ভোর থাকতেই পাখিটার ঘুম ভাঙে রোজ। আজও ভাঙল। বাইরে এখনও আলো ফোটেনি, বাসার মধ্যে তাই ঘন অন্ধকার। ওর নড়াচড়ায় ঘুম ভেঙেছে ওর সাথীরও। দুজনেই সাবধানে নড়াচড়া করল। ওদের বাসায় এখন তিনটে নতুন ডিম। কাল রাতে ডিম পেড়েছে ওর সাথী।
বেরোবার গর্ত দিয়ে মাথা বের করল। শুধু ভোরের অন্ধকার নয়, ওদের বাসার সামনে একটা বড়ো ঝোপ মাথা ঝুঁকিয়ে পর্দার মতো আব্রু তৈরি করেছে। আরও অন্ধকার হয়ে আছে জায়গাটা। ওরা নানা জায়গায় বাসা বানায়। কখনও গাছের কোটরে, কখনও মাটিতে গর্ত করে। ওদের এই বাসাটা নতুন জায়গায়। একটা খালের পাড়ে, জল থেকে কিচু দূরে, একটা মাটির দেওয়ালের ভেতরে।
মাথা বের করে এদিক ওদিক দেখল ও। তারপরে গর্তের ছোট্টো মুখটা দিয়ে বেরিয়ে এল ঠেলেঠুলে। চট করে খাবার খেয়ে ফিরে আসতে হবে। খাবার নিয়ে আসতে হবে সাথির জন্য। দেরি করা চলবে না। ডিমগুলো রাত থেকে ওদের শরীরের গরমে আস্তে আস্তে গরম হচ্ছে।
চারিদিকে গাছের ডালে ডালে পাখিরা জেগে উঠছে। সবার আগে ওঠে কাক। ওরা সবার আগে গাছ থেকে নেমেও আসে। কিন্তু খায় না। এদিক-ওদিক দেখে আবার উড়ে গাছের ডালে উঠে যায়। এখন অবশ্য আরও সকাল হয়েছে। পূবের আকাশ ফর্সা। এখন পাখিরা বাসা ছেড়ে বেরোচ্ছে, উড়ে যাচ্ছে এদিক ওদিক, খাবার খুঁজছে।
গর্তের বাসা ছেড়ে উড়ল পাখিটা। বাসাটা একটা খালের ধারে। খালের দু-দিকে খানিকটা করে খালি জমি, তারপরে মানুষের বাড়ি। খালি জমিটায় অনেক গাছ। এই গাছের গায়ে ওদের খাবার।
পাখিটা বেশ বড়োসড়। শালিকের চেয়েও একটু বড়ো। মাথাটা উঁচু মতো। তার উঁচু দিকটা লাল! দেখে মনে হয় পাগড়ি পরেছে সীমান্তের প্রহরী মিলিটারির মতো। ঠোঁটটাও বেশ পোক্ত। গা-টা সাদা-কালো, লেজটা পুরোই কালো, কিন্তু পাখাদুটো আগুনের রঙের। সোনালি শিখার মতো দেখায় যখন ও উড়ে যায়। তাই ওর নাম অগ্নিপক্ষ। ওর সাথি বলে আগুন-ডানা।
বাসা থেকে বেরিয়েই সোজা উড়ে গেল না। ছোটো ছোটো পায়ে লাফিয়ে লাফিয়ে একটু দূরের একটা ঝোপের আড়ালে বসে লক্ষ করল কেউ ওকে দেখেছে কি না। শত্রুর অভাব নেই। এই শহুরে আবহাওয়াতেও এই খালের দু-পাশের ঝোপে রয়েছে সাপ। আর রয়েছে বেজি। ওরা একে অপরের শত্রু হলেও, দুজনেই পাখির ডিম আর ছানা খেতে ভালোবাসে। কখনও একটা দুটো ভাম আর শেয়ালও দেখা দেয়।
খালের ধারের উঁচু গাছের গায়ে গিয়ে বসল আগুন-ডানা। আড়চোখে দেখে নিল, না... বাসার আসেপাশে দেখা যাচ্ছে না কাউকে। নিশ্চিন্ত হয়ে মন দিল খাওয়ার খোঁজার দিকে।
গাছের বাকলের নিচে পোকা থাকে। এখন বর্ষাকাল। পোকা অনেক। অনেক পোকা গাছের গায়ে, তার বাকলের ফাটলে ডিম পাড়ে। বাচ্চারা ডিম ফুটে বেরিয়ে কুরে কুরে গর্ত করে বাকলের নিচে চলে যায়। গাছের কাঠের মধ্যে ওরা থাকে, গাছের কাণ্ড থেকেই খাবার পায়। আগুনপাখার ভারি ঠোঁট ওই গাছের বাকল ফুটো করে ওদের বাইরে বের করে আনে। খায়।
গাছের গায়ে বেয়ে উঠতে উঠতে আগুন-ডানা দেখতে থাকল। ও জানে কোন ফুটোর নিচে পোকা থাকতে পারে। একটা করে সেরকম ফুটো পেলে মন দিয়ে কান পেতে শোনে। বাকলের নিচে পোকার চলার সরসর শব্দ শুনতে পায়। তারপরে ঠিক জায়গায় ঠোঁট দিয়ে মারতে শুরু করে...
