেন না।
কবরী বললেন, “আমাদের মনে হচ্ছে, ও বাড়িতে লিসা নানা পুরুষকে ছল করে নিয়ে আসে। এবং তারপরে তাদের মেরে ফেলে, যেমন তোমাকে মারতে চেষ্টা করেছিল।”
অধীর বললেন, “এবং ভবিষ্যতেও হয়ত আবার হবে এই একই ব্যাপার। কে জানে, কতদিন চলবে... আমরা গয়ায় পিণ্ডও দিয়েছি। কোনও লাভ হয়নি।”
ওদের কী মাথা খারাপ? ভাবতে শুরু করেও মোহন থেমে গেলেন। বললেন, “কিন্তু আমি একা ওকে দেখিনি, অনেকে দেখেছে, ওকে ইভেন্ট ম্যানেজমেন্টের লোকেরা চাকরি দিত...” বলতে বলতে থেমে গেলেন। মনে হল, সত্যিই কি দিত? এমনকি যে কনফারেনসে ওঁর সঙ্গে মোনালিসার দেখা হয়েছে, সেটাতেও কি উনি ছাড়া কেউ মোনালিসাকে দেখতে পেয়েছিল? উনি জানেন না... কিন্তু... “মানদা? মানদা নিশ্চয়ই দেখেছে?”
“মানদা কে?” অবাক হয়ে জানতে চাইলেন কবরী।
“ওই যে, কেয়ারটেকারের বউ, যে নিচের ঘরে থাকত...”
মাথা নেড়ে অধীর বললেন, “কেউ থাকত না, মোহন। ঘরটা তালাবন্ধ। ও বাড়িতে একটাও মানুষ থাকে না।”
মোহনের হঠাৎ একটা কথা মনে হল, বললেন, “আপনারা বললেন ও বাড়িতে আরও পাঁচজনের মৃত্যু হয়েছে। তারা কারা ছিল?”
অধীর মাথা নাড়লেন। বললেন, “সেরকম কেউ না। কেউ হয়ত ক্লার্ক, কেউ অফিসার। একজন ছিল বিজনেসম্যান... নানা লোক...” মাথা নাড়লেন অধীর। “সেরকম কোনও লিঙ্ক ছিল বলে তো আমরা জানি না।”
কবরী বললেন, “তোমার যা যা কিছু ওখানে ছিল, আমরা নিয়ে এসে আমাদের কাছেই রেখেছি। পরে নিয়ে নিও।”
ওঁরা ওই বাড়িতে নেই? ও, না, ওটা তো ওঁরা বলছেন বাসযোগ্যই নয়। বললেন, “আপনারা কোথায় আছেন?”
অধীর বললেন, “দেশপ্রিয় পার্কের কাছে একটা লজে। ওই একটা কী হিন্দি সিনেমা হয়ে বিখ্যাত হয়ে গিয়েছিল... ওই লজটা – কী যেন নাম।”
অধীর আর কবরী চলে যাবার পরে মোহন সেক্রেটারিকে ডাকলেন। বললেন, “শোনো। দেশপ্রিয় পার্কের কাছে একটা বিখ্যাত লজ আছে, তাতে নাকি কোন হিন্দি সিনেমার শুটিং হয়েছিল... জানো?”
আনোয়ার সব জানে। মাথা নাড়ল। মোহন বললেন, “যাও, ওখানে বন্দোবস্ত করে এসো, যাতে মিঃ আর মিসেস রায়চৌধুরীর সব খরচ আমার অ্যাকাউন্ট থেকে দেওয়া হয়। কোনও ওজর আপত্তি শুনবে না। কার্ডে অটো ডেবিট করে আসবে। বুঝলে?”
“হ্যাঁ স্যার।”
“ওঁরা এ কদিন যাতায়াত করেছেন কী করে? নিজেদের গাড়ি, না উবার?”
