ছোঁ মেরে আমার পাশ থেকে তেলেভাজার থালাটা সরিয়ে নিয়ে মেসিমামা বলল, “খড়গপুর না, খড়গপুর না – খড়্গপুর। তোর মামারা তোকে কিছু শেখায় না নাকি?”
আমিও ছাড়বার পাত্র নই। বললাম, “ওই তো মেজোমামা। জিজ্ঞেস করো।”
মেসিমামা যেমনি পেছনে মাথা ঘুরিয়েছে, আমি থালা থেকে বাকি চারটে তেলেভাজা তুলে নিয়ে মেরেছি দৌড়। মেসিমামা, “অ্যাই পটকা...” বলে তাড়া করেছে – আমার দু-হাত গরমে জ্বলছে, কিন্তু সেই নিয়েই বারান্দা থেকে বাগানের মধ্যে লাফ মেরে পেছনের দরজা দিয়ে দৌড়ে ঢুকেছি। মেসিমামা পেছন পেছন এসেছে, কিন্তু কলতলায় দিদিমা বাসন ধুচ্ছে, তাই আর আসতে পারছে না। আমি ধীরে সুস্থে বারান্দা দিয়ে হেঁটে রান্নাঘরে গিয়ে বড়োমামীমাকে বলেছি, “মেসিমামা এসেছে, ওর জন্যও দুটো তেলেভাজা দাও না...”
ছোটোমামীমা বলল, “আজও এসেছে? কেন এই সময় আসে? ভেতরে যেন আসে না। বারান্দায় বসা। ছোটোমামাকে বলেছিস?”
আমি বললাম, “আমার পেছনে পেছনে খিড়কির দরজা অবধি এল। তারপরে আর এল কি না দেখিনি।”
ছোটোমামীমা, “এই মেসিটাকে নিয়ে যদি পারা যায়...” বলে বেসন মাখা হাতেই রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে গেল। শুনতে পেলাম, দূর থেকে মেসিমামাকে বলছে, “বারান্দায় বসো। বন্ধুকে পাঠাচ্ছি।”
ফিরে এসে বলল, “এই সময়ে পাড়া বেড়ানোর কী দরকার? এই খড়গপুরের লোকগুলোর কোনও দিন গম্যি হবে না। কী বলেছি আমি, বড়দি...”
বড়োমামীমা চিরকালই কম কথা বলে। আমার হাতে একটা থালায় চার পাঁচটা তেলেভাজা দিয়ে বলল, “যা, এটা নিয়ে যা। দেখিস, ও যেন বারান্দার ওই দিকে বসে। আর তুইও যেন ছ’ফুটের মধ্যে যাবি না। মনে থাকবে?”
থালা হাতে নিয়ে ভালো ছেলের মতো ঘাড় নাড়লাম। এই ছ’ফুটের গল্পটা আমাদের জ্বালিয়ে মারছে এক মাস হলো। শুধু আমাদের না, শুনছি সারা দুনিয়াকেই জ্বালিয়ে মারছে। চীন দেশে নাকি একটা কোন ভয়ঙ্কর ভাইরাস দেখা দিয়েই, হইহই করে সারা পৃথিবীতে ছড়িয়ে পড়েছে। আজকাল তো লোকে কথায় কথায় প্লেনে করে সারা দুনিয়া ঘোরে, তাই এর থেকে ওকে, তার থেকে আর একজনকে – চীন, ইতালি, ইংল্যান্ড, অ্যামেরিকার অবস্থা নাকি সাংঘাতিক। আমরা ইন্ডিয়াতে সবাই ঘরে বন্দী হয়ে আছি, যাতে এর থেকে ভাইরাস ওর ঘাড়ে না যায়। একে বলে লকডাউন। সবাই নতুন শব্দ শিখেছে কয়েকটা – কোয়ারান্টাইন, লকডাউন, আইসোলেশন, এইসব।
খড়গপুর এসেছি স্কুল ছুটি বলে। প্রত্যেক বছর একটা ছুটি পাই কারণ স্কুলে মাধ্যমিক-উচ্চমাধ্যমিক পরীক্ষার সিট পড়ে। এবারে বড়োমামা বোলপুর এসেছিল, আমি বললাম, আমি মামাবাড়ি যাব। ব্যাস, সেই যে এসেছি, একসপ্তাহ পর থেকে সবাই ঘরবন্দী।
না, সবাই না। বেশ কিছু লোক ইচ্ছে মতো ঘোরাফেরা করছে। টিভিতে দেখছি রোজ কলকাতায় পুলিশ লোককে লাঠিপেটা করছে। এখানে অবশ্য সেরকম কিছু হচ্ছে না। আর বোলপুর থেকে দিদি ফোন করে করে বলছে, ওখানেও মা-বাবাকে কথা শোনানো যাচ্ছে না। দু-বেলা দোকান বাজার খোলা, বাজারে তো বাবা রোজ যাচ্ছেই, তারপরে মা যদি সকালে দোকানে যাচ্ছে বাতাসা কিনতে, তো বাবা বিকেলে যাচ্ছে বিস্কুট-চানাচুর আনতে। বাবাকে নাকি কলকাতা থেকে বুটুদা ফোন করে বলেছে, যেও না। বাড়িতে থাকো। কিন্তু বুটুদার কথা বাবা যেন কতই শোনে! শুধু আমাকে আর দিদিকে বলার জন্য – দেখো, বুটুদা কত পড়াশোনা করে। এমনি এমনি তো আর ডাক্তারি পায়নি... ওরকম পারবে? আর দিদি যদি বলেছে – বুটুদা বলেছে বাড়ি থেকে না বেরোতে, তখন বলে – আরে রাখতো, দুদিনের বাচ্চা, এখন দু’পাতা ডাক্তারি পড়ে কাকাকে জ্ঞান দিতে এসেছে। দিদির ঘ্যানঘ্যান শুনতে শুনতে আমার কানের পোকা নড়ে যাচ্ছে দু-বেলা।
হাতে থালাটা নিয়ে রান্নাঘর থেকে বেরিয়ে দেখি দিদা বাসন নিয়ে কলতলা থেকে উঠে আসছে। এটাও আর এক সমস্যা। দিদা অন্য কাউকে দিয়ে ঠাকুরের বাসন মাজাবে না। বিশেষ করে মামীমাদের হাতে তো ছাড়বেই না। রোজ এই নিয়ে ছোটোমামী আর মামার মধ্যে কথা হয়। মামী বলে, “অন্তত এইদিকে একটা সিঙ্ক লাগিয়ে দাও। মা-কে তাহলে আর কলতলায় যেতে হবে না।” মামা বলে, “মা সেই সিঙ্কে থোড়াই বাসন মাজবে...” আর দিদা শুনলে বলে, “তোরা মিছে চিন্তা করিস। আমার কিচ্ছু হবে না।”
আমাকে দেখে দিদা বলল, “এই নাতি, ধর তো একটু এই থালাগুলো...” বলেই আমার ও হাতে পকোড়ার থালা দেখে বলল, “না, থাক। তুই আবার কী নিয়ে যাচ্ছিস। আমি এখানেই নামিয়ে রাখি...” বলে বারান্দার থামের পাশে নামিয়ে রেখে বলল, “যা, দেখ, ছোটোমামা কী করছে। মেসি তো দেখলাম বাড়িতেই ঢুকে পড়ে প্রায়।”
আমি ঘাড় নেড়ে থালা হাতে এগোলাম বারান্দা ধরে। মাঝামাঝি সিঁড়ি। দোতলায় যাবার। প্রায় পেরিয়ে গেছি, এমন সময় ছোটোমামা নেমে এল। বলল, “কী রে, হাতে?”
বললাম, “মেসিমামার জন্য পকোড়া।”
“দে, আমি নিচ্ছি,” বলে মামা আমার হাত থেকে থালাটা নিয়ে একটা পকোড়া নিয়ে তাতে কামড় বসাল। বলল, “আহা, বৌদি যা পকোড়া ভাজে না...”
আমি বললাম, “ছোটোমামী বেসন গুলে তাতে পেঁয়াজ ফেলে বড়োমামীকে দিচ্ছে।”
ছোটোমামা বলল, “হুঁ। দুই বউ মিলে দারুণ পেঁয়াজি ভাজে – মানতেই হবে।”
বারান্দার শেষে বসার ঘর। এ বাড়িতে বলে বৈঠকখানা। দাদু বসে সকালে আর বিকেলে। আর দাদুর বন্ধুরা এলে বসত। এখন দাদু আর বন্ধুরা পারলে আড্ডা চালিয়ে যেত, কিন্তু মামীমারা খুব কড়া করে বলে দিয়েছে, “বারান্দা থেকেই গল্প করুন, বাবা, কারওর বাড়িতে গিয়ে নয়, বন্ধুদের বাড়িতে ডেকেও নয়।”
মামীমাদের খুব ভয় করে দাদু। সেইজন্যই আমাদের বাড়িতে লকডাউনের নিয়ম মানামানি অনেক বেশি। একমাত্র মেসিমামাই...