https://www.youtube.com/watch?v=UEVcUu5iSXk
ঠক-ঠক-ঠক-ঠক-ঠক-ঠক-ঠক-ঠক-ঠক-ঠক.........।
ভোরের নিস্তব্ধতা ভেঙে ওর ঠোঁটের শব্দ ছড়িয়ে পড়ল চারি দিকে। একটু করে ঠোকরায়, আর শোনে — ঠোঁটের ফাঁক থেকে লম্বা, সরু লিকলিকে জিভ বেরিয়ে আসে — ঢুকে যায় সেই গর্তে, টেনে বের করে আনে মোটাসোটা একটা নধর পোকা।
https://www.youtube.com/watch?v=9VLYTXlCAWI
কপকপিয়ে খায়, আবার খোঁজে।
কিছুক্ষণ খেয়ে আগুন-ডানা ফিরে এল বাসায়, মুখ-ভর্তি ওর খাবার। ওর সাথীকে দিতে হবে। বেচারা গত-রাত থেকে কিছু খায়নি। ডিম পেড়েছে, তা দিয়েছে — এখন ওকে খেতে হবে।
দূরের তালগাছ থেকে সাঁ করে উড়ে এসে বাসা থেকে কিছু দূরে একটা ঝোপের ডালে বসল আগুন-ডানা। দেখে নিল চারিদিকে — না। কেউ ওর দিকে নজর দিয়ে নেই। শিকারী পাখি নেই, কাক-শালিক, ঝোপের মধ্যে বেজি, কেউ নেই।
উড়ে গিয়ে বসল গর্তের মুখে। ওর আসা বুঝতে পেরে ওর সাথী গর্তের মধ্যে আরও খানিকটা সরে গেল, যাতে ও ঢুকে খাবার দিতে পারে। মুখের সবটুকু খাবার সাথিকে খাইয়ে আগুন-ডানা তৈরি হলো আরও একবার বাইরে গিয়ে খাবার আনার জন্য।
কিন্তু বসতে না বসতেই কানে এল বাইরে একটা চিৎকার চেঁচামেচির শব্দ। একসঙ্গে বহু পাখি উড়ে উড়ে চেঁচাচ্ছে। এরকম উত্তেজনা সাধারণত হয় কেবল তখনই যখন আসেপাশে কোনও শিকারী প্রাণী থাকে। তাহলে কী...?
আর ডিমের ওপরে বসে থাকার কোনও মানেই হয় না। গর্ত থেকে বেরিয়ে এল আগুন ডানা আর ওর সাথী। এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল খালপাড়ের একটা জায়গায় তুমুল শোরগোল। বহু পাখি — কাক, শালিক, চড়াই — সবাই দল বেঁধে উড়ছে আর তারস্বরে চেঁচাচ্ছে।
এক লহমায় আগুন-ডানা বুঝতে পারল কী হয়েছে। ওখানে কোনও নড়াচড়া নেই, ওখানে গাছের পাতা দুলছে না, ঘাস নড়ছে না। তার মানে যে শিকারী প্রাণী ওখানে রয়েছে, সে হয় নড়ছে না, নইলে সে মাটির খুব কাছে। ওর চলায় কিছুই নড়ে না। মাটির এত কাছে একরকমই প্রাণী শিকার করে।
সাপ।
ততক্ষণে আগুন-ডানা আর ওর সাথী দুজনেই বাসা থেকে অনেকটাই দূরে। বিপদের সময়েও বাসা কোথায় সেটা কাউকে দেখান’ উচিত নয়। উড়ে গিয়ে কাছে পৌঁছে দেখল সাপই বটে। মস্ত দাঁড়াশ একটা। এমনিতে দাঁড়াশ ইঁদুর ধরে খায়। এক দিক থেকে পাখিদের বন্ধুও বটে। ওদের বাসার হদিস পেলে ইঁদুর বাচ্চা, ডিম সবই খায় — কিন্তু দাঁড়াশ বা অন্য সাপও পাখির ডিম, বাচ্চা — এসব খায় বইকি!