“নিজেদের গাড়িতেই, স্যার।”
“মিসিরকে বলো, আপাতত তো আমার ডিউটি করতে হচ্ছে না – অন্য গাড়িটা নিয়ে রোজ ওঁদের ডিউটি করবে। ওঁরা যতদিন থাকবেন, ততদিন। যদি আমার ডিসচার্জের পরে কিছুদিন দরকার হয়, আমি মিসিরের ভাইপোকে ডেকে নেব, বা তুমি গাড়ি চালাবে। ওকে?”
ঘাড় নাড়ল আনোয়ার।
“আর ওঁদের কাছে আমার কিছু পার্সোনাল জিনিসপত্র আছে। সেগুলো নিয়ে নেবে। জামাকাপড়গুলো ওই চ্যারিটিতে দিয়ে দেবে। কী যেন নাম?”
“সামারিটান, স্যার...”
“ইয়েস। সামারিটান। আর পেপার্স যা আছে, আনোয়ার শা-র ফ্ল্যাটে রাখবে।”
“হ্যাঁ, স্যার।”
“যাও।”
~নয়~
দু-সপ্তাহ পরে অফিসে ফিরলেন মোহন। আনোয়ার এসে একটা সিল করা বড়ো খাম রাখল টেবিলে। ব্রাউন পেপারের খাম, ওপরে মোটা কালির কলমে মোহনের নাম লেখা। আর লেখা, ‘আর্জেন্ট অ্যান্ড পার্সোনাল’।
“কী এটা?” জানতে চাইলেন মোহন।
“নিখিল রক্ষিতের অফিস থেকে কাল দিয়ে গেছে, স্যার। আপনি কি কিছু কাজ দিয়েছিলেন...?”
খামটা খুলে রক্ষিত এজেনসির নাম লেখা একটা ফাইল বেরোল। বেশ মোটা। খুলে পাতা উলটে দেখলেন তাতে রায়চৌধুরীদের সম্বন্ধে, মোনালিসার সমন্ধে, কলকাতার বাড়ি সম্বন্ধে পাতার পর পাতা লেখা।
পরে পড়তে হবে। সরিয়ে রাখলেন। আনোয়ার এবারে পেন্ডিং কাজগুলো এগিয়ে দিল।
সন্ধেবেলা বাড়িতে গিয়ে এক পেগ হুইস্কি সহযোগে ফাইলটা নিয়ে বসলেন মোহন। অধীর আর কবরী রায়চৌধুরীর সম্বন্ধে নতুন যতটুকু লেখা, সেটা জরুরি না। মোনালিসা সম্বন্ধে অনেক অজানা তথ্য, কিন্তু সবচেয়ে জরুরি তথ্য, প্রায় ন’বছর আগে তার মৃত্যুর কথা।
শুধু তাই না, বাড়িটায় অজস্র মৃত্যুর কথা বেশ ডিটেলে লেখা। সেই সঙ্গে এ-ও পরিষ্কার, যে পুলিশ কোনও রহস্যেরই সমাধান করতে পারেনি। বরং শেষ দুটি মৃত্যুর প্রায় কোনও তদন্তই পুলিশ করেনি – আগে থেকেই ধরে নিয়েছে, সমাধান হবে না।
অধীর আর কবরীর সঙ্গে কথা হবার পরদিনই ফোন করে রক্ষিতকে বলেছিলেন, ওই পাঁচজন, যারা ওই বাড়িতে মারা গিয়েছেন, তাদের সম্বন্ধে যতটা সম্ভব ডিটেল মোহনের চাই।
সেই ডিটেল রক্ষিত দিয়েছে। দু-তিন বার করে পড়লেন মোহন। অধীর লিঙ্ক পাননি। মোহনও একটাই লিঙ্ক পেলেন। বা দুটো। যারা ওই বাড়িতে মারা গিয়েছে, তারা সকলেই ডিভোর্সি। ওই গাইয়েও। এবং সকলেরই ডিভোর্সের একটা বিশেষ কারণ হল ডোমেস্টিক ভায়োলেনস। মোহিনীর শেষ কথাটা মনে পড়ল।