ভালো কথা, মেসিমামা আমার মামা নয়। ছোটোমামার বন্ধু। পাড়ার জেরক্সের দোকান চালায়। আর ফুটবল খেলে। আমাকে বলেছিল মেসি-র মতো ড্রিবলিং শিখিয়ে দেবে। কিন্তু সে তো শিকেয় উঠেছে, তাই রোজ সকালে বিকেলে আমি একাই ফুটবলটা নিয়ে উঠোনে ড্রিবলিং করি। দুবেলা দিদা ঠাকুরের বাসন নিয়ে আসা অবধি। তারপরে আর ওখানে ছোটাছুটি বারণ।
ছোটোমামা বৈঠকখানার বাইরের দরজা খুলে বারান্দায় মেসিমামাকে বলল, “যা, শালা, ওই কোণাটায় গিয়ে বস।” তারপর বারান্দার মাঝখানের টেবিলটার ওপরে থালাটা রেখে বলল, “এই নে, পকোড়া খা।” আমি ততক্ষণে রোজের মতো ঘরের ভেতর থেকে প্লাস্টিকের চেয়ারটা নিয়ে বারান্দার দরজা দিয়ে বের করে দরজাটা আগলে রেখেছি। মামা আমাকে “থ্যাংক ইউ” বলে আরাম করে বসল।
মেসিমামার পরণে রোজের মতো Messi এবং 10 লেখা জার্সি। ছোটোমামীমা বলে ওর আর কোনও জামা নেই। শুধু মেসি-র নাম লেখা জার্সিই আছে। ও নাকি ছোটোমামার বিয়েতে নতুন একটা জার্সি পরে বরযাত্রী গেছিল, আর আর একটা নতুন জার্সি পরে বৌভাতে এসেছিল। সেই নিয়ে এখনও হাসাহাসি হয় মামাবাড়িতে।
মেসিমামা প্লেট থেকে পকোড়া নিতে গিয়ে থমকাল। বলল, “তুই আমার জন্য তিনটে পকোড়া এনেছিস? জানিস না কাউকে কিছু তিনটে দিলে ঝগড়া হয়?”
ছোটোমামা দরজা খোলার আগেই হাতের পকোড়াটা খেয়ে ফেলেছিল। তাই মেসিমামা সেটা দেখতেই পায়নি। মামা নির্বিকার মুখে আর একটা পকোড়া তুলে নিয়ে কামড় দিয়ে বলল, “বেশ, এখন আর ঝগড়া হবে না।”
মেসিমামা শেষ পাকোড়াওয়ালা প্লেটটা নিয়ে দূরে গিয়ে বসল। গজগজ করতে করতে বলল, “এই না হলে বন্ধু?”
আমি দেখলাম দুজনের ঝগড়া লাগে লাগে। বললাম, “মেসিমামা বলছিল খড়গপুরের নাম খড়গপুর না। খড়্গপুর। তাই নাকি ছোটোমামা?”
ছোটোমামা বলল, “কোনও কোনও বাঙালিরা তাই বলে বটে... কিন্তু বাকি সবাই বলে খড়গপুর।”
মেসিমামা তেড়ে উঠে বলল, “কোনও কোনও বাঙালিরা আবার কী? কোন বাঙালি বলে না রে? নিশ্চয়ই তারা বাংলা জানে না।”
মামা রেগে গেল না। মামা মেসিমামার পেছনে লাগতে ভালোবাসে। তাই চুপ করে পকোড়াটা শেষ করতে করতে বলল, “আর কোন বাঙালি বলে জানি না, কিন্তু গত সপ্তাহ অবধি তুইও খড়গপুর বলতি। খড়্গপুর বলে খুব বুড়ো মানুষরা। আমার বাবাও বলে না।”
মেসিমামা তেড়ে ওঠার আগেই আমি আবার বললাম, “কিন্তু কেন? খড়্গপুর কেন?”
ছোটোমামা বলল, “দাদুকে জিজ্ঞেস করিস। ওই মল্লরাজদের ইতিহাস দাদু জানে। খড়্গমল্ল নাম ছিল সে রাজার। বিষ্ণুপুরে না কোথায় রাজধানী ছিল – ওরাই তো প্রথম হিজলিতে আসে।”
মেসিমামা বলল, “হিজলিতে আসে, না খড়্গপুরে আসে?”
ছোটোমামা বলল, “ওই তো, কিস্যু জানিস না। তখন খড়্গপুর খড়গপুর, যা-ই বল, কিছুই ছিল না। ওই খড়্গমল্ল রাজাই প্রথম এখানে রাজত্ব বিস্তার করেন। তারপরে কোনও সময় নাম হয় খড়্গপুর – অত ইতিহাস আমি জানি না। আর পরে যখন নানা দেশের লোকে থাকতে শুরু করে, তখন তারা খড়্গকে খড়গ করে দেয়। সে সব ইতিহাস নিশ্চয়ই কেউ জানে।”
আমি বললাম, “নানা দেশের লোক কেন থাকতে আসে?”
মেসিমামা বলল, “রেলওয়ের জন্য। খড়্গপুর মস্তো রেল স্টেশন। জানিস তো?”
জানি। ছোটোমামা বলেছে – ওই মস্তো রেলব্রিজের ওপর দাঁড় করিয়ে দেখিয়েছে কেমন রেল লাইন দেশের তিন দিকে বেরিয়ে গেছে – দিল্লি, বোম্বে, ম্যাড... না দিল্লি, মুম্বাই আর চেন্নাইয়ের দিকে।
মেসিমামা বলল, “খড়্গপুরে সব রকমের লোক পাবি। বেঙ্গল, বিহার, অন্ধ্র, কেরালা, কোন রাজ্যের লোক নেই? আমরা যখন ছোটো ছিলাম, তখন জানিস, এত আলো ছিল না। দূরে দূরে, টিমটিম করত। আলোর নিচটুকু বাদ দিয়ে রাস্তাগুলো অন্ধকার থাকত। আর সেই অন্ধকারে হেঁটে যেতে যেতে কথা শুনে, রান্নার গন্ধেই আমরা বুঝতাম, এইবারে বিহারিদের পাড়া, এখানে তেলেগু, এরা ক্রিশ্চান, ওরা মুসলমান। মুসলমান পাড়ায় এলে আমরা বুঝতাম এবারে আমাদের পাড়া।
আমি বললাম, “এটা মুসলমান পাড়া বুঝি?”
ছোটোমামা মাথা নাড়ল। বলল, “এ সব হিন্দু মুসলমান আমাদের এখানে ছিল না। ওই তো দেখেছিস – বাড়ি থেকে কতটুকুই বা দূরে ওই তো কবরস্তান। ওরই পাশে, মসজিদের মাঠে আমরা সবাই মিলে ক্রিকেট ফুটবল খেলতাম, কই, মৌলবীরা কোনওদিন বারণ করেনি। ওদের ছেলেরাও খেলতে আসত।”
হঠাৎ মেসিমামা বলল, “তোর মনে আছে, আমরা কবরখানায় ভূত দেখতে গেছিলাম?”
ছোটোমামা হাসল। বলল, “মনে আছে। তুই গোবরে পড়ে গেছিলি।”
মেসিমামা রেগে বলল, “তোর যত আজেবাজে কথা মনে থাকে। নিজে তো যাসইনি। বাড়িতে বসেছিলি ভয় পেয়ে।”
এবার মামা রেগে গেল। বলল, “মোটেই ভয় পেয়ে না। তুই ভালো করে জানিস কী হয়েছিল। খিড়কির দরজার ছিটকিনি হাতে পাইনি, তাই বালতি উলটে তার ওপর দাঁড়িয়ে খুলছিলাম। আর বালতি নড়বড় করে পড়ে গিয়ে ধরা পড়ে গেছিলাম। বললেই হলো আমি ভয় পেয়েছিলাম?”
মেসিমামা বলল, “যা-ই হোক। রাত্তিরে অত্তগুলো ভূত যে আমাদের ধরেনি...”
আমি উৎসাহিত হয়ে বললাম, “ভূত দেখেছিলে?”
মেসিমামা বলল, “দেখিনি আবার! মামদোভূত। ধরতে এসেছিল আমাদের। আমি আর নিশ্চলদা।”
মামা বলল, “কিস্যু দেখিসনি। বাজে কথা। ফালতু ভয় পেয়েছিলি।”
মেসিমামা বলল, “আলবাত দেখেছি। তুই থাকলে তুইও দেখতি। আমিও দেখেছি, নিশ্চলদাও দেখেছে। সে জ্বলজ্বলে চোখ, আগুন বেরোচ্ছে, পায়ে পায়ে এগোচ্ছে আমাদের দিকে... দিকবিদিক জ্ঞানশূন্য হয়ে দৌড়েছি... তখনই তো গোবরের গাদায় পড়েছিলাম...”
আমি খুব উত্তেজিত হয়ে জিজ্ঞেস করলাম, “তারপর?”
কিন্তু তারপরে আর জানা হলো না। বড়োমামীমা এসে বলল, “ঠাকুরপো, বাবা উঠেছেন। যাও, গিয়ে নিয়ে এসো।”
দাদু রোজ বৈঠকখানায় বসে খোলা দরজা দিয়ে বাইরেটা দেখেন। ছোটোমামা উঠে দাঁড়াল। মেসিমামাও বলল, “আমি আসি রে আজ...” মেসিমামা এখনও দাদুকে যমের মতন ভয় করে। ছোটোমামা প্লাস্টিকের চেয়ারটা নিয়ে ঘরে গেল, মেসিমামা সিঁড়ি দিয়ে নেমে গেল। আমি পকোড়ার প্লেট দুটো তুলে নিলাম রান্নাঘরে নিয়ে যাব বলে। মেসিমামা খানিকটা গিয়ে আবার দু-পা ফিরে এল। বলল, “পরাগদা এসেছে নাকি রে?”
আমি বললাম, “কই, না তো? এখন তো লকডাউন... কলকাতা থেকে আসবেই বা কী করে?”
“তবে যে তখন বললি, মেজোমামা...”
এতক্ষণে মনে পড়েছে। মেসিমামা মেজোমামাকে সবচেয়ে বেশি মানে বলেই তেলেভাজা নেবার সময় মেজোমামার নাম বলেছিলাম। মেসিমামার মুখটা মনে পড়েই হেসে ফেললাম। মেসিমামা রেগে বলল, “তুই একটা মহা...” তারপরেই হঠাৎ খেয়াল হওয়া ভঙ্গীতে বলল, “অ্যাই, যাবি রাত্তিরে?”
আমি থমকে গিয়ে বললাম, “কোথায়?”
মেসিমামা বলল, “কবরস্তানে? মামদোভূত দেখতে?”
আমি বললাম, “এই সময়ে রাত্তিরে বেরোলে যদি পুলিশ দেখতে পায়, তাহলে সোজা জেলে নিয়ে যাবে, জানো?”
মেসিমামা বলল, “আরে, না না। আমি সাবধানে নিয়ে যাব তোকে। যাবি?”
হঠাৎ উত্তেজনা পেয়ে বসল। বললাম, “কখন?”
মেসিমামা বলল, “রাতে। তিনটের সময়। উঠতে পারবি?”
বললাম, “হ্যাঁ। অ্যালার্ম দিয়ে রাখব।”
মেসিমামা বলল, “দাঁড়া, ভালো করে প্ল্যান করতে হবে। তোর মোবাইল আছে তো?”
আমি ক্লাস সেভেনে পড়ি। আমার মোবাইল না থাকলে চলে? শুনছি শিগগিরই ফোনেই ক্লাস শুরু হবে। স্যারেরা বাড়ি থেকেই ক্লাস নেবে। সে কী করে হবে অবশ্য এখনও জানি না। ফোনটা পকেট থেকে বের করে বললাম, “তোমার নম্বর বলো।”
চট করে মেসিমামার নম্বরটা সেভ করে একটা মিসড কল দিলাম। মেসিমামা বলল, “আমি ভালো করে ভেবে নিই। তোকে হোয়াটস-অ্যাপে জানাচ্ছি।”
ভেতরের দরজায় দাদুর গলা পেলাম। “দাদুভাই, তুমি বারান্দায় নাকি?”
মেসিমামা বলল, “ওই রে, আমি চলি...” বলে বাগানের দরজা খুলে চলে গেল। আমি ভেতরে গিয়ে বললাম, “এই যে দাদু।”
দাদু বলল, “কার সঙ্গে কথা বলছিলে?”
বললাম, “মেসিমামা এসেছিল। চলে গেছে।”
দাদু নাক দিয়ে হুঁঃ করে একটা শব্দ করে নিজের ইজি চেয়ারে বসে বলল, “কোনও কাজের মধ্যে থাকে না ছেলেটা। এখন তো আরও দোকান টোকান বন্ধ। হাতে কী?”
আমি থালা দেখিয়ে বললাম, “পকোড়ার থালা।”
দাদু লাঠিধরা হাতটা একটু তুলে বলল, “যাও, রান্নাঘরে রেখে এসো। তারপরে বোসো আমার কাছে একটু। সোমু, আমার কোমরটা তোল তো...”
ছোটোমামা দাদুকে ভালো করে বসাতে বসাতে আমি রান্নাঘর থেকে ফিরে এলাম। ততক্ষণে বড়োমামাও দোতলা থেকে নেমেছে। এখন চায়ের আসর। এমনিতে এবাড়িতে চায়ের আসরেই প্রায় দশ-বারোজন হয় – আমরা ছাড়া সবাই দাদুর বন্ধু। এখন কেবল আমরা ছ’জন।
সবার হাতে চায়ের কাপ, আমার হট চকোলেট। বাড়িতে আমি চা কফি খাই, এখানে অ্যালাউ নয়। দাদু খুব স্পষ্ট করে বলে দিয়েছে, স্কুল ছাত্ররা চা খাবে না। তাই মামা আমার জন্য ড্রিঙ্কিং চকোলেট নিয়ে এসেছে। চকোলেটে চুমুক দিয়ে বললাম, “ছোটোমামা, ভূতের চোখ জ্বলে?”
বড়োমামা অবাক হয়ে বলল, “ভূতের চোখ? মানে?”
ছোটোমামা বলল, “মেসি এসেছিল। ওকে সেই ছোটোবেলায় কবরখানায় ভূত দেখতে যাওয়ার গল্প বলেছে।”
দেখলাম সবাই সেই গল্প জানে। আবার শুনতে হলো কী ভাবে ছোট্টোখাটো চেহারার ছোটোমামা বালতি উলটে উঠোনে গড়াগড়ি খেয়েছিল, তারপরে দাদুর থাপ্পড়!
ছোটোমামা বলল, “কত আর বয়স তখন আমার – এই তোর মতোই হবে।”
বড়োমামা বলল, “না, আর একটু ছোটো। আমার তখন ক্লাস এইট। তুই তাহলে ফাইভ।”
দিদা বলল, “মেসি-টা ছোটোবেলা থেকেই ভীষণ ডানপিটে ছিল। নামই ছিল ডাকু। সবাই উত্যক্ত হয়ে থাকত ওর দুষ্টুমিতে।”
ছোটোমামী মেসিমামাকে পছন্দ করে। বলল, “তা-ও, খুব পরোপকারী, মা। সারাক্ষণ অন্যের জন্য ভাবে। এটা মানতে হবে। সবার সব সমস্যায় মেসি হাজির।”
দাদু বলল, “সেটাও ওর দুষ্টুমিরই লক্ষণ। সারাক্ষণ এটা ওটা করে বেড়াচ্ছে। শুধু বড়ো হয়ে গিয়ে অত জ্বালায় না আর।”
আমার বুকটা ধুকপুক করে উঠল। মেসিমামা আমাকে নিয়ে কবরখানায় যাবে বলেছে। সত্যিই এখনও দুষ্টুমি বুদ্ধি কমেনি। তবে ভূতের ব্যাপারটা জানা হলো না। তাই আবার জিজ্ঞেস করলাম, “কিন্তু ভূত দেখেছিল তো?”
এবারে প্রায় সব্বাই হা হা করে হেসে উঠল। ছোটোমামা বলল, “জ্বলজ্বলে চোখ দেখেছিল। কোথায় জানিস?”
বললাম, “কোথায়? কবরখানায় দেখেনি?”
বড়োমামা বলল, “কবরখানাতেই দেখেছিল। কিন্তু কোথায়?” বলে হাতটা নামিয়ে প্রায় নিজের হাঁটুর কাছে এনে বলল, “এই হাইটে। মাটি থেকে এতটুকু ওপরে কিসের চোখ? মামদো ভূতের? মামদো ভূত কি হামা দিচ্ছিল নাকি?”
বললাম, “তাহলে?”
দাদু চায়ের কাপে শেষ চুমুক দিয়ে কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, “আরে, কুকুর ছিল নিশ্চয়ই। রাতের অন্ধকারে ঠিকমতো অ্যাঙ্গেলে আলো পড়লে জন্তু-জানোয়ারের চোখ জ্বলজ্বল করে। সেটাই দেখেছে।”
বড়োমামা বলল, “আর পাড়ার কুকুর তো! নিশ্চয়ই ওদের চিনতে পেরে চুপচাপ কাছে আসছিল – নইলে ঘেউঘেউ করে ডেকে পাড়া মাথায় করে দিত – ওরাও বুঝতে পারত।”
দিদা বলল, “তবে এটা মানতে হবে যে সেদিনের পরে ডাকুর দুষ্টুমি একটু কমেছিল। সন্ধে হলে আর বাড়ির বাইরে থাকত না বিশেষ।”
ছোটোমামা বলল, “এখনও ভীষণ ভূতের ভয়। রাত্তিরে কোথাও যেতে বললে একেবারেই রাজি হয় না। অন্ধকার ঘরে থাকে না। ভূতের গল্পটল্প হলে দিন হোক, রাত হোক, হয় বলে থাম থাম, নইলে চলে যায়।”
আমি প্রায় বলে ফেলেছি আর কী, ‘কেন, আমাকে যে বলল, ভূত দেখাতে নিয়ে যাবে? তাহলে?’ কোনও রকমে নিজেকে সামলেছি। একটু পরে দাদু বলল, “দাদুভাই, তুমি একটু পড়াশোনা নিয়ে বসো। ছাত্রাবস্থায় পড়াশোনার সময়ে অন্য কিছু করতে নেই...”
দাদু রোজই এক কথা বলে, আর এ বাড়িতে দাদুর কথার অন্যথা করবে এমন কেউ নেই। কিন্তু আমার মাথায় এখন অন্য চিন্তা। বললাম, “আমাকে খড়্গপুরের ইতিহাস পড়াবে?”
দাদু খুব উৎসাহিত হয়ে বলল, “খড়গপুরকে খড়্গপুর বলে তুমি কোথা থেকে জানলে? বেশ, বেশ। আজকের কাজ আজ শেষ করো, তারপরে কাল থেকে ইতিহাস।”
নিজের ঘরে গিয়ে পকেট থেকে মোবাইল বের করে দেখি মেসিমামা হোয়াটস-অ্যাপে একটা মেসেজ লিখেছে। ‘টুমরো।’ অর্থাৎ আগামীকাল। অর্থাৎ আজ নয়। ঠিক আছে, আমিও ‘ও.কে.’ লিখে পড়া নিয়ে বসলাম। সামান্যই কাজ দিয়েছিল দাদু, শেষ করে গল্পের বই পড়তে শুরু করলাম। কখন সন্ধে শেষ হয়ে গেছে, মামীমার ডাক শুনতে পেলাম, “খেতে আয়, পটকা।”
রাতে শুতে গিয়ে অনেকক্ষণ ঘুম এলো না। গত কয়েকদিন বৃষ্টি হয়ে একটু ঠাণ্ডা-ঠাণ্ডা ভাব হয়েছে। বিছানার পাশের জানলা দিয়ে শিরশিরে একটা ঠাণ্ডা হাওয়া আসছে। খেয়াল করলাম, দরজাটাও খোলা। দাদু বলে, বদ্ধ ঘরে শুতে নেই। রাতের তাজা বাতাসে বুদ্ধি খোলে। অবশ্য দরজাটা বন্ধ করতে বলে। নইলে একতলা বাড়িতে রাস্তার বেড়াল ঢুকে নোংরা করে যায় অনেক সময়।
দরজা বন্ধ করতে গিয়ে মনে হলো আর একবার বাথরুম করতে যাওয়া উচিত। এটা পুরোনো বাড়ি। ঘরের সঙ্গে অ্যাটাচড টয়লেট নেই। রান্নাঘর পেরিয়ে যেতে হবে।
আমার ঘরটা বাড়ির এক কোনে। আমার ঘরের বাঁ পাশে বসার ঘর। সামনে টানা বারান্দা। বসার ঘরের দরজার পরে বারান্দা ঘুরে গেছে ডানদিকে। আরও দুটো ঘরের পরে দোতলায় যাবার সিঁড়ি। বড়োমামা আর ছোটোমামা ওপরে। মেজোমামার ঘরও ওপরে। একতলায় সিঁড়ির পরে দাদু-দিদার ঘর। আগে দাদু-দিদার ঘরও ওপরে ছিল। কিন্তু দাদু সিঁড়িতে পড়ে গিয়ে চলাফেরা করতে অসুবিধা হয় বলে এখন ওরা নিচেই থাকে। তারপরে খাবার ঘর, আর তার উলটো দিকে রান্নাঘর। বাথরুম তার পরে।
বাথরুম করে ফিরে আসার পথে খেয়াল হলো আজ আকাশে চাঁদ বেশ বড়ো। কাল হয়ত পূর্ণিমা। আকাশ পরিষ্কার থাকলে জ্যোৎস্না থাকবে। ভূত দেখতে যাবার পক্ষে বেশ আইডিয়াল রাত হবে। ঘরে ফিরে দরজা ভেজিয়ে দিলাম। আমাদের ফ্ল্যাটে আমরা দরজা বন্ধ না করেই ঘুমোই। তাই আগল দিতে ইচ্ছে করল না। কেবল এঁটে দিলাম, টাইট করে। বাইরে থেকে জোরে ধাক্কা দিলে খুলে যাবে, কিন্তু বেড়াল খুলতে পারবে না।
বেড়ালের জন্য জানলায় জাল লাগানো। জালের পাল্লা খুলে হাত বাড়িয়ে জানলা বন্ধ করলাম। কিন্তু সবটা না। দাদুর কথা মেনে একটা জানলা অর্ধেক খুলে রাখলাম। পুরোনো দিনের কাঠের পাল্লা বন্ধ করায় বাইরের রাস্তার আলো কমে গেল। আমি মোবাইল খুলে বন্ধুদের পাঠানো হোয়াটস-অ্যাপ পড়ে ফোন বন্ধ করে পাশ ফিরে শুলাম। তারপরে বাড়ির পাশে টগরের ঝোপের পাতার ভেতরে হাওয়ার সরসর শব্দ শুনতে শুনতে কখন ঘুমিয়ে পড়েছি।
হঠাৎ ঘুম ভাঙল কখন জানি না। বাইরে হাওয়াটা বন্ধ হয়ে গেছে। পাতার সরসরানি আর নেই। কিন্তু আমার ঘুম ভেঙেছে একটা শব্দে। কিসের শব্দ? কিছুক্ষণ শুয়ে শুয়ে বোঝার চেষ্টা করলাম। কিছু শুনতে পেলাম না। সবে মনে হয়েছে, ভুল শুনেছি, পাশ ফিরে কোলবালিশটাকে জড়িয়ে আবার চোখ বুজেছি, ওমনি একটা টোকার শব্দ পেলাম। টক-টক-টক...
উঠে বসলাম। এই শব্দই শুনেছিলাম ঘুমের মধ্যে। একবার না, বেশ কয়েকবার। কোথা থেকে? দরজায় কেউ টোকা দিচ্ছে? দাদু? দিদা?
হঠাৎ মনে হলো দাদু বা দিদা অসুস্থ হয়নি তো? তাহলে হয়ত ডাকতে এসেছে। চট করে দরজা খুললাম। বাইরেটা খালি। উঠোনে এখনও চাঁদের আলো, কিন্তু বাড়ির পশ্চিমের দিকে চাঁদ হেলে গেছে বলে রান্নাঘরের দিকটা ছায়ায়। কিন্তু দাওয়ায় বা উঠোনে কেউ নেই। দাদু-দিদার ঘরের দরজাও বন্ধ। তক্ষুনি আবার শুনলাম। টক-টক-টক... ঠিক যেন পাথর দিয়ে কাঠে টোকা দিলে...
জানলায়। দরজা ছেড়ে জানলায় গেলাম। যে আধখানা পাল্লা খোলা ছিল, সেটুকু দিয়ে বাইরে বাগানের যতটুকু দেখা যাচ্ছে, কেউ নেই। তাই এক এক করে বন্ধ পাল্লাগুলো খুললাম। কেউ কোথাও নেই। এই ঘরের পাশেই খিড়কির দরজা। জানলা দিয়ে প্রায় অতটাই দেখা যায়। কেউ নেই।
একটু অপেক্ষা করলাম। মানে অত রাতে, অন্ধকারে, ঘুমচোখে যতটা অপেক্ষা করা যায়। তারপরে মনে হলো কোথায় কী শব্দ হয়েছে, তার জন্য ঘুম নষ্ট করার কোনও মানেই হয় না।
জানলা থেকে ঘোরামাত্র এক মুহূর্তের জন্য আমার প্রায় দম বন্ধ হয়ে গেল। খোলা দরজার মুখে, ঘরের ভেতরেই একটা লোক দাঁড়িয়ে। প্রায় চিৎকার করে উঠেছি, এমন সময় হিসহিসে গলায় লোকটা বলল, “কী রে? ঘুম ভাঙেনি? বললি অ্যালার্ম দিয়ে রাখবি?”
মেসিমামা। আজই চলে এসেছে? আমি চিৎকারটা গিলে নিয়ে ধরা গলায় বললাম, “তুমি ভেতরে এলে কী করে?”
মেসিমামা তেমনই ফিসফিসিয়ে বলল, “তোদের বাড়িতে ঢোকা কি কঠিন নাকি? কতবার তোর ছোটোমামাকে বলেছি, সেফটি বাড়া। তা নয় – ওই তো তোদের খিড়কির দরজার ওপর দিয়ে টুপ করে লাফ দিলাম উঠোনে – তারপরে তো সবই খোলা। দাওয়ায় উঠতে তো দরজা নেই, আর ঘরের দরজা তো খোলাই ছিল। কতক্ষণ ধরে টকটক করছি জানলায় – বাবুর নাক ডাকা বন্ধই হয় না।”
বললাম, “বললে যে কাল আসবে?”
মেসিমামা বলল, “কাল কই? আজই তো। টুমরো লিখলাম না? সে তো গতকাল ছিল। মাঝরাতে তারিখ বদলালো না? তুই এমন ল্যাবা জানলে... যাবি, না আমি চলি?”
বললাম, “না, আমার বেরোতে এক মিনিট লাগবে। শুধু একটা জামা...”
মেসিমামা বলল, “না। কালো প্যান্ট, কালো জামা পর, অন্তত গাঢ় রঙের। ওই সাদা পাজামা দূর থেকে দেখা যাবে। আমি বাইরে দাঁড়াচ্ছি।”
মেসিমামা বেরিয়ে গেল, আমি আলনা থেকে আমার ট্র্যাকসুটটা চাপিয়ে নিলাম। কালো নয়, গাঢ় নীল। বাইরে মেসিমামা বারান্দার থামে হেলান দিয়ে দাঁড়িয়ে। বলল, “খিড়কির দরজা দিয়ে নয়। ওটায় তিনটে ছিটকিনি। ওটা দিয়ে বেরোতে গিয়েই তোর মামা ধরা পড়েছিল। বসার ঘর দিয়ে আয়।”
ঘরের দরজা বাইরে থেকে বন্ধ করে এগোলাম। চাঁদের আলো এখন আমার দিকের দাওয়াতেই পড়েছে। তাতে থামের ছায়া। নিঃশব্দ পায়ে পেরিয়ে গিয়ে মেসিমামা বৈঠকখানার ভেতরের দরজার সামনে দাঁড়াল। সব ঘরের মতো বসার ঘরের দরজাও বন্ধ। বাইরে থেকে হুড়কো টানা। আগেকার দিনের ভারি পেতলের হুড়কো। মাখনের মতো মসৃন। আস্তে টানলে কোনও শব্দ হবে না।
হলোও না। দুজনে সাবধানে গিয়ে দাঁড়ালাম বাইরের দরজার ভেতরে। এই দরজায় আগল আছে, আর গডরেজের নাইট-ল্যাচ। রাতে বড়োমামা রোজ এই ল্যাচ লক করে আগল তুলে দেয়। মেসিমামা দুটোই খুলল, তারপরে দরজা খুলে দাঁড়িয়ে বলল, “বেরো।”
আমি মাথা নাড়লাম। বললাম, “না। তাহলে তুমি আর আমি কাছাকাছি চলে আসব। তুমি বাইরে যাও। আমি বেরিয়ে দরজা বন্ধ করছি। মাঝরাত হতে পারে, কিন্তু ছফুটের দূরত্ব রাখতে হবে।”
মেসিমামা প্রথম থেকে কোনও দিনই এই দূরত্বের ব্যাপারটা ঠিকমতো বোঝেনি। তাই বলল, “ধ্যাত, ঠিক আছে, আমিই বেরোচ্ছি। তুই আমার পেছনে আয়। দরজাটা বন্ধ করিস না। নইলে আর ঢুকতে পারবি না।”
অতটা বুদ্ধি আমার আছে। তাই নাইটল্যাচ-টা যাতে বন্ধ না হয়ে যায় সেরকমভাবে লাগিয়ে বাইরে থেকে হুড়কো টানলাম আবার। এই দরজার হুড়কোও একই রকম, তবে এখন আমরা বাড়ির বাইরে। দাদু-দিদা আর মামাদের ঘরগুলো রাস্তা থেকে দূরে। ওরা ছোটোখাট শব্দ শুনতে পাবে না। রাত তিনটে বেজে গেছে, এখন চোরও বোধহয় ঘুমিয়ে পড়েছে।
বাগানের গেটটা অল্প ক্যাঁচক্যাঁচ করে, তাই ওটাকেও সাবধানে খুলে আবার বন্ধ করলাম। মেসিমামা বলল, “চল পা চালিয়ে। তুই পেছনে আয়।” বলে হাঁটা দিল। আমি চললাম পেছনে। ছ’ ফুটের ব্যবধান রেখে।
অন্ধকারে হনহন করে চলেছি। রাস্তার পাশে ধুলো, তাই পায়ের শব্দ হচ্ছে না। বুঝতে পারছি ধুলো উড়ছে পায়ে পায়ে। রাস্তার আলো রয়েছে, সে আলোর নিচেই কেবল মেসিমামাকে দেখতে পাচ্ছি। দু-পা দূরে গেলেই আমার ছায়ায় মেসিমামা মিলিয়ে যাচ্ছে। শুধু গাঢ় রঙের জার্সিতে মেসি-র ১০ নম্বর লেখাটা আবছা দেখছি। তবে চিন্তা নেই, এই রাস্তাই সোজা গিয়েছে কবরখানা অবধি। আর মিনিট খানেক চললেই রাস্তার ডান দিকে কবরখানা শুরু হবে।
হঠাৎ মেসিমামা থেমে গেল। রাস্তার পাশে একপাঁজা ইঁট। নিচু গলায় বলল, “পটকা, এদিকে আয়, এইখানে লুকোই।”
আমি কাছে গিয়ে আস্তে আস্তে বললাম, “লুকোব কেন? কে আসছে?”
মেসিমামা ইঁটের পাঁজার পেছনে ঢুকতে ঢুকতে বলল, “আসবে। পুলিশের টহলদারী জিপটা ওদিকে গেছে মিনিট কুড়ি আগে। এতক্ষণে ফিরে আসার সময় হয়েছে। এবারে আসবে। এখানে লুকিয়ে থাকলে দেখতে পাবে না। এর পর আর রাস্তার ধারে লুকোনোর জায়গা নেই।”
রাস্তার ধারের বাড়িটা মেরামত হচ্ছিল। লকডাউনের আগে এখানে কাজ হত। এখন বাড়িটা খালি। ভারা বাঁধা, অন্ধকার, পড়ে আছে। ইঁটের পাঁজার আড়ালে গিয়ে ঢোকার প্রায় সঙ্গে সঙ্গেই বুঝতে পারলাম আমরা যেদিক থেকে এসেছি, সেদিক থেকেই আসছে একটা হেডলাইটের আলো। প্রথমে হালকা, আস্তে আস্তে জোরালো হতে শুরু করল। জোরে চলছে না। বোঝাই যাচ্ছে দুদিকে নজর দিতে দিতে আসছে পুলিশ। আমরা দুজনে আরও নিচু হয়ে গেলাম। ক্রমে শুনতে পেলাম জিপের ইঞ্জিনের শব্দ। আলোটা বাড়িগুলোর ওপরে জিপের ঝাঁকুনির সঙ্গে উঠছে নামছে। গাড়িটা দেখতে পাচ্ছি না। আমরা যেখানে রয়েছি সেখান থেকে পুলিশের জিপ আমাদের দেখতে পাবে না, আমরাও জিপটাকে দেখতে পাব না।
দেখতে দেখতে জিপটা আমাদের সামনে দিয়ে চলে গেল। ইঞ্জিনের করকর আর চাকার চড়চড় মিলিয়ে গেল দূরে। খেয়াল হলো ঝিঁঝিঁপোকা ডাকছে জোরে। এতক্ষণ ডাকছিল? একটু পরে ডিজেলের নাক-জ্বালা-করা গন্ধটাও মিলিয়ে গেল। ইঁটের পাঁজার ওপর দিয়ে উঁকি দিয়ে দেখলাম গাড়ির পেছনের লাল আলো দুটো অনেকটাই দূরে চলে গেছে। আমরা যেদিকে যাব, সেদিকেই গিয়েছে, কিন্তু রাস্তায় ওরা না দাঁড়ালে আমাদের চিন্তা নেই।
“চট করে পা চালিয়ে আয়। ওরা এখন থানায় গিয়ে রিপোর্ট করবে, বিশ্রাম করবে। আবার বেরিয়ে উলটো দিক দিয়ে এদিকে আসবে, ফিরতে চল্লিশ থেকে পঁয়তাল্লিশ মিনিট।” কথাটা বলেই মেসিমামা আবার হাঁটা দিয়েছে। আমিও চললাম পেছনে।
চৌমাথায় পৌঁছে মেসিমামা একটু এদিক ওদিক দেখল। বাঁদিকে মসজিদ, ডানদিকে কবরখানা। বলল, “এদিকে আয়।”
ডানদিকের মুরগীর দোকানের পাশ দিয়ে একটা রাস্তা ঢুকেছে, সেদিকে গিয়ে একটা অন্ধকার মতো জায়গায় দাঁড়িয়ে বলল, “পাঁচিল টপকাতে পারবি?”
বললাম, “আগে তুমি যাও।” মেসিমামা কথা না বাড়িয়ে পাঁচিল টপকে ঢুকে পড়ল। আমিও পেছন পেছন গেলাম। পাঁচিলে উঠে বললাম, “তুমি একটু দূরে যাও, এত কাছে দাঁড়িও না।” মেসিমামাকে মাঝেমাঝেই বলতে হয়, নইলে মনে থাকে না।
আবার বলল, “ধ্যেত,” বলে দূরে গিয়ে দাঁড়াল। আমি দু’হাত দিয়ে পাঁচিল ধরে ঝুলে পড়ে আলতো করে ছেড়ে দিলাম। ঘাসের জমিতে পড়ে উঠে দাঁড়ালাম। মেসিমামা একটু দূরে দাঁড়িয়ে। বললাম, “এবার?”
চারিদিকে বড়ো বড়ো গাছ। গাছের নিচে নিচে কবর। কোনওটা বাঁধান, কোনওটা নয়। পায়েচলা পথ তার মাঝে মাঝে। আমরা এগোলাম। আগে মেসিমামা, পেছনে আমি। এখানটা আরও বেশি অন্ধকার। রাস্তা ছেড়ে এসেছি। রাস্তার আলো এখন দূরে। গাছের জন্য আকাশের আলোও বিশেষ দেখা যাচ্ছে না। অন্ধকারে মেসিমামা অদৃশ্য। চাপা গলায় বললাম, “মেসিমামা, তোমাকে দেখতে পাচ্ছি না। কোনদিকে গেলে?”
“এই তো,” একটা কবরের পাশ থেকে বেরিয়ে এল মেসিমামা। “এদিকে আয়।”
দুজনে মিলে পৌঁছলাম একটা একটু খালি জায়গায়। রাস্তাটা দেখিয়ে মেসিমামা হিসহিস করে বলল, “এখানে বোস।”
বললাম, “বসব কেন?”
মেসিমামা ফিসফিস করেই খেঁকিয়ে উঠল, “বসতে হবে ভায়া। ধৈর্য ধরে বসতে হবে। শান্ত হয়ে। নইলে ভূত দেখা যাবে না।” বলে নিজে পথের ওপরেই বাবু হয়ে বসে পড়ল। কী আর করি, আমিও বসলাম – একটু দূরে। মেসিমামা আমার দিকে আড়চোখে চেয়ে নিচুস্বরে বলল, “ভয় করছে না?”
আমিও নিচুস্বরেই উত্তর দিলাম, “তুমি তো আছ। কিন্তু তোমার ভয় করছে না?”
মেসিমামা মাথা নাড়ল। বলল, “আমার অভ্যেস আছে।”
আমি অবাক হলাম। ছোটোমামা বলেছিল, মেসিমামা এখনও ভূতে ভয় পায়। কথাটা তাহলে ঠিক নয়। বললাম, “অভ্যেস মানে এখানে তুমি প্রায়ই আস?”
ঘাড় হেলাল মেসিমামা। বলল, “আসি। এখানেই তো থাকি।”
তা ঠিক, বাড়ি থেকে এখানে আসতে পাঁচ মিনিটও লাগে না। তা বলে রাতে...
মেসিমামা বলল, “তুই এখানে বোস। আমি ওদিকটা ঘুরে আসি। অনেক সময় ওদিকে...”
আমি বললাম, “না, দাঁড়াও। আমিও আসছি...” বলে উঠে দাঁড়িয়ে দেখি মেসিমামা নেই। কোথায় চলে গেল? চারিদিকে বড়ো বড়ো গাছ। কোন দিকে গেল না বুঝে পেছনে যাওয়া ঠিক হবে না। একটু এদিক ওদিক হাঁটলাম। কোনদিকে গেছে বুঝতে পারলাম না। বাধ্য হয়ে আবার বসলাম ওখানেই। চারিদিক ঝিমঝিম করছে। এতক্ষণ মেসিমামা ছিল, তাই বুঝতে পারিনি। এখন একেবারে একা হয়ে গিয়ে মনে হল ভীষণ ভয় করছে। কেউ কোথাও নেই। মেসিমামা কোথায় রেখে চলে গেল? এখন যদি না ফেরে, আমি বাড়ি যাব কী করে? বেরোবার রাস্তাটাও কি পাব? যেখান দিয়ে ঢুকেছি, সেখান পর্যন্ত যদি পৌঁছতে না পারি? পৌঁছে যদি পাঁচিলটা ভেতর থেকে টপকাতে না পারি? বুকটা জোরে জোরে ধুকপুক করতে শুরু করেছে। কান, মাথা দুই-ই ধক ধক করছে। যেদিকে মেসিমামা গিয়েছে, সেদিকে যাব? জোরে চেঁচিয়ে ডাকব? সবে উঠে দাঁড়াতে গেছি, হঠাৎ পেছন থেকে কে বলল, “কী, ভূত দেখার সখ মিটে গিয়েছে?”
ভয়ে এমন চমকে গেছি, যে প্রায় চেঁচিয়ে উঠেছি। গলা দিয়ে চিৎকার বেরিয়েওছে বোধহয়। আমার ঠিক পেছনে একটা বাঁধান কবরের ওপরে বসে একটা লোক। কালো, রোগা, সিড়িঙ্গে চেহারা। পরনে একটা লুঙ্গি, আর ধবধবে সাদা স্যান্ডো গেঞ্জি। কালো মুখে ধবধবে সাদা দাঁত আর চোখ জ্বলজ্বল করছে। দেঁতো হেসে আবার বলল, “ভূত দেখার সাধ মিটে গেল?”
আমার তখনও এত জোরে বুক ধুকপুক করছে যে মনে হচ্ছে গলা দিয়ে হার্টটা বেরিয়েই আসবে। কোনও রকমে শুকনো জিভ দিয়ে শুকনো ঠোঁট চেটে বললাম, “হ্যাঁ।” গলা দিয়ে শব্দ বেরোলই না।
লোকটা আবার হেসে বলল, “মেসিটা ভয়ানক ভীতু। সেই ছোটোবেলায় ভয় পেয়েছিল, তারপরে এদিকে আর আসেই না।”
আমার ততক্ষণে ভয়টা একটু কমেছে। বললাম, “এসেছে তো।”
মাথা নাড়ল লোকটা। বলল, “তারপরে ফেলে পালিয়েছে? পারা যায় না ওকে নিয়ে।”
আমি বললাম, “আপনি চেনেন মেসিমামাকে?”
ঘাড় নেড়ে লোকটা বলল, “মেসিকে চিনি, তোমাকেও চিনি। তুমি আমাকে চেনো না?”
চিনি? তাকিয়ে দেখলাম। দেখেছি আগে? মনে হলো না। এরকম মুখ দেখলে মনে থাকত। বললাম, “আপনি কে?”
লোকটা বলল, “ আমি আবদুল। আমিই তো এখানে দেখাশোনা করি। কেয়ারটেকার। মেসির সঙ্গে তুমি বাজারে এসেছিলে, আমি তখন দেখেছি...”
লকডাউনের কয়েকদিন আগের কথা তাহলে। কিন্তু আমি এই চেহারা দেখিনি। বললাম, “ও।”
আবদুল বলল, “তা, ভূত দেখলে?”
আমার বুকটা আবার দুকদুক করে উঠল। বললাম, “না, এখনও কিছু দেখিনি।”
সে বলল, “মেসি দেখেছিল। সেই ছোটোবেলায়। তারপরে আর এমুখো হয়নি। রাত্তিরে তো বাড়ি থেকেই বেরোয় না।”
আমি আবার অবাক হলাম। এই যে মেসিমামা বলল, প্রায়ই এখানে আসে? আজও এসেছে। ভয় পেয়েছে বলে তো মনে হয়নি।
বললাম, “আপনি তো এখানে থাকেন। এখানে ভূত দেখেছেন?”
আবদুল এবারে একটু জোরে হাসল। কেমন খ্যাঁক খ্যাঁক করে। বলল, “দেখেছি বইকি। তবে রোজ না। কপালে থাকলে দেখা যায়।”
আমার গায়ে কাঁটা দিতে শুরু করেছে। বললাম, “আমার কপালে নেই দেখছি। মেসিমামা কোথায় গেল, আমি বরং বাড়ি যাই।”
আবার খ্যাঁক খ্যাঁক করে হাসল। আমার একটু বিরক্ত লাগল। বললাম, “আমরা যেখান থেকে ঢুকেছি, আপনি আমাকে নিয়ে যাবেন সেখানে? তাহলে আমি পাঁচিল টপকে চলে যাই...”
আবদুল আমার দিকে কিছুক্ষণ চেয়ে থেকে বলল, “চলে যাবে? মেসি আসার আগেই?”
আমি বললাম, “মেসিমামা কোথায় গেল – এখনও এল না কেন?”
আবদুল আবার হেসে বলল, “যা ভীতু, পালিয়ে গেছে হয়ত। কিংবা ভয় পেয়ে কোথাও ভিরমি খেয়েছে। আগের বারে ভূতের চোখ দেখে ভয় পেয়েছিল।”
রাগ হচ্ছে মেসিমামার ওপর। আবদুল লোকটার ওপরও। বললাম, “আগের বারে তো ওগুলো কুকুরের চোখ ছিল।”
সে বলল, “কবরস্তানে কুকুর কই? দেখেছ?”
আমি জোর দিয়ে বললাম, “না, মেসিমামা বলেছে, চোখগুলো মাটির কাছে ছিল – এরকম উঁচুতে।”
আবদুল হেসে বলল, “সে তো তাঁরা তখন কবর থেকে বেরোচ্ছিলেন। তাই নিচে ছিল। মেসি যদি অপেক্ষা করত, তাহলে দেখতে পেত উঠে দাঁড়ালে কত লম্বা। সে তো আর দাঁড়াল না – প্রাণপণে দৌড় লাগাল।”
আমার আর শুনতে ইচ্ছে করছিল না। উঠে দাঁড়িয়ে বললাম, “আচ্ছা, আমি বরং যাই। আপনি আমাকে রাস্তাটা দেখিয়ে দেবেন?”
লোকটা খ্যা খ্যা করে হেসে বলল, “ভয় লাগল?” তারপরে গম্ভীর হয়ে বলল, “পাঁচিল টপকাতে হবে না। চলো, তোমাকে গেট খুলে বের করে দিই।”
আবদুল হাঁটতে শুরু করল। মনে হলো যেদিক দিয়ে এসেছিলাম, তার উলটো দিকে যাচ্ছি। অন্ধকার আরও বাড়ছে। লোকটার সাদা গেঞ্জিটা আর লুঙ্গিটার আবছা দোলা-ই বুঝিয়ে দিচ্ছে ও আছে। আমি হাঁটছি পেছনে। আমার ধারণা ছিল কবরখানাটা বড়ো নয় বেশি। কিন্তু তখন মনে হতে শুরু করেছে হেঁটেই চলেছি, হেঁটেই চলেছি। একবার মনে হচ্ছে, যেন লোকটা ইচ্ছে করে আমাকে কবরখানার মধ্যে ঘোরাচ্ছে। ভাবলাম ডেকে বলি, “আমার সঙ্গে ইয়ার্কি করছেন?” কিন্তু সাহস হলো না।
একটু পরে দেখতে পেলাম কবরখানার পাঁচিল। নিঃশব্দে স্বস্তির নিঃশ্বাস ছাড়লাম। একটা ছোটো গেট। সেটা খুলে দিয়ে বলল, “যাও।”
আমি সবে বেরোতে যাব, দূর থেকে দেখলাম গাড়ির আলোর আভা। বললাম, “পুলিশের জিপ আসছে। ওরা চলে যাক, তারপরে যাব।”
আবদুল বলল, “বেশ। এর মধ্যে মেসি কোথায় গেল দেখে আসি?”
এবারে আমি বেশ জোর দিয়ে, “না, আপনি যাবেন না।” বলে লোকটার কাছে চলে এলাম। একবার মনে হলো বড়ো বেশি কাছে এসে গেছি। কিন্তু ভাইরাসের ভয়ের চেয়ে মানুষের সঙ্গ আমার কাছে বেশি জরুরি মনে হলো। বললাম, “আমাকে বাড়ি অবধি দিয়ে আসবেন?”
পুলিশের জিপের ইঞ্জিনের শব্দ পাচ্ছি – মেসিমামা বলেছিল ওরা চল্লিশ মিনিট পরে ফিরবে। তার মানে এখনও বাড়ি থেকে বেরোন’র পর বেশি সময় কাটেনি। এখনই বেরোলে ঘণ্টাখানেকের বেশি বাইরে থাকা হবে না। লোকটা আবার হাসল। “এই সাহস? যেমন মামা, তার তেমন ভাগনে।”
পুলিশের জিপ চলে গেল। আবার চারিদিক অন্ধকার। এত অন্ধকার ছিল? লোকটাকে দেখতেই পাচ্ছি না। বললাম, “অন্ধকার বেড়ে গেল?”
আবদুলের সাদা দাঁত দেখতে পেলাম। বলল, “ভোর হবার আগে অন্ধকার বাড়ে। জানো না?”
জানি। দেখিনি কোনও দিন। বললাম, “এবারে চলুন...”
বলল, “চলো।”
দুজনে হাঁটা দিলাম। লোকটা মেসিমামার চেয়ে অনেক বেশি জোরে হাঁটে। আমাকে প্রায় দৌড়তে হচ্ছে ওর সঙ্গে থাকতে। কাছে কাছেই হাঁটছি। আমার ভয় বেড়ে গেছে অনেকগুন। মনে হচ্ছে পেছনে কে বা কারা আসছে? পায়ের শব্দ পাচ্ছি? ছুটতে ছুটতেই ঘাড় ফিরিয়ে দেখলাম, কেউ নেই। আবার চলা। এত চলতে হচ্ছে কেন? ইঁটের পাঁজাটা তো অন্তত এসে পড়া উচিত।
মুখ তুলে দেখি, আমরা সবে এসে পৌঁছেছি সেই চৌমাথায়, যেখান থেকে পাঁচিল টপকে ঢুকেছিলাম। তার মানে আমি ঠিকই ধরেছিলাম, লোকটা আমাকে নিয়ে কবরখানার প্রায় অন্যপ্রান্তে এসে বেরিয়েছে। তবু চেনা জায়গায় পৌঁছে সাহস বাড়ল। রাস্তার আলোগুলো এখানে উজ্জ্বল। আর একটু পরেই ওই যে ইঁটের পাঁজা। তারপরে আরও গোটা দশ বারো বাড়ি পরেই আমাদের বাড়ি।
আমার চলার গতি স্লথ হয়ে গেল। বাড়ির গেটের কাছে ওগুলো কী? মাটির কাছে, কিন্তু চোখগুলো জ্বলজ্বল করছে – লাল!
আবদুল বুঝল আমি পিছিয়ে পড়েছি। থেমে বলল, “কী হলো?”
আমি কাঁপা আঙুল তুলে বললাম, “ওগুলো...”
ও ঘুরে তাকিয়ে আবার আমার দিকে ফিরল। বলল, “কুকুর...”
আমি তখনও চুপ করে দাঁড়িয়ে। আবদুল বলল, “এখানে তো আর কবর নেই, যে মাটি ফুঁড়ে তাঁরা বেরোবেন... ওগুলো কুকুর। প্রাণীর চোখে অল্প আলো পড়লে অন্ধকারে জ্বলে। বাঘ সিংহ কুকুর বেড়ালের চোখ লাল, আর গোরু ছাগলের চোখ সাদা। টিউব লাইটের মতন।”
ততক্ষণে আমি বাগানের গেটের সামনে এসে গেছি। বললাম, “আর ভূতের?”
আবদুল আমার মুখের সামনে ঝুঁকে পড়ে বলল, “এইরকম...”
দেখতে দেখতে ওর মুখটা আমার সামনেই বদলে গেল। চোখদুটো ঠিকরে বেরিয়ে আসছে, আর তার গভীর থেকে উঠছে লাল আভা। আগুনের মতো লকলকে। চোখ থেকে বেরিয়ে এসে আমার মুখ প্রায় ছুঁয়ে যাচ্ছে, ছুঁয়ে যাচ্ছে...
ভয়ে আমার হাত পা ঠাণ্ডা হয়ে যাচ্ছে। আর আবদুলের মুখ বদলে মেসিমামার মুখ হয়ে যাচ্ছে। পরণে মেসিমামার টি-শার্ট আর সেই কালো প্যান্ট। সোজা হয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “তুই গিয়ে ঘুমো। আমিও ঘুমোই। আমার ঘুমের সময় হয়ে গেল।” মেসিমামার গলা।
কিন্তু মেসিমামার চোখেও সেই আগুনের লাল হলকা। এক পা পিছিয়ে গেল। দু’ পা। বলল, “মেসির আর কোনও দিন সাহস হয়নি রাতের অন্ধকারে বাড়ি থেকে বেরোতে।”
তারপরে ওখানেই হাওয়ায় মিলিয়ে গেল, যেন সিনেমার স্ক্রিন হঠাৎ অন্ধকার হয়ে গেছে।
কোনও রকমে কাঁপা হাতে বাগানের গেট খুলে ছুটে বারান্দায় উঠে দরজা খুলতে গিয়ে দেখি দরজা বন্ধ! কী করে হলো? আমি তো নিজে দরজা খুলে রেখে গেছি। বাইরের হুড়কো টেনেছি। এখন হুড়কো খোলা। দরজা ভেতর থেকে বন্ধ। রাস্তার দিকে তাকিয়ে দেখি সেই লাল চোখগুলো – যেগুলোকে আবদুল বলেছিল কুকুরের চোখ, সেগুলো কাছে আসছে... আরও কাছে আসছে...
আমি প্রাণপণে দরজায় ধাক্কা দিতে দিতে চিৎকার করতে লাগলাম, “বড়োমামা, ছোটোমামা, দাদু... আমি পটকা... দরজা খোলো, দরজা খোলো...”
তারপরে আর কিছু মনে নেই।
চোখে মুখে জলের ঝাপটায় ধড়মড় করে উঠে বসলাম। বারান্দার আলো জ্বলছে। আমার চারদিকে ঝুঁকে আছে সবাই – বড়োমামা, ছোটোমামা, মামীমারা, দিদা, একটু দূরে দাদু – আর আমাদের পাশের বাড়ির ভদ্রলোক। সবাই প্রায় একসঙ্গে বলে উঠল, “জ্ঞান ফিরেছে, জ্ঞান ফিরেছে...”
মামীমা বলল, “তুই বাইরে গেলি কী করে?”
দিদা বলল, “এখন না। আগে ওকে একটু গরম দুধ খাওয়াও। তারপরে শুতে যাক। সকালে সব জানা যাবে।”
আমাকে আর একা ঘরে শুতে দেওয়া হলো না। আমিও যেতাম না। বড়োমামীমা আমাকে নিয়ে ওদের বিছানায় শুল। আর বড়োমামা গেল আমার ঘরে। শুরু থেকেই সবাই তা-ই চেয়েছিল, কিন্তু আমিই একা থাকতে চেয়েছিলাম। আমি নিজের বাড়িতেও একাই শুই... তাই।
মামীমাকে বলতে গেলাম, “মেসিমামা...”
মামীমা বলল, “থাক। দিদা বলল, কাল সকালেই বলিস সব।”
ঘুমিয়ে পড়তে দেরি হলো না।
“ফোন করে মেসিকে আসতে বল।”
সকালে জলখাবারের পরে সব শুনে দাদুর মুখ গম্ভীর হয়ে গেছে। ছোটোমামা মেসিমামাকে ফোন করল। আমরা বারান্দাতেই সবাই বসে। বারান্দার সিঁড়িতে ওঠার আগেই মেসিমামাকে হাত তুলে থামাল দাদু। বলল, “তুই আমার নাতিকে মাঝরাতে কবরখানায় ফেলে পালিয়েছিলি?”
মেসিমামার মুখটা কেমন হতভম্ব হয়ে গেল। বলল, “আমি, আমি...”
দাদু গর্জন করে বলল, “আমি-আমি কী? তুই কাল ওকে নিয়ে রাত তিনটের সময় কবরখানায় গেছিলি কি না?”
মেসিমামা বলল, “না – আমি তো...”
ছোটোমামা বলল, “তুই পাঁচিল টপকে রাতে ওর ঘরে আসিসনি?”
এবারে মেসিমামা প্রায় কাঁদো কাঁদো হয়ে গিয়ে বলল, “সোমু, তুই জানিস আমি রাত্তিরে বাড়ি থেকে বেরোই না।”
বড়োমামা বলল, “তুই পটকাকে বলিসনি যে তুই ওকে রাত তিনটের সময় কবরস্তান নিয়ে যাবি? ওকে অ্যালার্ম দিয়ে তৈরি থাকতে বলিসনি? ওকে মেসেজ লিখিসনি – টুমরো?”
এবারে মেসিমামা একটু ম্লান হেসে বলল, “বলেছিলাম, লিখেওছিলাম। ও আমার সঙ্গে মস্করা করেছিল, ভাবলাম আমিও মস্করা করি। তাই বলেছিলাম নিয়ে যাব। আর তারপরে লিখেছিলাম, টুমরো। আজ না, কাল। ভেবেছিলাম রোজ তাই লিখব। কিন্তু আমি তো কাল রাতে বাড়ি ছিলাম...” বলে দাদুর দিকে ফিরে বলল, “জ্যাঠামশাই, আপনি বিশ্বাস না করলে মিনতিকে জিজ্ঞেস করুন, ও আপনাকে মিথ্যে বলবে না... কিন্তু কী হয়েছে?”
ছোটোমামা বলল, “পটকা বলছে তুই কাল রাতে তিনটের সময় ওর জানলায় টোকা দিয়ে ওর ঘুম ভাঙিয়ে খিড়কির দরজার ওপর দিয়ে লাফিয়ে ঢুকে ওকে নিয়ে কবরস্তান গিয়েছিলি।”
সজোরে মাথা নাড়ল মেসিমামা। আমার দিকে কটমট করে চেয়ে বলল, “মিথ্যে কথা। আমি কক্ষনো আসিনি। পটকা, ঠিক করে বল।”
দিদা বলল, “আর ওখানে গিয়ে তুই ওকে ফেলে রেখে চলে গেছিলি, জানিস, ও কী ভয়ানক ভয় পেয়েছিল? অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিল! আবদুল ওকে পৌঁছে দিয়েছে বাড়িতে।”
মেসিমামা থমকে গেল। অবাক হয়ে বলল, “আবদুল?”
বড়োমামা বলল, “আবদুলও তোকে দেখেছে। পটকাকে বলেছে তুই ওকে ফেলে বাড়ি পালিয়েছিস।”
মেসিমামা কাতর স্বরে বলল, “আপনারা কী বলছেন আমি বুঝতেই পারছি না। জেঠিমা, আবদুল এখানে নেই। আবদুল লকডাউনের দিনই গিয়েছিল নাড়াজোল। শ্বশুরবাড়ি। শালার ছেলেটার কী অসুখ... পরদিন আসার কথা ছিল, মাঝরাতে লকডাউন হয়ে আটকে পড়েছে। আমাকে ফোন করেছিল। আমি ওর বাড়িতে বাজার করে দিয়ে এসেছি। রোজ খোঁজ নিই। কালও এখানে আসার আগে বিকেলে পারভিনকে জিজ্ঞেস করে এসেছি – সব ঠিক আছে কি না।”
দাদু আমার দিকে তাকালেন। বললেন, “তুমি আবদুলকে চেন, দাদুভাই?”
আমি বললাম, “আমি চিনি না। তবে ও চেনে। বলেছে মেসিমামার সঙ্গে আমি বাজারে গেছিলাম, দেখেছে।”
মেসিমামা তেড়ে উঠে বলল, “তুই কবরস্তানে আবদুলকে দেখেছিস? কেমন দেখতে বল তো?”
বললাম, “রোগা, ভীষণ কালো। হাতগুলো এত সরু যেন খড়কে কাঠি। কনুইয়ের হাড় বেরিয়ে আছে। মুখটা লম্বা মতো, চোখগুলো ভেতরে ঢোকা। আর, আর... সামনের দাঁতগুলো মস্তো বড়ো। সবসময় বেরিয়ে থাকে।”
সবাই মুখ তাকাতাকি করল। ছোটোমামা বলল, “চ’ তো আমার সঙ্গে...” বলে ঘরের ভেতরে গিয়ে চটি পরে বেরিয়ে এল। বেরোনর সময় মামীমা ডেকে বলল, “সাবধানে যেও, কারওর খুব কাছে যেও না।”
ছোটোমামা আর মেসিমামা বেরিয়ে যাবার পরে আমি বললাম, “কিন্তু আবদুল যে আবার বদলে গিয়ে মেসিমামা হয়ে গেছিল...”
দাদু আমাকে থামিয়ে দিয়ে বলল, “দাদুভাই, মানুষ ভয় পেলে ভুল দেখতেই পারে। তার ওপর তুমি অজ্ঞান হয়ে গিয়েছিলে। সেই যা যা দেখেছ সেগুলো অজ্ঞান অবস্থায় স্বপ্নের মতো দেখেছ কি না কে জানে? ভাগ্যিস তোমার চিৎকার নিহারবাবু শুনতে পেয়েছিলেন, নইলে সকালে বড়োমামা দরজা খোলার আগে হয়ত...”
আমার আর একটা কথা মনে হচ্ছিল, কিন্তু সে আর বলা হলো না। দিদা বললেন, “চলো, চান করে নেবে। খুব গেছে কাল সারা রাত।”
আমি আর কথা বাড়ালাম না। চুপচাপ ভেতরে গিয়ে কলঘরে ঢুকলাম।
আমি চান করে বেরোতে বেরোতে ছোটোমামা ফিরে এসেছে। সবাই বৈঠকখানায় বসে। সবাই আমার দিকে তাকিয়ে। ছোটোমামা বলল, “আবদুল এখানে নেই। নাড়াজোলে আটকে আছে। আমি ফোনে কথা বললাম। মেসির বাড়িতেও গেলাম। মিনতি বলল, সারা রাত মেসি বাড়ি থেকে বেরোয়নি।”
আমার অনেকক্ষণ ধরে যেটা মনে হচ্ছিল, সেটা বললাম। “আমি বাড়ি থেকে বেরোবার সময় বাইরে থেকে হুড়কো লাগিয়ে গেছিলাম। নাইটল্যাচের লক-টা আটকে দিয়ে গিয়েছিলাম, যাতে বন্ধ না হয়ে যায়। কিন্তু ফিরে যখন এসেছি, তখন হুড়কো খোলা, আর দরজাটা বাইরে থেকে বন্ধ ছিল।”
বড়োমামা বলল, “ঠিক। আমি যখন এসে দরজা খুলি – পাশের বাড়ির নিহারবাবুর ফোন পেয়ে, তখন ভেতর থেকে লক-ও ছিল, আগলও জায়গামতো ছিল...”
ভীষণ ভুরু কুঁচকে দাদু কী বলতে গেল, কিন্তু দু-বার মুখ খুলল বন্ধ করল, কিছু বলতে পারল না।
লকডাউন এখনও ওঠেনি। আমি এখন বড়োমামার বিছানাতেই শুই। বড়োমামা আমার ঘরে শোয়। দাদু আর বড়োমামা আমার কথা বিশ্বাস করে না। ছোটোমামা, দিদা আর বড়োমামীমা করে। দিদা বলেছে, ওরা মানুষের আকার নেয় যখন, তখন ইচ্ছেমতো চেহারা নিতে পারে। কখনও মেসিমামা, কখনও আবদুল, কখনও অন্য কেউ। ছোটোমামীমা মনস্থির করতে পারছে না।
কিন্তু বাইরের দরজাটা কী করে ভেতর থেকে বন্ধ হয়ে গেল, সেটা এখনও কেউ বলতে পারছে না।
No comments:
Post a Comment