সর্বনাশ! ওদের বাসার দিকেই এগোচ্ছে! জেনে? না কি না-জেনে? না জানলেও, সাপ কাছাকাছি পৌঁছেই বুঝতে পারবে। ওরা লিকলিকে দু-ফলা জিভ দিয়ে হাওয়ায় ভেসে থাকা গন্ধ পায় — ওদের মুখের ভেতরে গন্ধ নেবার উপায় রয়েছে। আর একটু এগোলেই ওদের ডিমের গন্ধ পাবে। দেরি করা যাবে না।
অনেকটা ওপর থেকে ডানা বন্ধ করে তিরবেগে ঝাঁপ দিল আগুন-ডানা। ওরা কাঠঠোকরা, বাজপাখির মতো ঝাঁপ ওরা দিতে পারে না। কিন্তু এখন ওসব ভাবলে চলবে না। একটু পেছন থেকে সাপের মাথা লক্ষ করে ঝাঁপ দিয়ে শেষ মুহূর্তে দিক বদল করার ঠিক আগে সাপের মাথায় তীব্র একটা ঠোকর দিয়ে আগুন-ডানা আবার উড়ে গেল। চোখের কোণা দিয়ে দেখল ওর সাথীও ঠিক ওর পেছনে আসছে — ওই রকম গতিতে।
এতক্ষণ দাঁড়াশটা নিজের মতো এগোচ্ছিল। ওর ধারণা ছিল কাছেপিঠে কোথাও একটা পাখির বাসা আছে — সেখানে খাবার পাওয়া যাবে। চারিদিকে পাখিরা উড়ে উড়ে চিৎকার করছিল — সে দিকে বেশি নজর দেয়নি ও। পাখিরা সাধারণত সাপের খুব কাছাকাছি আসে না। তাই হঠাৎ খুব জোরে দুটো ঠোক্কর খেয়ে একটু হকচকিয়ে গিয়ে মাথা তুলে ওপর দিকে তাকাল। দুটো কাঠঠোকরা। খুব কাছে এসে গেছে।
দাঁড়াশ সাপ ফনা তুলতে পারে না, কিন্তু লম্বা বলে মাটি থেকে একটু মাথা তুলতে পারে। সেইভাবেই দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ। একটা শালিক পাখি এবারে নেমে এল ঠোকরাতে, কিন্তু বেশি কাছে এল না — কিন্তু দাঁড়াশটার নজর ঘুরে গেছিল শালিকের দিকে, সেই ফাঁকে আগুন-ডানা আর একবার ঠোকর দিয়ে উড়ে গেল।
এবারে অন্য পাখিরাও সাহস পেল। ওরা জানে না কেন দুজন কাঠঠোকরা বার বার সাপটার অত কাছে যাচ্ছে, কিন্তু দেখাদেখি দুটো কাকও উড়ে এল কাছে। এবারে সাপটা একটু কোণঠাসা হয়ে গিয়ে মাথা নামিয়ে আবার রওয়ানা দিল যেদিকে যাচ্ছিল সেদিকেই।
ওদিকেই যে ওদের বাসা!
প্রাণপণ চিৎকার করে ওর সাথী ঝাঁপ দিল আবার। আর তখনই আর একটা ঝোপ সরিয়ে বেরিয়ে এল, সরু, লম্বাটে চারপেয়ে প্রাণী — একটা বেজি। বেজিটাকে দেখে আগুন-ডানার সাথী কোনও রকমে ডানা ঝাপটে দিক বদল করে উড়ে গেল আবার দূরে। সব পাখিদের চিৎকার বেড়ে গেল অনেক গুণ। একটা নয়, একই সঙ্গে দুজন শত্রু!
সাপে বেজিতে চোখাচোখি হল এক লহমার জন্য। তারপরে দাঁড়াশটা দিক বদলে ঘুরে গেল খালের দিকে। পেছন পেছন গেল বেজিটা।
সাপটা আর অপেক্ষা করল না। খালের জলে নেমে গিয়ে শরীরটা ডুবিয়ে দিয়ে মাথাটা বের করে সাঁতার কেটে ওপারের দিকে চলে গেল। পাখিরা অনেকেই চেঁচামেচি করতে করতে উড়ে গেল ওর সঙ্গে। বেজিটা গেল না। জলের ধারে দাঁড়িয়ে রইল ঘাড় উঁচু করে — সামনের ডানদিকের পা-টা অল্প তুলে।
অন্য পাড়ে গিয়ে সাপটা কোথায় গেল দেখতে পেল না আগুন-ডানা। ও এদিকেই উড়ছে — ওর সাথীও। ওরা ওদের বাসা ছেড়ে বেশি দূরে যাবে না। বেজিটা এখনও কাছেই রয়েছে।
সাপটা চলে যাবার পরে ওপারের পাখির ডাক কমে এল। উড়ে চলেও গেল সবাই কোথায়। বেজিটা মাথা নামিয়ে দুটো লাফ মেরে চলে গেল কোনদিকে। ওদের দিকে এল না।
আগুন-ডানা আর ওর সাথী বাসা থেকে বেশ খানিকটা দূরে একটা গাছের নিচু ডালে বসে ওর চলে যাওয়া দেখল। তারপরে সাথীকে ওখানেই রেখে আগুন-ডানা উড়ে গেল একটু দূরের একটা গাছে। ওখানে ওদেরই মতন আরও দুজন কাঠঠোকরা উড়ে এসেছে। ওখানে কিছু খাবার পাওয়া যাবে।
আগুন-ডানার সাথী একটু অপেক্ষা করে এখানে ওখানে উড়ে গিয়ে টুক করে ঢুকে পড়ল বাসায় — ডিমে তা দিতে। সাপও ফিরে আসতে পারে, বেজিও আসতে পারে। কে জানে, আরও হয়ত অন্য শত্রুও আসবে আগামী দিনে। কিন্তু আজকের মতো ওরা বেঁচে গেছে। কাল কিছু হলে তার মোকাবিলা করতে হবে কালকেই।
No comments:
Post a Comment