অনেক রাতে, অনেকটা হুইস্কি, আর প্রায় ডিনারে প্রায় কিছু না খেয়েই শুতে গেলেন মোহন।
মোবাইলের শব্দে ঘুম যখন ভাঙল তখন রাত কত জানেন না মোহন। কটা বাজে? এত রাতে ফোন করার মতো আর কেউ তো বাকি নেই তাঁর জীবনে? হাত বাড়িয়ে ফোনটা নিতে গিয়ে তার স্ক্রিনে ফুটে ওঠা ছবি আর নাম চোখে পড়ায় একমুহূর্তে ঘুম আর যতটুকু হুইস্কির নেশা ছিল চলে গেল। হাত থেকে পড়ে গেল ফোনটা। একটুক্ষণ প্লাগে লাগানো চার্জিং কেব্ল-এর সঙ্গে লেগে থেকে দুলল, তারপরে ঠক করে খুলে পড়ে গেল মাটিতে। রিংটোনটা সাইলেন্ট হয়ে গেলেও আলো জ্বলতে থাকল, আর মোনালিসার চোখদুটোও চেয়ে রইল ওঁর দিকেই।
মন্ত্রমুগ্ধের মতো দেখতে থাকলেন যতক্ষণ না ফোনটা বেজে বেজে থেমে গেল। কোত্থেকে আসছে ফোন? হাসপাতালের বিছানা থেকে অজস্র ফোন করেছেন মোহন। বার বার ফোন করেছেন অধীর আর কবরী। প্রতিবার শোনা গেছে,‘দিস টেলিফোন নাম্বার ডাজ নট এক্সিস্ট।’ বা, ‘প্লিজ চেক দ্য নাম্বার ইউ হ্যাভ ডায়াল্ড।’ তাহলে?
ফোনের আলোটা নিভে যাওয়া মাত্র যেন ধড়ে প্রাণ ফিরে এল মোহনের। লাফ মেরে খাট থেকে উঠে বাথরুমে গিয়ে মুখে চোখে জল দিয়ে এলেন। তোয়ালে দিয়ে মুখ মুছতে মুছতে শোবার ঘরে ফিরলেন যখন, তখন মাটিতে পড়া ফোনটা আবার বাজছে। আবার মোনালিসা তাকিয়ে আছে মোহনের দিকে।
ওদিকে না তাকিয়ে ক্ষিপ্রহাতে আলমারি খুলে পোশাক পরলেন মোহন। ড্রেসিং টেবিল থেকে মানিব্যাগ আর মাটি থেকে ফোনটা কুড়িয়ে নিয়ে, চার্জারটা প্লাগ থেকে খুলে তারটা গুটিয়ে নিলেন। ঘর থেকে বেরিয়ে বাইরের ঘরে গিয়ে জুতো পরতে পরতে ফোন করলেন আনোয়ারকে।
আনোয়ারের নানা গুণের মধ্যে অন্যতম হল ওর ঘুম ভাঙতে দেরি হয় না। চট করেই উত্তর দিল, ঘুম জড়ানো গলায়, “স্যার?”
লিফটের জন্য অপেক্ষা করতে করতে মোহন এক এক করে নির্দেশগুলো দিয়ে দিলেন। এই ফোনের পরেই উনি ফোন বন্ধ করে দেবেন। বাকি রাতটা থাকবেন পার্ক হোটেলে। পৌঁছে হোটেলের ফোন থেকে মোহন বলে দেবেন ঘরের নম্বর। আগামী কাল সকালে দোকান খোলার পরে আনোয়ার যেন একটা নতুন সিম কার্ড নিয়ে আসে। মোহনের সব ডিটেল সঙ্গে নিয়েই যেন যায়। আনোয়ারের এফিশিয়েনসি দেখার মতো। বলল, “আমার কাছে একটা স্পেয়ার সিম আছে স্যার। আপনার যদি লাগে – রাতের জন্য, আমি কি পার্ক হোটেলে নিয়ে আসব? প্রি-পেইড সিম, আমি এক্ষুনি রি-চার্জ করিয়ে নিচ্ছি?”
মোহন বললেন, এক্ষুনি লাগবে না। চিন্তা নেই। কাল সকালে আনলেই হবে। ততক্ষণ যদি কোনও দরকার হয়, মোহন হোটেলের ফোন থেকেই ফোন করবেন।
বেসমেন্টে কার-পার্ক। লিফটেই সিগন্যাল চলে গেল, মোহনও ফোন সুইচ অফ করে দিলেন। আলোটা নেভামাত্র ফোনটা আবার বাজতে শুরু করল। আবার মোনালিসার মুখের ছবি ফুটে উঠল। চমকে উঠে মোহন দেখলেন, মোনালিসার ছবিটা বদলে গেছে। আগে যেটা আসত তাতে ওর হাসিটা ছিল মিষ্টি। এখন যে হাসিটা, সেটা ক্রূর। চোখদুটো যেন ধকধক করে জ্বলছে। বেসমেন্টে লিফট থামল, দরজা খোলামাত্র মোহন বেসমেন্টের মাটিতেই আছাড় মেরে ফোনটা টুকরো টুকরো করে ফেললেন। হোটেলে গিয়ে আনোয়ারকে ফোন করে বলতে হবে সিম-কার্ডের সঙ্গে একটা নতুন ফোন আনতে। দরকার পড়লে আর মোবাইল ব্যবহারই করবেন না মোহন... সেই সঙ্গে আনোয়ারের পিসেমশাইকে ডাকতে হবে। সাদিক ওঁর সবকটা ফ্ল্যাট যেন বিক্রির প্রোসেস শুরু করে। ইমিডিয়েটলি।
বিরাট গাড়িটা মাল্টিস্টোরিড কমপ্লেক্সের গেট দিয়ে বেরিয়ে গভীর রাতের খালি রাস্তা বেয়ে চলল তিরবেগে। দেখতে দেখতে সাদার্ন অ্যাভিনিউ পার করে মিন্টো পার্কের দিকে ছুটল গাড়ি। এলগিন রোডের মোড়ে এসে গাড়ির গতি কমালেন মোহন। বাঁদিক দিয়ে কি একটা গাড়ি আসছে? তার হেডলাইটের আলো কি দেখা যাচ্ছে? একই সঙ্গে মনে হল পেছন থেকেও যেন একটা গাড়ি আসছে খুব জোরে? রেয়ার ভিউ মিররে তার আলো?
রাস্তা থেকে চোখ তুলে আয়নায় রাখামাত্র পেছনের সিটে যাকে বসে থাকতে দেখলেন, তাকে দেখে মোহনের সমস্ত হিসেব গুলিয়ে গেল। সজোরে ব্রেক মেরে গাড়িটাকে প্রায় থামিয়ে দিলেন, যার ফলে পেছন থেকে ধেয়ে আসা ট্রাকটা সর্বশক্তি দিয়ে ধাক্কা মারল। মোহনের বিশাল গাড়িটা দুটো পাক খেয়ে গিয়ে পড়ল এলগিন রোড ধরে ধেয়ে আসা ট্যাক্সিটার সামনে। ট্যাক্সির ধাক্কায় উল্টেপাল্টে গিয়ে থামল ও দিকের ফুটপাথের ওপর। আসেপাশের লোকজন যতক্ষণে ঘুম ভেঙে ছুটে এসেছে, ততক্ষণে আর করার কিছুই নেই।
পরদিন সকালে কবরী চায়ের কাপ রাখলেন অধীরের সামনে। নির্বাক অধীর কাগজটা এগিয়ে দিলেন। নিঃশব্দে খবরটা পড়ে কবরী বিস্ফারিত চোখে অধীরের দিকে তাকিয়ে বললেন, “তাহলে, আইনি হোক, বে-আইনি হোক, টেরেস-এর ওই ফ্ল্যাটটা ভেঙে ফেললেও মুক্তি নেই মনে হয়।”
অধীর দীর্ঘশ্বাস ফেলে বললেন, “মনে হয়...”

No comments: