“জানিস দাদা, বাড়ির পাশে কি আছে?”
বুকানের প্রশ্নের উত্তরে বাটাম থমকে তাকায়। প্যাকিং বাক্স থেকে বইগুলো টেবিলে সাজিয়ে রাখা থামিয়ে বলে, “পাশে মানে? কোন পাশে? এপাশে, না ওপাশে?”
বুকান হাত তুলে একদিকে দেখিয়ে বলে, “ওদিকে...”
“কি আছে?” জানতে চায় বাটাম।
বুকান বলে, “দেখবি আয়...”
হাতের বইগুলো টেবিলে নামিয়ে রেখে বাটাম বোনের পেছনে পেছনে যায়। এই নতুন বাড়িটা ওদের আগের বাড়ির চেয়ে অনেক বড়ো। সকালবেলায় যখন ওরা প্রথম এসে পৌঁছেছিল তখন দুজনই অবাক হয়েছিল। এত বড়ো বাড়ি দিয়ে কী হবে? বাবা বলেছিল, “এখন আমাদের এত বড়ো বাড়ি দরকার নেই, কিন্তু কিছুদিন পরেই ঠাকুরদা ঠাকুরমা এসে এখানে থাকবে — তখন আর এত বড়ো মনে হবে না।” ওরা সিঁড়ি দিয়ে দোতলায় উঠে শুধু একদিকের ঘরগুলোই খুলেছে। অন্য দিকটা বন্ধই পড়ে আছে। দোতলার দরজা খুলে ঢুকে একটা লম্বা করিডোর আড়াআড়ি চলে গেছে বাড়িটাকে সামনে পেছনে ভাগ করে। সিঁড়ির একদিকে করিডোরের এদিকে ওদিকে চারটে মস্তো মস্তো ঘর। একটা মা-বাবার শোবার ঘর, একটা বাটাম আর বুকানের, একটা বসার ঘর।
বাটাম করিডোরের ওদিকে তাকিয়ে বলেছিল, “আর ওদিকেও এতগুলো ঘর? তাহলে তো দুটো বাড়ির সমান!”
মা হেসে বলেছিল, “না। ওদিকে এরকম ঘর দুটো। ও দুটো ঠাকুরদা ঠাকুমার। এ ছাড়া খাবার ঘর, রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর, আর বাথরুম টয়লেট।”
বুকান অবাক হয়ে বলেছিল, “বাথরুম আর টয়লেট আলাদা? বলে ছুটে চলে গেছিল, দেখতে। ফিরে এসে বলেছিল, “আলাদা কেন?”
মা বুঝিয়ে বলেছিল, তার কারণ আগের দিনে লোকে দুটো আলাদা রাখত। বলত, বাথরুম পায়খানা। শুনে বুকানের কী হাসি! “হিহিহিহিহিহিহিহি, এরকম বলত? ইশ্, কী নোংরা নাম!”
বাটামেরও হাসি পেয়েছিল, তবে অতটা না।
ঘরে ঘরে টেবিল, চেয়ার, খাট, ড্রেসিং টেবিল আর নাম লেখা কার্টনগুলো নামিয়ে গেছিল প্যাকার আর মুভার্স-এর লোকজন। বাবা আর মোতিদাদা দু’জন মিলে খাট আর টেবিল সাজিয়ে ফেলার পর মা বাটাম আর বুকানকে বলেছিল, “যাও, টেবিলে পড়ার বই সাজিয়ে রাখো। বাকি সব দেরি হলে ক্ষতি নেই, কিন্তু স্কুলের পড়া তো চালিয়ে যেতে হবে।” ওরা তাই বই গোছাচ্ছিল — বুকানের বইখাতা কম, তাই শেষ হয়ে গেছিল তাড়াতাড়ি। গেছিল মা-কে জিজ্ঞেস করতে, আর কী কাজ আছে। বাটাম একা একা ‘বাটাম-স্কুল’ লেখা বাক্সটা থেকে বই খাতা বের করে করে টেবিলে সাজাচ্ছিল, এমন সময় বুকান এসে ডাকল।
দু’জনে লম্বা করিডোর দিয়ে হেঁটে গেল বাড়িটার অন্য দিকে। এর আগে অবশ্য একবার ওরা দুজনেই ঘুরে গেছে। করিডোরের এক দিকে, ওদিকের মতোই, পর পর দুটো ঘর। আর উল্টো দিকে, খাবার ঘর, রান্নাঘর, ভাঁড়ার ঘর, আর বাথরুম।
পেছনের কোনও একটা ঘর থেকে মা বাবার গলা ভেসে আসছে — মস্তো মস্তো ঘরে কোথায় কী আসবাব রাখা হবে, তার আলোচনা। বুকান পেছন ফিরে ঠোঁটে আঙুল দিয়ে বাটামকে শব্দ করতে বারণ করল। কেন রে বাবা! ওরা কি অন্যায় কিছু করছে? বাড়িরই মধ্যে এ ঘর থেকে ও ঘরে যাচ্ছে। তবু, বুকানের কী উদ্দেশ্য না জেনেই নিঃশব্দে পেছন পেছন চলল বাটাম। একেবারে শেষ ঘরে ঢুকে বুকান হুড়কো খুলে দরজাটা অল্প ফাঁক করে ঢুকে পড়ল। পেছনে বাটাম। দরজাটা আবার ভেজিয়ে দিয়ে বুকান বলল, “মা বলল, সব ঘরের জানলা খুলতে — আলো হাওয়া আসুক।”
এই ঘরটার একটা দেওয়াল রাস্তার দিকে। সেই দেওয়ালে তিনটে মাটি থেকে প্রায় ছাদ অবধি জানলা, সবকটার দু’জোড়া করে পাল্লা। নিচের দিকের পাল্লা বড়োদের কোমর সমান — মানে বুকানের মাথার ওপর অবধি, বাটামের বুক-সমান। এগুলো সব খোলা।
কিন্তু ওপরের জানলাগুলো তো অনেক উঁচুতে। ওগুলো বুকান খুলল কী করে?
বুকান বলল, চেয়ার টেনে নিয়ে এসেছিল খাবার ঘর থেকে। তারপর অধৈর্য হয়ে বাটামের হাত ধরে টেনে বলল, “ওগুলো না, ওদিকে। ওদিকে।”
বাড়ির শেষ ঘর বলে পাশের দেওয়ালেও জানলা আছে এখানে। এগুলোও বড়ো জানলা, কিন্তু ছাদ-ছোঁয়া নয়। বুকান সেগুলোও খুলেছে। ওদিকেই টানছে বুকান। বাটাম এগিয়ে গেল জানলার দিকে। এদিকে নিশ্চয়ই পাশের বাড়ি...
জানলার বাইরে চোখ পড়তেই চমকে উঠল বাটাম। এক লহমায় বুকটা ওর অজান্তেই দুরদুর করে উঠল কেন কে জানে! জানলার বাইরের বাড়িটাও ওদের বাড়ির মতোই দোতলা। তবে অনেক ছোটো — দৈর্ঘেও, প্রস্থেও। কিন্তু বাড়িটা একেবারে পোড়ো! ওপরে নিচে যতটা দেখা যায়, একটাও জানলা দরজা বাকি নেই আর। একতলায় তো বটেই, দোতলায়ও, অনেক জায়গায় দেওয়ালও ভাঙা। ইঁট খসে গেছে। দোতলায় সামনের দিকে একটা বারান্দা ছিল কোনও দিন, সেটার অর্ধেকই নেই, বাকিটা ঝুলে রয়েছে কোনওমতে। কোনও এক সময়ে বাড়িটার রঙ বোধহয় ছিল সাদা। দোতলার বারান্দার দুপাশে সাদা রঙের দেওয়াল রয়েছে এখনও।
ওদের বাড়িটা রাস্তার ওপরে। এ বাড়িটা রাস্তা ছেড়ে একটু ভেতরে। সামনে অনেকটা জায়গা জুড়ে নিশ্চয়ই বাগান ছিল। এখন জঙ্গল। আর জঙ্গল মানে যে সে জঙ্গল নয় — তার লম্বা লম্বা ঘাস নুয়ে পড়ে শুধু জট পাকিয়েছে তা নয়, বেশ কিছু মানুষের মাথা সমান উঁচু ফুলগাছ আর অন্য গাছ বাগানটাকে একেবারে ঢেকে রেখেছে। আর যেটা দেখবার মতো তা হল জানলা-দরজার ফোকরগুলো দিয়ে যতটা দেখা যায়, একতলাটা সবটাই ওরকম গাছ-গাছালিতে ভর্তি। বাড়ির ভেতরের মেঝে বলে কিছু নেই, শুধু জঙ্গল। বাটাম অবাক হয়ে বললো, “বাড়িটায় কতদিন কেউ ঢোকেনি রে! দেখেছিস? বাগানের গেট থেকে হেঁটে ঢোকার রাস্তা পর্যন্ত নেই!”
বুকান গলাটা আরো নামিয়ে বলল, “দাদা, এটা নিশ্চয়ই ভূতের বাড়ি!”
বাটামের বুকটা খুব জোরে ধক-ধক করে উঠলো। মুখটা শুকিয়ে গেল। জোর করে একটা সাহসী হাসি হেসে বলল, “দূর বোকা মেয়ে, ভূত বলে কিছু হয় নাকি?” বুকান সবে ভূতের গল্প পড়তে শিখেছে। ও খুব জোর দিয়ে মাথা ঝাঁকিয়ে বললো, “নিশ্চয়ই হয়। সব গল্পে লেখা থাকে এইরকম বাড়িতে ভূত থাকে।”
বাটাম বলল, “শোন, মাকে এসব বলতে যাস না। মা তাহলে এ বাড়িতে থাকতেই চাইবে না।” বুকান একগাল হেসে বলল, “তুইও তো ভয় পাস!”
নিজের ভয় পাওয়ার কথা বাটাম ছোটো বোনের সামনে সহজে স্বীকার করতে চায় না, তাই একটু হেসে বলল, “দূর, দূর! মোটেই ভয় পাই না।”
বুকান মহা পাজি। খিলখিল করে হেসে, “ভয় পাস, ভয় পাস, তুই ভয় পাস...” বলে এক ছুটে ঘর থেকে বেরিয়ে করিডোর দিয়ে দৌড়ে চলে গেল মা-বাবার ঘরের দিকে। বাটামও আস্তে আস্তে বেরিয়ে দরজাটা বন্ধ করে গেল নিজের বইয়ের টেবিলে।
সারাদিনটা কাটলো বাড়ীটা গোছাতেই। মা-বাবার শোবার ঘরের উলটো দিকে বাটাম আর বুকানের শোবার ঘর গুছিয়ে দিয়ে মা বলল, “বুকান, তুই ক’দিন না হয় আমার সঙ্গেই শুবি।” বুকান বলল, “না। আমি নতুন বাড়িতে, নতুন খাটে, আমার নিজের বিছানায় ঘুমোবো।”
বাটামের একটু অস্বস্তি হচ্ছিল নতুন বাড়িতে আলাদা ঘরে একা শুতে হবে বলে — তার ওপরে ওর ভয়টা বেড়েছে পাশের বাড়ির জন্যও। কোন একটা অজানা আকর্ষণে ওরা দুই ভাই বোনই বেশ কয়েকবার পাশের বাড়ির দিকে উঁকি মেরে এসেছে জানলা দিয়ে। বেলা যত পড়েছে, রোদ যত পশ্চিমে হেলেছে, বাড়িটার ভেতরটা ক্রমে ঝুপসি অন্ধকারে হারিয়ে গেছে আর দেখতেও হয়েছে আরও বেশি করে একটা ভূতুড়ে বাড়ির মতো। সন্ধের ঠিক আগে মা ওদের পাঠিয়েছিল সব ঘরের জানলা বন্ধ করে আসতে, যাতে মশা টশা না ঢোকে। প্রায় অন্ধকার সে বাড়ির দিকে তাকিয়ে বাটাম এতই ভয় পেয়েছিল যে যত তাড়াতাড়ি পারে জানলাটা বন্ধ করে হুড়মুড়িয়ে বেরিয়ে এসেছিল। একই সময়ে পাশের ঘর থেকে বের হচ্ছিল বুকান। বাটামের দিকে আড়চোখে তাকিয়ে জিজ্ঞেস করেছিল, “ভয় পেয়েছিস?” পায়নি বললে মেয়েটা পাশে আবার খ্যাক খ্যাক করে হাসে, বাটাম তাই উত্তর না দিয়ে করিডোর দিয়ে দৌড়ে সিঁড়ি অব্দি পৌঁছে দুদ্দাড়িয়ে নেমে গিয়েছিল নিচের তলায়। নিচটাও ওদেরই। বাবা যখন কিনেছিল তখন ওরা শুনেছে বাবা আগের মালিককে বলছে, “দোকানগুলো সামনের দিকে থাক, আমার কোনও আপত্তি নেই।” একতলায় সামনের দিকে থাকার জায়গা নেই, শুধু একসারি দোকান। দুটো বড়ো। সবচেয়ে বড়ো দুটোর একটা মুদিখানা, আর একটা মিষ্টির দোকান। এ ছাড়া একটা পান সিগারেটের দোকান, একটা খাতা-পেনসিল-কাগজ-ম্যাগাজিনের দোকান — তাতে খেলনা, পুতুল, আইস ক্রিম, কোল্ড ড্রিঙ্ক, গুঁড়ো চা — সব পাওয়া যায়, একটায় বসে একটা লোক সাইকেল সারাচ্ছে, একটা শার্ট-প্যান্ট-সালোয়ার-কামিজের দোকান, একটা হার্ডওয়্যারের দোকান আর একটার ওপর লেখা লক্ষ্মীশ্রী ট্র্যাভেল এজেন্ট — সেটাতে কেবল একটা লোক বসে কাগজ পড়ছে। বাবা বলেছে, মিষ্টির দোকানটা নাকি বেশ নামকরা। ওরা সকালে জিলিপি আর বিকেলে সিঙ্গাড়া ভাজে। সেদিন বিকেলে চায়ের সঙ্গে ওরা ওই দোকানেরই সিঙ্গাড়া খেয়েছে। দোকানের মালিক নতুন বাড়িওয়ালার কাছ থেকে দাম কিছুতেই নেবে না — বাবা মানতে চায়নি। বলেছিল, “বাড়িওয়ালা হিসেবে আমি যেমন বাড়ি ভাড়া নেবো, খদ্দের হিসেবে দামও দেব।” তখন মালিক বলেছেন, “বেশ তো, এর পরের বার থেকে বাড়িওয়ালা আর খদ্দেরের সম্পর্ক হবে। আজকে আপনি আমার প্রতিবেশী, সবে এসেছেন — আমার তরফ থেকে এটা না হয় প্রতিবেশীকে দেওয়া উপহার হলো।” বিকেলে চায়ের সঙ্গে সিঙ্গাড়া খেতে খেতে বাবা বলেছিল, “হুম, নিখরচার সিঙ্গাড়া — খেতে মোটেই খারাপ না!”
নিচের তলায় পেছনের দিকের ঘরগুলো বাবা আর বাবার অ্যাসিস্ট্যান্টরা গোছাচ্ছে। নিচের তলায় রান্নাঘর এবং বাথরুম বাদ দিয়ে সবসুদ্ধ তিনটে ঘর জুড়ে বাবার অফিস হবে। সবকটা ঘরে বাবা আগে থেকেই বড়ো বড়ো বইয়ের তাক বানিয়েছে মিস্তিরি ডেকে। এখন বাবা, মোতিদাদা, অরূপ আঙ্কেল আর ইন্দ্রানী আন্টি মিলে মোটা মোটা বইগুলো তাকে তুলে তুলে রাখছে। অরূপ আঙ্কেল আর ইন্দ্রানী আন্টি বাবার জুনিয়র। বাবা যেহেতু মস্তো বড়ো উকিল, তাই বাবার আরো অ্যাসিস্ট্যান্ট আসে, কিন্তু তারা কেউ অরূপ আঙ্কেল আর ইন্দ্রাণী আন্টির মতো বছরের পর বছর থাকে না। তারা আসে, কিছুদিন কাজ করে চলে যায়। এখন কেউ নেই। অফিস সাত দিন বন্ধ। এখন কোর্টেও ছুটি বলে বাবা এই সময়ে বাড়ি বদলে নিয়েছে।
বাবার অফিস-ঘরে বাবা প্যাকিং বাক্স থেকে বই বের করে করে একটা একটা করে মোতিদাদার হাতে দিচ্ছে আর মোতিদাদা উঁচু ঘরাঞ্চিটায় চড়ে সব থেকে উঁচু তাকে তুলে তুলে রাখছে। বাবাকে সব বই এমনই গুছিয়ে রাখতে হয়, যাতে যেগুলো বেশি দরকার সেগুলো হাতের কাছে থাকে আর যেগুলো সারাক্ষণ কাজে লাগে না সেগুলো উঁচুতে। বাটামকে দেখে বাবা চট করে মুখ তুলে তাকিয়ে আবার কাজে মন দিল। বলল, “কী রে? ওপরে সব কাজ শেষ?” বাটাম সবে বলেছে, “হ্যাঁ। এখন তোমার এখানে কী করতে হবে, বলো।” এমন সময় পেছন পেছন বুকান ঢুকে বলল, “বাবা, একটা জিনিস দেখবে?”
বাবা বলল, “আমি এখন কাজ করছি যে? খুব জরুরী? হারিয়ে যাবে, না পরেও দেখা যাবে?” বাটাম জানে বুকান কী দেখাতে চাইছে — একবেলা কেন, একদিন দেরি করলেও পাশের বাড়িটা হারিয়ে যাবে না — কিন্তু বুকান অত অপেক্ষা করতে পারে না। তাই একটু জোর দিয়ে বলল, “আঃ, এসো না! এক মিনিট লাগবে। পরে মা দেখে ফেললে মুশকিল আছে...”
বাবা একটু ভুরু কুঁচকে তাকিয়ে বলল, “আচ্ছা বেশ, তাহলে এই বাক্সের বাকি বই ক’টা মোতিদাদার হাতে দিয়ে আসছি, নইলে মোতিদাদাকে মিছিমিছি সিঁড়ি নামা ওঠা করতে হবে।”
বাক্সটা প্রায় খালি হয়ে এসেছিল। বাবা একটা একটা করে বই মোতিদাদার হাতে দিল, মোতিদাদা সেগুলো তাকে সাজিয়ে রেখে নেমে এল। বাবা বলল, “মোতি, পরের বাক্সটা খুলে ফেল, আমি এসে বইগুলো তোর হাতে দিচ্ছি।”
বুকানের পেছন পেছন বাবা সিঁড়িতে বেরিয়ে এল, কিন্তু বুকান দোতলার দিকে না গিয়ে বাইরের দিকে এগোল। বাটাম বুঝল বুকান বাবাকে দোতলার ঘরে নিয়ে যেতে চাইছে না, পাছে মা দেখে ফেলে। বাবা বলল, “বাইরে যেতে হবে?” বুকান হাত তুলে পাশের বাড়ির দিকটা দেখিয়ে বলল, “এইখানটায়। দূরে না।” তারপর ওরা তিনজনে রাস্তায় বেরিয়ে একটুখানি হেঁটে পাশের বাড়িটার সামনে গিয়ে দাঁড়ানোমাত্র বাবা চমকে উঠল। বলল, “এ কী! এ তো একেবারে ভাঙা বাড়ি একটা! পাশেই এরকম একটা বাড়ি আর জঙ্গল মতন রয়েছে, আমি কেনার সময় খেয়ালই করিনি? এটা তো একটু সমস্যা হতে পারে...”
বাটাম বলল, “কি সমস্যা হতে পারে?”
বাবা বাড়িটার দিকে চেয়ে থাকতে থাকতে বলল, “শহরের একদম মাঝখানে এত জঙ্গল থাকলে সাপখোপ থাকবে কি না জানি না, তবে অন্য ছোটো প্রাণী — যেমন ভাম থাকতে পারে। আমাদের রান্নাঘর তো এই দিকেই। সাবধানে জানলা বন্ধ করে রাখতে হবে, নইলে ভাম এসে এটা-সেটা চুরি করে নিয়ে যেতে পারে। আজ সন্ধে হয়ে গেছে — কালকে বাড়িটা সম্বন্ধে খোঁজ নিতে হবে।” বলে বাবা আবার ফিরতে শুরু করল। ওরা বাবার দু হাত ধরে ফিরছে, এমন সময় বাবার কী খেয়াল হলো, বুকানকে জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু এই বাড়ির কথা মা জানতে পারলে কী হবে? মা-কে বলা বারণ কেন?” বুকান বলল, “দাদা বলেছে, মা যদি এটা ভূতের বাড়ি ভাবে তাহলে এখানে আর থাকতে চাইবে না।”
বাবা খুব হেসে বলল, “আমার মনে হয় না মা শহরের মাঝখানে একটা বাড়ি ভাঙা হলেও সেটাকে ভূতের বাড়ি ভাববে। তাহলে তো যে কোনো বাড়ি ভুতুড়ে হতে পারে!”
রাতের খাওয়া শেষ করে শুতে গেল সবাই। বুকান জেদ করে দাদার ঘরেই ঘুমোলো। মা বলল, “মাঝরাত্তিরে যদি ভয় লাগে, তখন কাকে ডাকবি? দাদাকে?”
বুকান হেসে বলল, “দাদারও যদি ঘুম ভাঙে, তোমাকেই ডাকবে। একা একা অতদূরে বাথরুমে যাবেই না! আমিও ঘুম ভাঙলে তোমাদের ডেকে তুলব।” এই বলে ওপাশ ফিরে এক্কেবারে ঘুমিয়ে পড়ল। মা-বাবাও বাটামকে গুডনাইট বলে নিজেদের ঘরে গেল।
সারাদিন ও বাড়ি থেকে এ বাড়িতে আসা আর বাড়ি গোছানোর ক্লান্তিতে বাটামও আর জেগে থাকতে পারল না। শুতে না শুতেই একেবারে ঘুমিয়ে কাদা হয়ে গেল। একটু পরে খোলা দরজা দিয়ে দেখা গেল পাশের ঘরের আলো নিভে গেছে। তার মানে মা-বাবাও শুয়ে পড়েছে। উপুড় হয়ে শুয়ে থাকা বুকান বালিশ থেকে মাথাটা একটু তুলে এক চোখ খুলে ফিসফিস করে ডাকলো, “দাদা, ঘুমিয়ে পড়েছিস? দাদা?” বাটামের কোনও সাড়া না পেয়ে আস্তে আস্তে বিছানা ছেড়ে উঠে দরজা দিয়ে করিডরে মাথা বাড়িয়ে ডাইনে-বাঁয়ে উঁকি দিল। ওদের ঘরের উল্টোদিকে মা-বাবার শোবার ঘর। তারও দরজা খোলা। ভেতরে অন্ধকার। নাইটল্যাম্প কেনা হয়নি এখনও। দূরে একটা আলো বাথরুমের দরজার সামনে করিডোরে জ্বলে রয়েছে যাতে অচেনা বাড়িতে অন্ধকারে বাথরুম যেতে অসুবিধে না হয়। লম্বা করিডোরটা। তার ওই পাশে আলোটা এখন খুব উজ্জ্বল দেখাচ্ছে না। বুকান অপেক্ষা না করে সেদিকেই হাঁটা দিল। মা বা দাদার মত অতটা ভয় ও পায় না, বরং পাশের বাড়িতে সত্যি ভূত আছে কি না সেটা জানার জন্যই ঘুমের ভান করে শুয়ে ছিল এতক্ষণ। শেষ ঘরটায় দরজা খুলে ঢুকে বুকান পায়ে পায়ে বন্ধ জানলার দিকে এগিয়ে গিয়ে ডিঙি মেরে উঠে খড়খড়িটা অল্প ফাঁক করে পাশের বাড়ির দিকে তাকিয়েই চমকে উঠলো আর খড়খড়িটা খট্ করে ফেলে দিয়ে এক দৌড়ে ঘর থেকে বেরিয়ে গিয়ে নিজের ঘরে পৌঁছে বাটামকে ধাক্কা দিয়ে তুলতে তুলতে ফিসফিস করে ডাকতে থাকলো, “দাদা, দাদা! ওঠ, ওঠ! শিগগিরি ওঠ, দাদা!”
বাটাম ততক্ষণে গভীর ঘুমে তলিয়ে গিয়েছিল। কে জানে, হয়ত স্বপ্নও দেখছিল একটা। বোনের ধাক্কায় আস্তে আস্তে ঘুম ভাঙলো। প্রথমে বোকার মত তাকিয়ে দেখল বুকানের মুখটা, তারপর হঠাৎ ভয় পেয়ে ধড়ফড়িয়ে উঠে বসে জিজ্ঞেস করল, “কী হয়েছে?” বুকান নিজের ঠোঁটে আঙ্গুল দিয়ে ওকে চুপ করতে বলে বলল, “শিগগিরি আয়! পাশের বাড়িতে কি হচ্ছে দেখ!” বাটামের খুবই ঘুম পেয়েছিল, কিন্তু বুকানের চোখেমুখে উৎসাহ দেখে আর থাকতে না পেরে বিছানা ছেড়ে উঠলো। ঘরের মধ্যে অন্ধকার। ওদের ঘরটা বাড়ির পেছন দিকে বলে খোলা জানলা সত্ত্বেও বেশি আলো আসছিল না। দরজা দিয়ে বাইরে করিডরে বেরিয়েই বাঁ দিকে তাকিয়ে দূরে বাথরুমের দরজার কাছে ছোট্ট আলোটা জ্বলে আছে দেখে বাটামের গা ছমছম করে উঠলো। খুব ঘুম পেয়েছে এমন ভান করে বলল, “এখনই দেখতে হবে? কাল সকালে...” বুকান ওর হাতটা ধরে ঝাঁকিয়ে বলল, “এখনই, এখনই। রাত্তিরে ছাড়া দেখা যাবে না!” অগত্যা বাটাম বুকানের সঙ্গে চলল। ছুটে বেরোনোর সময় বুকান ঘরের দরজাটা বন্ধ করেনি। খোলাই ছিল। দুজনে গিয়ে বন্ধ জানলার সামনে দাঁড়ালো। বাটাম বলল, “এই রাত্তিরে তুই ভূতের বাড়ি দেখতে এসেছিস?” বুকান বলল, “দাদা, খড়খড়ি ফাঁক করে বাড়িটা দেখ!” বাটাম সাবধানে খড়খড়িটা তুলে একটুখানি ফাঁক করে পাশের বাড়ির দিকে তাকিয়ে আঁতকে উঠলো! বাড়িটার একতলায় অনেক ভেতর থেকে আলো দেখা যাচ্ছে। ইলেক্ট্রিকের নয়, খুব মৃদু হলুদ একটা আলোর আভা যেন বাড়ির ভেতর থেকে বেরিয়ে আসছে। সে আলো এতই অল্প যে সরাসরি না দেখলে হয়তো বোঝাও যাবে না আলো জ্বলছে কি না। ওরা দোতলার উপর থেকে দেখছে বলেই দেখতে পাচ্ছে, বাইরে রাস্তায় দাঁড়িয়ে যদি তাকাতো তাহলে হয়ত গাছপালা ঝোপঝাড় ভেদ করে এইটুকু আলো চোখেই পড়তো না।
বাটাম বলল, “এ তো মোমবাতি কিংবা লন্ঠন মনে হচ্ছে। মোমবাতিই হবে...” বুকান বলল, “কী করে জানলি মোমবাতি?” বাটাম উত্তর দিলো, “আলোটা কেমন বাড়ছে কমছে দেখছিস? লন্ঠন কিংবা লম্ফ হলে আলোটা অনেক বেশি স্থির হত। মনে হচ্ছে ভেতরে কেউ মোমবাতি জ্বেলেছে। হাওয়ায় আগুনটা কাঁপছে, তাই আলোটা বাড়ছে কমছে।”
বুকান বলল, “ভূত?” বাটাম মাথা নাড়লো। ওর এখন একটু সাহস বেড়েছে। বলল, “ভূত কখনও আগুন ছোঁয় না, জানিস না?” তাই তো! বুকানের খেয়াল হল। আগুন, লোহা, রামনাম — এসবে ভূত ভয় পায়, তাই ওরা আলোকিত জায়গায় আসে না। বলল, “তাহলে ওখানে আলো জ্বেলেছে কে?”
বাটাম বলল, “কী করে বলবো? ভূত না হলেও ভালো কিছু না-ও হতে পারে — চোর, গুন্ডা, বদমাশ, ডাকাত — যে কেউ পুরোনো বাড়ির মধ্যে আস্তানা গাড়তে পারে...”
দুজনে খানিকক্ষণ আলোটার দিকে তাকিয়ে থেকে যখন বুঝল যে আলোটা বাড়ির একেবারে ভেতর দিক থেকে আসছে, আর অতটা ভেতর অবধি এখান থেকে দেখার কোন উপায় নেই, তখন আর জেগে না থেকে শুতে গেল, কিন্তু দুজনের মনেই খুব উত্তেজনা, তাই অনেকক্ষণ ঘুমোতে পারল না। গুণ্ডা না ডাকাত? না কি চোর? ছেলেধরাও হতে পারে। বুকান একবার ভাবল ভুতও হতে পারে। ওটা যে মোমবাতিরই আগুন, তাই বা কে বলে দিয়েছে? যদি কোনও ভুতুড়ে আলোই হয়? কে জানে? তারপরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে জানে না। পরদিন সকাল বেলায় মা দুজনকে ঠেলে ঠেলে তুলতে পারে না! “ওরে, ওরে, বাড়িতে অনেক কাজ আছে, সেগুলো করতে হবে না?”
দুজনে উঠে, দাঁত মেজে, জলখাবার খেয়ে মার কথামতো ব্যাগ হাতে গেল বাড়ির সামনের মুদির দোকানে। দোকানদারও ওমনি চিনে ফেলল। বলল, “তোমরা তো এ-বাড়িরই ছেলেমেয়ে। কী কী নেবে আমি লিখেনি’, আর দোকানের ছেলেটাকে দিয়ে পাঠিয়ে দিচ্ছি। বাড়ি যাও, মা-কে বোলো, তখনই দাম দিয়ে দেবেন।”
ওদের হাতে লিস্ট লেখা কাগজটা ছিল, ওরা সেটা দিয়ে বাড়ি ফিরতে যাবে, বুকান বলল, “দাদা, একবার দেখবি সকালবেলায় বাড়িটাতে ঢোকা যায় কি না?”
তখন বেলা হয়েছে, স্কুলে গরমের ছুটি চলছে বলে ওদের বেরোতে হয়নি, কিন্তু রাস্তায় অনেক লোক চলাফেরা করছে। বাটাম একটু কিন্তু কিন্তু করে বলল, “যদি কেউ কিছু বলে? আর বাবা বলেছে, বাগানে সাপ টাপ থাকতে পারে... কিংবা ভাম...” বুকান বলল, “ভাম কী রে দাদা? বাবাকে জিজ্ঞেস করব ভাবলাম, ভুলে গেছি...”
বাটামের মনে হল ওর-ও জিজ্ঞেস করার কথা মনে হয়েছিল, কিন্তু পরে ভুলে গেছে। বলল, “আমিও জানি না, রে। বাবাকে জিজ্ঞেস করতে হবে।”
দুজনে পায়ে পায়ে গিয়ে ভাঙা বাড়ির বন্ধ গেটের সামনে দাঁড়ালো। ভালো করে তাকিয়ে বুঝল গেটটা যদিও তালা বা অন্য কিছু দিয়ে আটকানো নেই, কিন্তু বাড়ির ভেতর দিকে মাটি উঁচু হয়ে গেটের নিচটা চাপা দিয়ে দিয়েছে। ঠেলে খোলা-ই যাবে না। বুকান এগিয়ে গিয়েছিল। ডেকে বলল, “দাদা, বাড়ির ওপাশ দিয়ে একটা গলি মতন আছে মনে হচ্ছে। এদিক দিয়ে পেছন দিকটায় যাওয়া যায় কি না দেখবি?”
“দাঁড়া,” বলে বাটাম ওর পাশে গিয়ে দাঁড়াল। দুটো বাড়ির ফাঁকে একটা নর্দমা। তার দুদিকে পা রেখে হেঁটে যাওয়া যায় বটে, কিন্তু এই ফাঁকটাকে কোনও ভাবেই গলি বলা যায় না। বাটাম ভাবছে কী করে, এমন সময় ওদের পাশে এসে লুঙ্গি আর গেঞ্জি পরা একটি লোক দাঁড়িয়ে জিগ্যেস করল, “তুমলোগ উকিল বাবু কা বাচ্চে হো না?”
ওরা কী বলবে বুঝতে না পেরে চুপ করে দাঁড়িয়ে আছে, লোকটা বলল, “আরে ম্যায় পবননন্দন। পান দুকানদার হুঁ। ইহাঁ কেয়া কর রহে হো? ইধার আও, ইধার আও...”
লোকটা প্রায় জোর করেই ওদের বাড়ির দিকে নিয়ে গেল। ওদেরই বাড়ির সামনের পান-সিগারেটের দোকানের মালিক। দোকান অবধি নিয়ে গিয়ে বৈয়াম খুলে দুটো সরু সরু ক্যাডবেরি চকলেট দিল। ওরা কিছুতেই নেবে না — বলল, মা বাবা পছন্দ করে না, কিন্তু লোকটা এতই পিড়াপিড়ি করতে থাকলো যে খানিকটা বাধ্য হয়েই বাটাম বলল, “ঠিক আছে, আমরা নিচ্ছি, কিন্তু আগে মাকে জিজ্ঞেস করব। মা বললে, তবেই খাব।”
লোকটা তাতেই খুব খুশি, কিন্তু ওরা যাবার আগে বলল, “তুম দোনো উস মকানকে সামনে কিঁউ গয়ে থে? অন্দর মত জানা। ও টুটা ঘর হ্যায়, কব্ গির জায়গা, বহোত মুশকিল হোগা।”
চকলেটগুলো দেখে মা একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “এ তো বড়ো সমস্যা হলো! তাহলে কী এদের দোকানে যাওয়াই যাবে না?”
বাটাম বলল, “আমরা ওই দোকানে যাইওনি। ও পান সিগারেট বিক্রি করে। নিজেই রাস্তায় আমাদের দেখে ডেকে নিয়ে গেল, তারপরে এ দুটো দিল আমরা ‘না’ বলা সত্বেও।” এমন সময় বাবা এসে সব শুনে বলল, “আরে, ভালোবেসে দিয়েছে — না নিলে অপমানিত বোধ করতে পারে। তবে আমার মনে হয় না বারবার দেবে, আর আমরাও যদি ওদের দোকান থেকেই সব জিনিসপত্র নিই তাহলে ওদের আর্থিক সাহায্যও হবে।”
দুপুরবেলা খেতে বসে বাবা হঠাৎ বলল, “ও, ভালো কথা — পাশের বাড়িটার ব্যাপারে খোঁজ নিলাম...”
মা খেতে খেতে মুখ তুলে জিজ্ঞেস করল, “কোন পাশের বাড়ি?” বাটাম আর বুকান চট করে মুখ তাকাতাকি করল। এইবার মা সব জেনে যাবে! তারপরে মা-ও যদি ওটাকে ভূতের বাড়ি মনে করে, তাহলেই হয়েছে! বাবা অবশ্য সেসব দিকে গেল না। বলল, “আমাদের বাড়ির ওপাশে একটা বাড়ি আছে — একেবারে ভাঙাচোরা। ভাবছিলাম শহরের মধ্যে এরকম একটা বাড়ি, কেউ সেটার মেরামতও করলো না, বা প্রোমোটাররাও ছেড়ে দিল? সেই জন্য পাড়ায় খোঁজ নিলাম...” কেউ কিছু বলল না। বাবা হাত বাড়িয়ে আর একটু ডাল নিয়ে ভাত দিয়ে মাখতে মাখতে বলল, “বাড়িটা ছিল কোনও একজন রায়বাহাদুরের। এপাড়ায় অনেক জমি জায়গাই রায়বাহাদুরের ছিল, কিন্তু যত দিন গেছে তত তাদের অবস্থা পড়েছে বলে সব বিক্রি করে ওই বাড়িটুকুই বাকি ছিল। তো এখন যারা মালিক তাদের বাবা-ঠাকুরদা দুজনেই খুব সামান্য চাকরি করতেন, ফলে বহু বছর হয়ে গেল বাড়িটার কোনও দেখাশোনা, মেরামত হয়নি। বাবাও মারা গেছেন বেশ কয়েক বছর হয়ে গেছে। এখন মালিক নাকি ওনার তিন মেয়ে। বড়ো আর ছোটো মেয়ের বিয়ে হয়নি, মেজো বিয়ে করে চলে গেছে বোম্বে না কোথায়। বড়োদিদি আর ছোটোবোন মানসিক রোগি। তাদের আগে চিকিৎসা হতো, কিন্তু আগে মা, তারপর বাবা মারা যাবার পর আর কোনও চিকিৎসা হয়নি। ফলে রোগ বাড়তে বাড়তে তারা নাকি পুরোপুরি পাগল হয়ে গেছে আজ থেকে অনেক বছর আগে। মেজো বোন নাকি চালাকি করে বাড়িটা দখল করার চেষ্টা করেছিল কিন্তু পেরে ওঠেনি। সেই সময়ে বড় বোন আর ছোট বোন বাড়ি ছেড়ে পালিয়ে যায়। এখন নাকি কাছেপিঠে কোনও একটা বাজারে সারাদিন থাকে, ওখানে কেউ কিছু খেতে দিলে খায় এবং ওইভাবেই ওদের দিন চলে। বাড়িটা আস্তে আস্তে ভেঙে গিয়ে এই অবস্থা হয়েছে। শুনতে শুনতে বাটামের মনে হচ্ছিল, যদি কোনওভাবে দুই বোনকে আবার ফিরিয়ে এনে বাড়িতে থাকার ব্যবস্থা করে দেওয়া যায়...
এসে থেকে গতকাল মা ওদের থাকার দিকটা গোছানো নিয়ে এত ব্যস্ত ছিল যে বাড়ির বন্ধ দিকটাতে যাবার সময় পায়নি। কোনও রকমে বাবা-মা রান্না করেছিল কাল। আজও রান্না করার সময় মা ওই বাড়িটা দেখতে পায়নি কারণ রান্নাঘর থেকে ওদিকে কোনও জানলা নেই। তাই খেয়েদেয়ে ওরা সবাই গেল বাড়ির শেষ ঘরটাতে। মা বাড়িটা দেখে চমকে উঠলেও ভূতের বাড়ি বলে ভয় পেলো না। বরং বাটামের মনের প্রশ্নটা করলো মা-ই।
“এই দুই অসুস্থ বোনকে আবার ফিরিয়ে আনা যায় না? তুমি তো উকিল। তুমি পারবে না?”
বাবা হেসে বললো, “এখনও বোন দুজনকে দেখলামই না চোখে! তারপরে তো তাদের জমি-বাড়ির কথা। এই এত পুরোনো বাড়ি — যার কোন আসবাবপত্রও নেই দেখাই যাচ্ছে — তার দলিল টলিল কোথায় থাকতে পারে কে জানে! আবার শুধু দলিল পেলে তো চলবে না — তিন বোনই নিশ্চয়ই এ বাড়ির সমান মালিক? তাদের সকলকেই খুঁজে এনে তাদেরকে দিয়ে কাগজপত্রে সই করিয়ে তবে না বাড়ির কিছু বন্দোবস্ত করা যাবে! তার মধ্যে দুজনের যদি মানসিক রোগ থাকে তাহলে সেটা চিকিৎসা না করে কিছু ভাবাও যাবে না।”
দিন কাটলো, সন্ধে হলো। মা গতকালকের চেয়ে আজকে একটু বেশি সময় পেলো বলে বাটাম আর বুকানের পড়াশোনা নিয়ে বসল, তারপরে রাতে খেয়েদেয়ে সবাই যখন শুতে যাবে, মা জিজ্ঞেস করল, “কী রে বুকান, তুই আজও কি নিজের খাটেই ঘুমোবি?” আজও বুকান নিজের খাটেই শুলো। অনেক রাতে, তখন কটা বাজে জানে না, বাটাম ঘুম ভেঙে চোখ খুলে দেখলো পাশের খাটে বুকান নেই। একবার ভাবল হয়ত বাথরুমে গেছে, কিন্তু তারপরে কী মনে হলো, বিছানা ছেড়ে উঠে গিয়ে দেখল, যা ভেবেছিল তাই। বুকান মাঝরাত্তিরে উঠে গিয়ে ওই জানলাটা দিয়ে পাশের বাড়ির দিকে চেয়ে বসে রয়েছে, আর সে বাড়িতে আজও কালকের মত একটা টিমটিমে আলো জ্বলে রয়েছে। বাটাম বলল, “তোর কী হয়েছে বল তো? রাত্তির বেলায় হাঁ করে ভুতের বাড়ি দেখছিস কেন?”
বুকান বলল, “তুই তো কালকে বললি ভূত আগুন জ্বালায় না — তাহলে?”
বাটাম বলল, “তাই বলে রাত্তিরে না ঘুমিয়ে উঠে এদিকে তাকিয়ে আছিস কেন?”
বুকান বলল, “ওই আগুনটা কে জ্বালাচ্ছে জানার কোনও ইচ্ছে হয় না তোর?”
বাটাম বলল, “না। এটা যে কেউ হতে পারে।”
বুকান বলল, “এটা জানতে পারাটাই একটা অ্যাডভেঞ্চার হতে পারে।”
বাটাম বলল, “দুর-দুর, চল, শুবি চল।” বলে আর অপেক্ষা না করে গিয়ে বিছানায় শুল। ঘুমিয়ে পড়ার আগে দেখল বুকানও এসে নিজের বিছানায় উঠল।
পরদিন সকালে মা ওদের পাঠাল আরও কিছু কেনাকাটা করতে। বাড়ি থেকে বেরিয়ে বুকান বলল, “দাদা, বাড়ির দোকানে গেলে ওরা আবার আমাদের হাতে জিনিস দেবে না। বাচ্চা মনে করে ফেরত পাঠিয়ে দেবে, আর মার কাছ থেকে টাকা নিয়ে যাবে। তার চেয়ে চল, আমরা ওদিকে অন্য দোকানে যাই, পারলে বাজারটাও ঘুরে আসি।”
বাটাম বলল, “বাজার কত দূরে তো জানি না।”
বুকান বলল, “জিজ্ঞেস করলেই জানা যাবে...” বলে বাড়ি থেকে বেরিয়ে হনহনিয়ে রওনা দিল। বাড়ির দোকান টোকান সব পেরিয়ে বেশ খানিকটা এসে দেখে একটা ছেলে আসছে — হাতে বই খাতা — বোধহয় পড়তে যাচ্ছে। তাকে জিজ্ঞেস করল, “দাদা, দাদা, আমরা এ পাড়ায় নতুন। এখানে বাজারটা কোথায় বলে দেবে?”
ছেলেটা ডান হাতে ধরা বইগুলো বাঁ হাতে নিয়ে ডান হাত তুলে ওদের দেখিয়ে দিল। “এই সোজা রাস্তাটা গিয়ে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে ডান দিকে যাবে। একটু বাদেই রাস্তাটা বাঁ দিকে ঘুরে গেছে। মোড় থেকেই দেখতে পাবে, আর এগিয়ে গিয়ে বাঁ দিকে ঘুরতে না ঘুরতেই দেখবে রাস্তার দু’দিকে কৃত্তিকাপুর বাজার শুরু হয়ে গেছে। তারপরে চিনতে অসুবিধে হবে না।”
ছেলেটা বই বগলে নিয়ে চলে গেল, বাটাম আর বুকান রওনা দিলো ওর দেখিয়ে দেওয়া রাস্তায়। সত্যিই বাজারটা বেশি দূরে না, আর বেশ জমজমাট। ওরা দুজনে ঘুরে ঘুরে মা’র লিস্ট দেখে দেখে সব জিনিস কিনল, তারপর বাজার থেকে বেরিয়ে বাড়ির দিকে রওয়ানা দিল। দু’চার পা গিয়েই বুকান হঠাৎ বাটামের জামার হাতা ধরে টান দিল। “দাদা, দেখ।”
বুকানের দৃষ্টি অনুসরণ করে বাটাম দেখলো রাস্তার উল্টোদিকে একজন মাঝবয়সী মহিলা ফুটপাথে দাঁড়িয়ে। পথচলতি লোকের কাছে হাত পেতে ভিক্ষে করছে। পরনে একটা গোলাপী রঙের শাড়ি। আজকাল এ রকম চকচকে শাড়ি প্রায়ই দেখা যায় পুজোর সময়ে — ফুটপাথে বা দোকানের বাইরে লোকে কম দামে কিনছে। এরকম শাড়ি ওরা কখনও ওদের মা-মাসি-পিসিদের পরতে দেখেনি। শাড়িটা ছেঁড়া নয় তবে পুরোনো, আর ভীষণ নোংরা। বুকান কিছুক্ষণ তাকিয়ে থেকে বলল, “দাদা, এই হচ্ছে দুই বোনের একজন।” বলেই রাস্তা পেরিয়ে গিয়ে ওর সামনে দাঁড়ালো। দুই হাতে ভারি ব্যাগ নিয়ে বাটাম পেছন পেছন গিয়ে শুনল বুকান বলছে, “তুমি কে? তুমি রাস্তায় ভিক্ষে করছ কেন?” মহিলা কিছু বলল না, কিন্তু বাটাম লক্ষ করল ওর ঠোঁট নড়ছে — যেন নিজের মনের বিড়বিড় করে কিছু বলছে। ওরা যেখানটায় দাঁড়িয়ে, সেখানে একটা লোক রাস্তায় বসে ছাতু বিক্রি করছিল। ওদের বলল, “ও কোথা বোলে না। ও পাগলি আছে।”
কথা না বাড়িয়ে বুকান বলল, “দাদা, দশটা টাকা দে তো!” তারপরে বাটামকে কিছু করতে না দিয়েই ওর শার্টের পকেট থেকে একটা দশ টাকার নোট বের করে দিয়ে দিল। মহিলাও কোনও কথা না বলে কোমর থেকে একটা ব্যাগ বের করে তার মধ্যে টাকাটা ঢুকিয়ে রাখল।
বাটাম বলল, “নে, চল এখন — নইলে দেরি হয়ে যাবে।” ওরা দুজনে রাস্তা পেরিয়ে বাড়ির পথে হাঁটা দেওয়ামাত্র দেখা হল সেই ছেলেটার সঙ্গে যে ওদের বাজারের পথ বলে দিয়েছিল। ছেলেটা দাঁড়িয়ে ওদেরই দেখছিল। বলল, “তোমাদের হাতে ভারি ভারি ব্যাগ... আমাকে একটা দাও।”
ওরা লজ্জা পেল। বাটাম বলল, “না, না। ঠিক আছে। বুকান আর আমি একটা ব্যাগের একটা একটা করে হাতল ধরবো আর আমি অন্য হাতে এই ব্যাগটা নিয়ে নেব। তাহলেই হবে।”
বুকান তাড়াতাড়ি এগিয়ে গিয়ে একটা ব্যাগের হাতল ওর ডান হাতে নিল, অন্য হাতলটা বাটামের বাঁ হাতে। ছেলেটা বলল, “তাহলে ওই ব্যাগের একটা হাতল আমাকে দাও...” বলে প্রায় জোর করেই বাটামের হাত ছাড়িয়ে একটা হাতল ও-ও ধরে নিল।
তিনজনে আড়াআড়ি রাস্তা দিয়ে চলতে চলতে ছেলেটার সঙ্গে আলাপ হয়ে গেল। ওর নাম স্বপ্নীল। ওকে সবাই নীল বলে ডাকে। ও বাটামের চেয়ে এক ক্লাস উঁচুতে পড়ে বলে বাটাম আর বুকান ওকে নীল-দা বলে ডাকতে শুরু করল। চলতে চলতে নীল-দা বলল, “তোরা ওই পাগলিটার সঙ্গে কী কথা বলছিলি?”
বাটাম কিছু বলার আগেই বুকান বলল, “মা-বাবা বলেছে পাগলি, খোঁড়া, অন্ধ, কানা — এসব বলা খুব খারাপ। উনি পাগলি নন, অসুস্থ। তাই কাজকর্ম করতে পারেন না, ভিক্ষে করে খেতে হয়।”
বাটাম বলল, “শুনেছি ওদের বাড়িটা আমাদের বাড়ির পাশেই, আর ওনার এক বোন আছে।”
নীল বুকানের কাছে বকুনি মতন খেয়ে একটু থতমত খেয়ে গেছিল। সামলে নিয়ে বলল, “হ্যাঁ। তবে বোন না, দিদি।” চলতে চলতেই বই ধরা হাতটা তুলে দেখাতে গিয়ে আবার হাতটা নামিয়ে বলল, “ওই যে, রাস্তার ওপারে।”
বাজারে দেখা মহিলার মতোই একজন রাস্তার ওপারে দাঁড়িয়ে রয়েছে। দুজনের মধ্যে চেহারার মিল রয়েছে। দেখেই বোঝা যায় বয়সে বড়ো। পরনের শাড়িটা একই রকম নোংরা এবং এর রংটা কোনও কালে সবজেটে ছিল। আর কাঁধে একটা মস্তো ব্যাগ, যেটা দেখেই বোঝা যাচ্ছে খুব ভারি এবং অনেক জিনিসপত্রে ঠাসা। নীল-দা বলল, “যত কিছু দু’বোনের আছে, সারাক্ষণ ওই ব্যাগে নিয়ে ঘুরে বেড়ায়।”
বুকান জানতে চাইলো, “কিন্তু রাত্তিরে শোয় কোথায়? ওদের তো থাকার জায়গাই নেই।”
নীল জানে না। বলল, “কে জানে! হয়তো বাজারেই শোয় কোথাও...”
কথায় কথায় বাড়ি পৌঁছে গেল। নীল-দা বললো, “আমি বাড়ি যাই, তোরা পরে আমার বাড়িতে আসিস। এই যে, এই রাস্তা দিয়ে সোজা গিয়ে চারটে বাড়ি পরে দেখবি ডানদিকে একটা গলি — সেই গলিতে ঢুকে আমাদের দু’নম্বর বাড়ি। নতুন রং হয়েছে — হলুদ। দেখলেই চিনতে পারবি।”
বাবার অফিসে দু’চারজন বাইরের লোক বসে আছে। ওদের দেখে মোতিদাদা বেরিয়ে এসে বলল, “তোমরা এত ভারি ভারি ব্যাগ টেনে টেনে আনলে কেন? দোকানে দিয়ে আসলেই তো ওরা পাঠিয়ে দিত।”
বুকান বলল, “আমরা বাজারে গেছিলাম। কৃত্তিকাপুরের বাজার।” মোতিদাদার মুখ দেখে বোঝা গেল ও নামটাই শোনেনি। ওদের হাত থেকে ব্যাগদুটো নিয়ে ওদের আগে আগে উঠে দোতলায় গিয়ে মাকে বলল, “বৌদি ওদের এই অচেনা অজানা জায়গায় বাজারে পাঠানোর দরকার নেই... আমাকে বলবেন।”
মা খুব অবাক হয়ে বলল, “তোরা বাজারে গেছিলি কেন? বললাম যে মুদির দোকানে সব পাওয়া যাবে!”
বাটাম বলল, “বাজারে সব জিনিস পাওয়া যায়, আর দোকানদাররা আমাদের চেনে না বলে।”
বুকান বলল, “আর পাশের বাড়ির ওই দুজন আন্টিকেও দেখে এলাম।”
মা প্রথমে বুঝতে পারল না। বলল, “কে পাশের বাড়ির আন্টি?”
বুকান বলল, “ওই যে, পাশের ভাঙা বাড়িতে দুজন ভদ্রমহিলা... বাবা কাল বলল না?”
আরও অবাক হয়ে মা বলল, “কোথায় দেখলি?”
বুকান বললো, “একজন বাজারের সামনে দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করছিল, আর একজন আর একটু দূরে একটা মস্ত ব্যাগ নিয়ে দাঁড়িয়ে ছিল।”
বাটাম বলল, “বাজারের টাকা থেকে বুকান দশ টাকা ওদের দিয়ে এসেছে,” বলে পকেট থেকে বাকি টাকা বের করে দিল। একটু অন্যমনস্ক হয়ে মা বলল, “এত বড় একটা বাড়ি... তার মালিক কী না রাস্তায় দাঁড়িয়ে ভিক্ষা করে খাচ্ছে...” তারপরে আর কিছু বলল না।
বুকান বললো, “আর একজনকে দেখলাম। আমাদের ব্যাগ ধরে নিয়ে এলো। নীল-দা।” এবারে দুজনে মিলে মাকে স্বপ্নীলের কথা বলল। বলল নীল-দা ওদের ওর বাড়িতে যেতেও বলেছে। মা বলল, “বেশ তো, বিকেলে যেও। এখন যাও, চান টান করে নাও।”
দুপুরবেলা মা দুই ভাই বোনকে বলল একটু অংক প্র্যাকটিস করতে। অন্তত দশটা অঙ্ক যেন ওরা করে রাখে। বাটামের অঙ্ক করতে সময় লাগে, বুকান ওর চেয়ে অনেক তাড়াতাড়ি অংক শেষ করে ঘর থেকে বেরিয়ে গেল। বাটাম নিজের কাজ শেষ করে গিয়ে দেখল বুকান ওই শেষ ঘরটার জানলা দিয়ে পাশের ভাঙা বাড়ির দিকে তাকিয়ে বসে আছে।
বিকেলে বাটাম বলল, “মা, আমি একটু নীল-দার বাড়ি থেকে ঘুরে আসি।”
মা বললো, “বেশ তো, যা। বুকান যাবি না?”
মাথা নেড়ে বুকান বলল, “না। আমি বরং পাড়াটাতে একটু ঘুরে আসব।”
সন্ধেবেলা দুজনে যখন আবার পড়তে বসেছে, মা নিজের ঘরে টেবিলে কম্পিউটারে লেখালেখি করছে, বাবা তখনও অফিস থেকে ওপরে ওঠেনি — হঠাৎ পড়া থামিয়ে বুকান বলল, “বড়দিদিও কথা বলে না।” ভূগোলের কী একটা কঠিন বিষয় মুখস্থ করার চেষ্টা করছিল বাটাম। হঠাৎ ফিসফিস করে বলা কথাগুলো ওর মাথাটা গুলিয়ে দিল। বলল, “কার বড়দিদি?” দুজনের পড়াশোনা করার সময়ে নিজেদের মধ্যে বকবক গল্প করা মা-বাবা কেউ পছন্দ করে না, তাই বাটামের প্রশ্নে থতমত খেয়ে বুকান ফিসফিসিয়ে বলল, “আস্তে বল। মা শুনলে বকবে। ওই পাশের বাড়ির দুই বোনের মধ্যে বড়দিদি সে-ও কথা বলে না। বিকেলে দেখলাম রাস্তায়, কথা বললাম, উত্তর দিল না। তবে অন্য জনের মতো সারাক্ষণ মনে মনে বিড়বিড় করছিল না।”
বাটামের খুব বিরক্ত লাগল। নতুন বাড়িতে এসে থেকে বোনটা কেমন যেন হয়ে গেছে। মাথায় সারাক্ষণ পাশের ভাঙা বাড়িটাই ঘুরছে। নতুন বাড়ি, নতুন পাড়া, সেখানে নতুন বন্ধু হতে পারে — কোনও দিকে নজর নেই। ফিসফিস করে বকুনি দেবার সুরে বলল, “তোর মাথাটা গেছে! সারাক্ষণ খালি ওই কথা আমার আর ভালো লাগছে না। তোর কি আর কিছু বলার নেই বা ভাবার নেই?”
বকুনি খেয়ে বুকান আর কিছু বলল না। মন দিল বইয়ের পাতায়। বাটামও ভূগোল বইয়ে ডুবে গেল। পড়াশোনা শেষ করে খাওয়াদাওয়ার সময় আর তার পরে রাতে শুতে গিয়ে বাটাম দু’চারবার বুকানের সঙ্গে কথা বলতে গিয়ে বুঝল বুকান রেগে আছে। ঠিকমত কথার উত্তর দিচ্ছে না, নিজে থেকে তো কিছু বলছেই না। ঘুম পেয়েছিল। তাই ও-ও বেশিক্ষণ কথা বলার চেষ্টা না করে ঘুমিয়ে পড়ল।
পরদিন ভোরবেলা বাটামের ঘুম ভাঙলো মা-র ধাক্কাধাক্কিতে।
“বাটাম, এই বাটাম! বুকান কোথায়?” বাইরে তখনও আলো ফোটেনি ঠিক করে। বাটামের চোখে গভীর ঘুম। কোনও রকমে চোখটা একটু ফাঁক করে দেখল বোনের বিছানা খালি। আধঘুমন্ত অবস্থাতেই কোনও রকমে বলল, “ওই ঘরে।” বলে আবার ঘুমিয়ে পড়ল। মা ওই ঘরে দেখে এসেছে — সেখানে বুকান নেই। মা একটু আগে ঘুম থেকে উঠে বাথরুম যেতে গিয়ে ছেলেমেয়ের ঘরে উঁকি মেরে বুকানের বিছানা খালি দেখে দোতলার সবকটা ঘরই খুঁজে দেখেছে, তবুও, বাটামকে জাগাতে না পেরে আবার সবকটা ঘর, বাথরুম, এমনকি রান্নাঘর আর ভাঁড়ার-ঘরেও উঁকি মেরে দেখল, সবই খালি। এবারে নজরে পড়ল সিঁড়ির দরজাটায় ছিটকিনি নেই, ভেজানো। এবারে ভয় পেয়ে মা বাবাকে ঘুম থেকে তুলল।
“শুনছো? ওঠো। বুকান বিছানায় নেই। ওপরতলার কোনও ঘরেই নেই — আর সিঁড়ির দরজাটা খোলা।” বাবার ঘুম ভাঙতে দেরি হল না। চট করে জামা চাপিয়ে তরতর করে সিঁড়ি দিয়ে নেমে গিয়ে দেখল বাইরের দরজাও ভেতর থেকে খোলা, কিন্তু বাইরে থেকে হুড়কো টানা। নিচের তলায় রান্নাঘরের পাশ দিয়ে খিড়কির রাস্তা দিয়ে বেরিয়ে বাবা প্রথমে বাইরের থেকে সদর দরজাটা খুলল, তারপর নিচের ঘরে ঢুকে মোতিদাদাকে ঘুম থেকে তুলে বলল, “বুকান কখন বেরিয়ে গেছে জানি না। শিগগিরি খুঁজতে হবে।”
বাটাম গভীর ঘুমের মধ্যে স্বপ্ন দেখছে বুকান হারিয়ে গেছে, আর ও বোনকে খুঁজতে গিয়ে সিঁড়িতে পা পিছলে পড়ে যাচ্ছে। স্বপ্নের মধ্যে বাটাম পড়ছে তো পড়ছেই, পড়ছে তো পড়ছেই — সে পড়া আর থামছে না। ভয়ে চমকে বাটাম ধড়ফড়িয়ে ঘুম থেকে উঠে বসল। পাশে বুকানের বিছানা খালি। মনে পড়ল একটু আগে মা জিজ্ঞেস করেছিল বুকান কোথায়। তাই তো! সে কতক্ষণ আগে? এদিক ওদিক তাকিয়ে কাউকে দেখতে না পেয়ে বাটাম আবার ওপরতলায় সবকটা ঘর ঘুরে দেখল। তারপর নেমে এলো নিচে। সদর দরজায় দাঁড়িয়ে মা উদ্বিগ্নমুখে এদিক-ওদিক দেখছে। জিজ্ঞেস করল, “বুকান বাড়িতে নেই, মা?”
মা বললো, “না। কখন বেরিয়েছে জানিস কিছু? এই দরজাটা বাইরে থেকে হুড়কো টেনে দিয়ে গিয়েছিল। বাবা খিড়কির দরজা দিয়ে বেরিয়ে খুলে দিল।”
বাটাম মাথা নাড়লো। কাল রাতে ও ঘুমিয়ে পড়েছে কখন জানে না। সারারাত্তির ঘুম ভাঙেনি। বুকান কখন বেরিয়েছে তা-ও জানে না। এসব কথা বলতে বলতেই একদিক থেকে মোতিদাদা, আর একদিক থেকে বাবা হনহনিয়ে ফিরে এলো। বাবা জিজ্ঞেস করল, “ফেরেনি এখনো?” মা মাথা নাড়লো। মোতিদাদা বলল, “আমি তো ওদিকে অনেক দূর পর্যন্ত গেলাম — কোথাও দেখতে পেলাম না।” বাবা খুব উদ্বিগ্ন গলায় বলল, “কী আশ্চর্য! রাত্তিরে, না ভোরবেলায় কখন বেরিয়েছে বাটাম জানিস?”
বাটাম মাথা নাড়লো। জানে না। মা বললো, “যাবেই বা কোথায়?”
বাবা বলল, “কী জানি? পুলিশে খবর দিতে হবে...” বলতেই বাটামের কী মনে হল, বলল, “বাবা, নিশ্চয়ই পাশের বাড়িতে গেছে!”
বাবা-মা দুজনেই অবাক হয়ে তাকালো। “পাশের বাড়ি কেন?”
বাটাম বলল, “পাশের বাড়িতে রাত্তিরে আলো জ্বলে।”
বাবা অবাক হয়ে বলল, “ওই বাড়িতে আলো জ্বলবে কি করে? ওখানে ইলেকট্রিসিটিই নেই!”
বাটাম মাথা নেড়ে বলল, “ইলেকট্রিক্ আলো নয় — বোধহয় মোমবাতির আলো। হলুদ আলো। হাওয়ায় কাঁপে।”
বাবা ততক্ষণে হাঁটা দিয়েছে পাশের বাড়ির দিকে। সঙ্গে ওরা সবাই। বাবা পাশের বাড়ির গেটের সামনে দাঁড়িয়ে দু হাত দিয়ে গেটটাকে ঠেলার চেষ্টা করে বললো, “উহুঁ, এই গেট খুলে ঢোকার ক্ষমতা আমারও নেই। দেখেছিস কেমন মাটি জমে আটকে আছে? আর পাঁচিল টপকে...” বলে বাবা পাঁচিলের উচ্চতা আন্দাজ করার জন্য তাকিয়েছে, বাটাম বলল, “না, বাবা, এদিকে এসো। বুকান দেখেছিল বাড়ির পাশ দিয়ে একটা গলি মতন গেছে...” বলে বাড়ির ওপাশের পাঁচিল পার করে দু’বাড়ির ফাঁকে সরু জায়গাটার মুখে এসে দাঁড়াল। মোতিদাদা বলল, “আমি ঢুকছি। আপনারা দাঁড়ান।” তবে মোতিদাদার পেছনে পেছনে বাবাও গেল আর তার পেছনে বাটাম। মা-ও একটু দোনামোনা করে নাইটিটা সামলে গেল ওদের সঙ্গে। নর্দমার দুদিকে পা দিয়ে সাবধানে এগোতে এগোতে খানিকটা গিয়ে দেখা গেল পাঁচিলটাও আর আস্ত নেই — ভেঙে পড়ে আছে। এদিকেও ঘাস আর আগাছার জঙ্গল। আর একটু এগিয়ে বাড়ির ভেতরে একটা পায়ে চলা পথ ঢুকেছে। সেই পথে সাবধানে এগিয়ে ওরা অবাক হয়ে দেখল বাড়ির পিছন দিকের একটা ঘরের মেঝেটা তুলনামূলক পরিষ্কার এবং সেখান মাটিতেই শুয়ে অকাতরে ঘুমোচ্ছে বাড়ির মালিক দুই বোন যাদের বাটাম-রা বাজারের কাছে দেখেছিল, আর তাদের সঙ্গে ঘুমোচ্ছে বুকান।
“তুই কখন গেছিলি ওখানে?” মা-র প্রশ্নের উত্তরে খাওয়া থামিয়ে আঙ্গুলে লেগে থাকা আলু ছেঁচকির ঝোলটা চেটে নিয়ে বুকান একটু ভেবে বলল, “তোমরা ঘুমিয়ে পড়ার পরেই। আমি দু’দিন ধরে ভেবে দেখলাম ও বাড়িতে রাত্তিরে আর কেউ থাকতে পারে না — যাদের বাড়ি, তারাই নিশ্চয়ই আসে। তাই আমি চুপিচুপি দেখতে গিয়েছিলাম। ভেবেছিলাম যাব আর আসব। দেরি করব না। গিয়ে দেখি যা ভেবেছি তাই — ঘরে আন্টিরা বসে, মোমবাতির আলোয় বাজার থেকে জোগাড় করা, কিনে আনা খাবার-দাবার খাচ্ছে। আমাকে দেখে প্রথমে খুব ভয় পেয়ে গিয়েছিল। কিন্তু তারপরে আস্তে আস্তে অনেক গল্প করলাম আমরা। কখন ঘুমিয়ে পড়েছি জানি না, তাই না?”
দু’বোন কিছু না বলে ঘাড় নাড়ল। ওদের দুজনকে বুঝিয়ে-সুঝিয়ে ওদের বাড়িতে আনা সহজ হয়নি। এসেও, বারবার বলা সত্ত্বেও চান করতে চায়নি, তবে মা জোর করে হাত-মুখ ধুইয়ে ওদের খেতে বসিয়েছে। ওরা কথা বলছে না, শুধু ভয়ে ভয়ে তাকাচ্ছে আর একটু একটু করে খাচ্ছে। মা এবারে ওদের বলল, “আপনাদের নাম জানি না তাই...”
বুকান বলল, “ওনার নাম স্মিতা... স্মিতা আন্টি আর...” বলে ছোট বোনের দিকে তাকিয়ে বলল, “উনি মিতু আন্টি।”
স্মিতা এতক্ষণ কোলের ওপরে মস্ত ব্যাগটাকে আঁকড়ে বসে একটু একটু করে লুচি আর আলুর ছেঁচকি খাচ্ছিল। এখন হঠাৎ মুখ তুলে বলল, “ওর নাম আগে ছিল মিতা, কিন্তু দূর থেকে ডাকলে স্মিতা আর মিতা একরকম শোনায় বলে পরে ওর নাম হল মিতু।”
খাওয়া শেষ করে ওরা আর থাকল না। বারবার বলা সত্ত্বেও কোনও রকমে হাত ধুয়ে দু’বোনই বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল।
বুকান মাকে জিজ্ঞেস করল, “আচ্ছা, ঠাকুরদা ঠাকুমা আসার আগে পর্যন্ত দুজন আন্টি ওই ঘরটায় থাকতে পারবে না, একেবারে শেষ ঘরটায়?”
মা বলল, “এত বড়ো বাড়িতে ঠাকুরদা ঠাকুমা আসার পরেও নিশ্চয়ই জায়গা দেওয়া যাবে — কিন্তু ওনারা থাকতে চাইলে তবে তো?”
বুকান বলল, “আমি রোজ ওদের সঙ্গে দেখা করব। আমার মনে হয় ওদের বন্ধু হয়ে গেলে ওরা আর না বলবে না।” মা একটু হেসে বুকানের মাথায় হাত বুলিয়ে বলল, “চান করে নিজের বিছানায় শুয়ে ঘুমিয়ে নাও। কাল রাতে নিশ্চয়ই ভালো করে ঘুম হয়নি। আর এরপরে আন্টিদের সঙ্গে দেখা করতে হলে ওরকম রাত্তির বেলায় যেও না।
বুকান বলল, “রাত্তিরে না গেলে ওদের পাওয়াই যাবে না।”
মা বলল, “বেশ, তাহলে এখন থেকে আমরা রোজ ভোরবেলা ওদের ডেকে নিয়ে এসে এখানেই ব্রেকফাস্ট খাওয়াবো। কেমন?”
পরপর কয়েক দিন স্মিতা আন্টি আর মিতু আন্টি ওদের বাড়িতে ব্রেকফাস্ট খাওয়ার পর মা হঠাৎ একদিন কাউকে কিছু না বলে গিয়ে হাজির হল রাত্তির বেলায় পাশের বাড়িতে। রাত তখন অনেক। দুই বোন সবে চুপি চুপি ঘরে ঢুকে মোমবাতি জ্বেলে সারাদিন ধরে জোগাড় করা পয়সা দিয়ে কিনে আনা আর বাজার থেকে কুড়িয়ে পাওয়া খাবার নিয়ে বসেছে। মা ওদের বলল এভাবে সস্তার এবং কুড়িয়ে আনা খাবার খেয়ে খেয়ে ওদের শরীর খারাপ হয়ে যাবে। রাত্তিরের খাবার বাড়িতে তৈরি আছে — বলে ওদের দুজনকে প্রায় জোর করেই ভাঙা বাড়ি থেকে বের করে নিজেদের বাড়িতে নিয়ে এসে হাত মুখ ধুইয়ে রাতের খাবার খাইয়ে জিজ্ঞেস করল, “এবার তোমরা ওই বাড়িতে গিয়ে ঘুমোবে, নাকি এবাড়িতে তোমাদের জন্য একটা ঘরে বিছানা করে দিই — এখানেই শুয়ে পড়ো।”
স্মিতা আর মিতু মুখ তাকাতাকি করল। সত্যিই ও বাড়িটা ওদের নিজেদের হতে পারে, কিন্তু ওখানে রোজ মাটিতে শোয়া বড়ো কষ্টকর। মিতু কিছু বলল না। ও প্রায় সব সময়ই শুধু নিজের মনেই কথা বলে, কিন্তু কারওর কথার উত্তর দেয় না। স্মিতা বলল, “আমরা ও বাড়িতে না থাকলে যদি ওরা নিয়ে নেয়?”
মা জিজ্ঞেস করল, “কে নিয়ে নেবে?” স্মিতা একটু ভেবে বলল, “গীতা আর পূর্ণ।”
ওরা কারা? মায়ের প্রশ্নের উত্তরে স্মিতা চুপ করে রইল। মা আন্দাজ করল গীতা ওদের মেজো বোনের নাম। আর পূর্ণ কি গীতার বর?
বলল, “আমার বর উকিল। ভয় নেই। ইচ্ছে মতো কেউ কারও বাড়ি নিয়ে নিতে পারে না। আর যদি নিতেই হয়, তা হলে রাত্তিরে আসবে কেন? দিনের বেলাই তো আসতে পারে।”
মার কথায় দুই বোনের চোখে কেমন ভয় ঘনিয়ে এল। স্মিতা অন্যমনস্ক হয়ে বলল, “রাত্তিরে এসেছিল। আমরা গলি দিয়ে পালিয়ে গেছিলাম।”
মা জিজ্ঞেস করল, “কিন্তু সে তো অনেক দিন আগের কথা। ওরা তো বাড়িটা নিয়ে নিতে পারেনি। বাড়ি তো ওমনিই আছে। তাহলে?”
একটু ভেবে স্মিতা ওর ব্যাগটা কোলে করে উঠে দাঁড়ালো। বলল, “কোথায় শোব, দেখিয়ে দাও।” মা মাথা নেড়ে বলল, “না। আগে দুজনে চান করবে, তারপর। নইলে বিছানার চাদর ময়লা লেগে কালো হয়ে যাবে।”
মা ভাবেনি এত সহজে কাজ হবে। ওরা দুজন একে একে বাথরুমে গিয়ে সাবান মেখে চান করল, তারপরে বুকানের মায়ের দেওয়া শাড়ি পরে দুজনে দোতলার কোনের ঘরে অঘোরে ঘুমিয়ে পড়ল। পরদিন সকালে বুকান ঘুম থেকে উঠে ওদের দেখে একেবারে অবাক! “মা তুমি আন্টিদের নিয়ে এসেছ!”
বাবা ওদের অফিসে ডেকে নিয়ে বাড়ির মালিকানা সম্বন্ধে জিজ্ঞেস করল। ওরা ভয় পায়, যেতে চায় না, তাই বুকানও সঙ্গে গেল। বাবা প্রশ্ন করে, ওরা ভালো করে কিছুই বলতে পারে না। মিতু আন্টি তো একেবারে চুপ, স্মিতা আন্টি তবুও ভেবে ভেবে একটা দুটো কথার উত্তর দিল। কিছুক্ষণ পরে ওরা বেরিয়ে চলে গেল রাস্তায় ঘুরতে।
সেদিন রাতেও ওরা যখন বাড়ি ফিরছে তখন বুকান আর ওর মা ওদের জন্য অপেক্ষা করছে — “চলো বাড়ি গিয়ে খাবে।”
প্রায় দু’মাস কেটে গেল। স্মিতা আর মিতু দুজনেই রাতে আসে, খায়, থাকে আর সকালে খেয়ে বেরিয়ে যায়। সারাদিন কোথায় কোথায় থাকে, ওরা-ই জানে। মাঝে মাঝে ওদের রাস্তায় দেখা যায়, আগের মতোই ঘুরে বেড়াচ্ছে, বা লোকের সামনে হাত পাতছে। বুকানের প্রশ্নের উত্তরে মা বলেছিল, “হ্যাঁ, এখন ওদের অত খাবার কিনে খেতে হয় না, কিন্তু খানিকটা ওদের অভ্যেস। বহু বছর এভাবেই থেকেছে কি না?”
সে দিনটা ছিল রবিবার। সকালের খাবার খেয়ে স্মিতা আন্টি বেরোবার পথে তার মস্তো ব্যাগটা নিয়ে ঢুকে পড়ল বাবার অফিসে। মিতু আন্টিও গেল পেছন পেছন। বাবার সামনে বসে স্মিতা আন্টি বলল, “দলিল পেলে বাড়িটা আমাদের হয়ে যাবে?” বাবা মাথা নেড়ে বলল, “না। আপনারা তিন বোনই বাড়ির মালিক।”
স্মিতা আন্টি বলল, “বাড়ি আমাদের দিয়ে গেছে।”
বাবা অবাক হয়ে বলল, “ কে দিয়ে গেছেন? আপনার বাবা? আপনি কী করে জানলেন? উনি কোনও উইল লিখেছেন? সে উইল কোথায়?”
উত্তর না দিয়ে স্মিতা আন্টি কোল থেকে ব্যাগটা নামিয়ে মাটিতে রেখে তার পাশে উবু হয়ে বসে ব্যাগের জিপ ফাস্নার খুলে এটা ওটা বের করতে থাকলো। বাবা, মোতিদাদা আর সেই সঙ্গে বুকান আর বাটাম অবাক হয়ে এই প্রথম ব্যাগটার ভেতরে কি আছে দেখতে পেল। শাড়ি, জামা, বেশ কিছু খাতাপত্র, এমন কী পুরোনো ক্যালেন্ডার দু’চারটে, আর ঘটিবাটি থালা-চামচ! এর ভেতর থেকে স্মিতা আন্টি বের করে আনল একটা ফাইল। বাবার হাতে দিয়ে বলল, “এতে সব আছে।”
বাবা ফাইলটা খুলে বলল, “এ কী! এ তো বাড়ির দলিল। ভালো করে দেখতে হবে। আর কী আছে...” বলে কয়েকটা কাগজ উলটে বলল, “এটা কি উইল?”
স্মিতা আন্টি কিছু বলল না, বাবার দিকে তাকিয়ে রইল। বাবা ব্যাগের মধ্যে উঁকি মেরে বলল, “ওটা কিসের ফাইল?”
এক লহমায় মুখটা শুকিয়ে গেল স্মিতা আন্টির। তাড়াতাড়ি ব্যাগের মধ্যে কাপড়-জামা-খাতা-বাটি ঢোকাতে ঢোকাতে বলল, “ওটা কিছু না... ওটা কিছু না...”
বাবা বলল, “ভরসা করে আমাকে বাড়ির দলিল দিয়ে দিলেন, আর ওটা দেখাতে অসুবিধে হচ্ছে?”
স্মিতা আন্টি অনেকক্ষণ চুপ করে বাবার দিকে তাকিয়ে থেকে তারপর আস্তে আস্তে ফাইলটা বের করে দিল। ফাইলটার কয়েকটা কাগজ দেখে বাবা বলল, “আপনার আর মিতুর ডাক্তারি চিকিৎসার কাগজ? আর চিকিৎসা করান না? আমার চেনা ভালো ডাক্তার আছে। আমি যদি তার কাছে আপনাদের নিয়ে যাই, যদি চিকিৎসা করে আপনারা সেরে যান, তারপরে আপনাদের জন্য লড়াই করে বাড়িটা আবার সারানোর ব্যবস্থা করতে পারি... সে চেষ্টা কি করব?”
ভীষণ ভয় পেয়ে স্মিতা আন্টি বলল, “না, না, ডাক্তার না। ওরা শক দেবে।”
বাবা মাথা নেড়ে বলল, “না। আপনি বলবেন আপনি শক চান না। ডাক্তারবাবু নিশ্চয়ই আপনার কথা শুনবেন।”
ভয়ার্ত চোখে বাবার দিকে তাকিয়ে স্মিতা আন্টি বলল, “আগে দিয়েছিল।”
বাবা মাথা নেড়ে বলল, “আজকাল রোগীর মতামত না নিয়ে ডাক্তাররা চিকিৎসা করেন না।”
স্মিতা আন্টি বলল, “হাসপাতালে যেতে হবে? থাকতে হবে ভর্তি হয়ে?”
এবারে বাবা বলল, “সেটাও আপনারা না হয় ডাক্তারবাবুর সঙ্গে আলোচনা করে ঠিক করবেন? তবে আমার মনে হয় এ বিষয়টা ডাক্তারবাবুর ওপর ছেড়ে দেওয়াই ঠিক। উনি যদি বলেন ভর্তি হলে চিকিৎসা ভাল হবে, তাহলে তা-ই ভাল। তবে আমি আপনাদের কথা দিচ্ছি, আপনারা যদি না চান ডাক্তারবাবু ভর্তি করবেন না।”
ওরা কিছুক্ষণ চুপ করে বসে থেকে বাড়ি থেকে বেরিয়ে গেল। স্মিতা আন্টি একবার ফাইল-দুটো ফেরত চেয়েছিল, কিন্তু বাবা মাথা নেড়ে বলল, “রাস্তাঘাটে রোদে-বৃষ্টিতে এত লোকের মধ্যে এই ফাইল নিয়ে নিয়ে ঘুরে বেড়ানো ঠিক নয়। আমি আপনাদের উকিল। আমার কাছে এগুলো থাকলে কোনও ক্ষতি হবে না। আমি রসিদ দিচ্ছি। রসিদটা একটা নতুন ফাইলে আপনি ব্যাগে রেখে দিন।”
ততক্ষণে ইন্দ্রানী আন্টি অফিসে এসে গিয়েছে। বাবা ডেকে বলল, “এই ফাইলদুটো সাবধানে আলমারিতে তুলে রাখো, আর একটা রসিদ লিখে একটা নতুন ফাইলে ভরে ওপরে ওনাদের নাম লিখে ওনার হাতে দাও।” ওরা বেরিয়ে যাবার পর বাবা বলল, “এবারে যাও, একটু পড়াশোনা করো। মনে হচ্ছে ওরা আমাদের ভরসা করেছে, তাই সব দিয়ে গেল। এবার দেখি কি করতে পারি।”
ঘন্টা দুয়েক বাদে দরজায় কে ঘণ্টা দিল। মোতিদাদা দরজা খুলে দেখে বাটামের বয়সী একটা ছেলে দাঁড়িয়ে আছে, সঙ্গে আরও কয়েকটা ছোটো ছোটো সমবয়সী ছেলেমেয়ে। ছেলেটা জিজ্ঞেস করল, “বাটাম বাড়ি আছে? মোতিদাদা সিঁড়ির দিকে তাকিয়ে বললো, “ওপরে।”
ওরা সিঁড়ি দিয়ে উঠছে সেটা নিজের ঘর থেকে দেখতে পেল বাবা। জিজ্ঞেস করল, “কে রে?” মোতিদাদা বলল, “বাটামের বন্ধু বোধহয়।”
বাবা একটু অবাক হয়েই বললো, “বাপরে এত বন্ধু হয়ে গেছে ওদের!” বলে আবার কাজে মন দিল। একটুক্ষণ কাজ করতে না করতেই আবার দরজার ঘন্টা বাজল। বাবা এবার একটু ভুরু কুঁচকে বলল, “আবার কে? মোতি, ঘণ্টাটা বড্ড জোর। বড় কানে লাগে। আরও নরম ঘণ্টা আনতে হবে। যা, দেখ গে কে এল।”
এবারে মোতি ফিরে এসে বলল, “পাড়ার ক’জন গণ্যমান্য এসেছেন আপনার কাছে। বড়ো ঘরে বসিয়েছি।”
কাজ বন্ধ করে বাবা উঠে গেল। চার-পাঁচজন এসেছে, যাদের মধ্যে একজনকে বাবা চেনে। বাবা ঘরে ঢুকতে তারা উঠে দাঁড়িয়ে নমস্কার করল। বাবা-ও নমস্কার করে বলল, “বসুন। মোতি, একটু চা কর, বাবা।” পরিচিত ভদ্রলোকের দিকে তাকিয়ে বলল, “নকুলবাবু, আমি কেবল আপনাকেই চিনি।”
বাকিরা নিজেদের পরিচয় দিলেন। সকলেই পাড়ার লোক, সকলেই অনেক বছর ধরে এখানেই থাকেন। সকলকে চেনেন — এসব কথাবার্তা হতে হতে চা এসে গেল। চায়ে চুমুক দিয়ে নকুলবাবু বললেন, “আমরা একটা বিশেষ ব্যাপারে এসেছি, একটু আপনার সঙ্গে আলোচনা করতে।”
বাবা বলল, “বলুন।” আর একজন গলাখাঁকারি দিয়ে বললেন, "আপনারা এই পাশের বাড়ির মেয়েদুটিকে বোধহয় আশ্রয় দিয়েছেন।”
বাবা মাথা নেড়ে বলল, “আশ্রয় কোথায়? কোনও রকমে রাতের খাবারটুকু কয়েকদিন হল খাচ্ছেন, আর সকালবেলা অল্প কিছু খেয়ে বেরিয়ে যান। এর বাইরে তো আর কিছুই করতে পারিনি।”
তৃতীয় একজন ভদ্রলোক বললেন, “আসলে ব্যাপারটা কী জানেন, পাড়ার লোক আমরা, সবাই কাছাকাছি বয়সী। ওদের মা-বাবাকে আমরা দাদা দিদি বলেছি। এই নকুল কাকু কাকীমা বলতো। নকুল আর ছোট মেয়ে কাছাকাছি বয়সী। চোখের সামনে দেখেছি বাবা-মা মারা যাবার পর কী রকম দুর্দশা হয়েছে মেয়ে দুটোর। মেজো বোনটা দূরে থাকে, যোগাযোগ তো রাখেই না, আর বহু বছর আগে মা-বাবা মরে যাবার পরে একবার ও আর ওর বর বাড়িটাকে জবরদখল করার চেষ্টা করেছিল। তখন আমরা পাড়ার লোক সকলে মিলে বাধা দিয়েছিলাম বলেই পারেনি, কিন্তু তার বেশি তো আমরা আর কিছুই করতে পারিনি। মেয়ে দুটো রাস্তায় ঘুরে বেড়ায়, আমরা দেখি। কখনও আমাদের থেকে কিছু পয়সা বা খাবার-দাবার চাইলে দিই। ডেকে দিতে গেলে নেয় না, চলে যায়। কাউকে বিশ্বাস করে না। তাই যখন দেখলাম আপনাদের ওপর ভরসা করছে তাই সকলে ঠিক করলাম আপনাকে বলি যে আমাদের যদি সাহায্য লাগে... কোনও ভাবে কিছু করতে পারি তাহলে জানাবেন।”
বাবা একটু হাসল, তারপর বলল, “অবশ্যই। আমি বেশ কয়েকবার ওদের বলেছি বাড়িটার কোনও ব্যবস্থা যদি করা যায়... তবে সবটা তো আমার একার পক্ষে সম্ভব নয়... ওদের চিকিৎসার ব্যবস্থা করে সুস্থ করে তুলে যদি বাড়িটা দুজনকে আবার ফিরিয়ে দেওয়া যায়, তবে একটা ভালো কাজ হবে বৈকি...”
কথাবার্তা শেষ করে ভদ্রলোকেরা বাড়ি থেকে বেরোতে যাবেন এমন সময় ওপরতলা থেকে দুদ্দাড়িয়ে নেমে এলো সাত-আটজন ছোটো ছোটো ছেলেমেয়ের দল। বড়োরা অবাক! “এই, তোরা এখানে কী করছিস?”
ছোটোরাও বড়দের দেখে, “আরে, তোমরা এখানে কি করছ...?” বলে থমকে গেল। নীল প্রথম এগিয়ে এসে তার বাবাকে বললো, “ওই যে, স্মিতা আর মিতু মাসির বাড়িতে নজরদারির জন্য আমাদের যে ছোটোদের দলটা আছে তারা এসেছিলাম বাটাম আর বুকানের সঙ্গে আলোচনা করতে। ওরা তো এখন ওদের দেখাশোনা করছে তাই ওদেরকেও আমাদের দলে ভিড়িয়ে নিলাম।”
বাবা অবাক হয়ে বলল, “আপনারা, আপনাদের ছেলে-মেয়েরা সকলেই এত খেয়াল রাখেন?”
নকুল বাবু বললেন, “আজ্ঞে হ্যাঁ। আমাদের সারাক্ষণ ভয় থাকে ওদের মেজো বোন বা বাড়ীর মেজো জামাই পাছে লোকজন পাঠিয়ে বাড়িটা আবার দখল করার চেষ্টা করে... কাজে-কর্মে তো সকলকে বেরোতে হয়, তাই পাড়ার ছেলে-মেয়ে-বুড়ো সবাই বাড়িটার দিকে আর মেয়ে দুটোর দিকে একটা চোখ রাখে... কে আসছে, কে যাচ্ছে, কতক্ষণ থাকছে সে নিয়ে আমাদের একটা চিন্তা থেকেই যায়। সত্যি বলতে কী আপনাকে নিয়েও চিন্তা হয়েছিল যখন দেখছিলাম আপনার ছেলে মেয়ে বারবার বাড়িটার সামনে যাচ্ছে আর স্মিতা আর মিতু বারবার আপনাদের বাড়িতে আসতে শুরু করেছে।”
এবারে বাবা খুব জোরে হেসে বলল, “না, আমাদের নিয়ে আপনাদের চিন্তা নেই। বরং আমি কথা দিচ্ছি এই দুটি মেয়ের ভালো-মন্দ নিয়ে আপনাদের যে চিন্তা তাতে আপনারা আমাদেরও সমান ভাগীদার পেলেন এবং তার প্রধান কৃতিত্ব বুকানের, এ বিষয়ে সন্দেহ নেই।”
কেটে গিয়েছে আরও ছ’মাস। এখন স্মিতা আন্টি ওদের বাড়িতেই থাকে। রাস্তায় ঘুরে ঘুরে বেড়ায় না, বাজার যায়, বাটাম আর বুকানের সঙ্গে হাঁটতে যায়, আর মার সঙ্গে প্রতিবেশীদের বাড়িতে যায় কখনও, কখনও একাও যায়। আর যায় হাসপাতালে। সেখানে মিতু আন্টি এখনও ভর্তি। ডাক্তার আঙ্কল প্রথমেই বলেছিলেন স্মিতা আন্টিকে ভর্তি হতে হবে না। বাড়িতে চিকিৎসা করলেই চলবে। বলেছিলেন, “কিন্তু যেমন বলে দেব তেমন ওষুধ খেতে হবে। না খেলে মুশকিলে পড়বেন।” মিতু আন্টি প্রথমে ভর্তি হতে চায়নি। ভয় পেয়েছিল। বলেছিল, “আমাকে ইঞ্জেকশন দেবে, শক দেবে।” তবে মা, বাবা, স্মিতা আন্টি আর পাড়ার অন্যান্য লোক সকলে যখন বুঝিয়ে বলেছিল তখন রাজি হয়েছিল। বলেছিল, “কিন্তু আমার সঙ্গে রোজ দেখা করতে আসবে তো?” তাই রোজই পাড়া থেকে কেউ-না-কেউ কেউ স্মিতা আন্টির সঙ্গে যায় মিতু আন্টির সঙ্গে দেখা করতে। এখন অনেক ভালো আছে মিতু আন্টি। নিজের মনে মনে বকবক করে না, কেউ গেলে তাদের সঙ্গে বসে অনেক গল্প করে।
কাগজপত্র ঘেঁটে বাবা দেখেছে স্মিতা আন্টির ব্যাগের ফাইলে বাড়ির দলিলটা সত্যিই আছে, আর রয়েছে ওদের বাবার লেখা উইল। তাতে স্পষ্ট লেখা আছে যে মেজো মেয়ে গীতাকে তিনি বিয়ে দিয়ে দিয়েছেন বলে বাড়ির মালিকানা থাকবে কেবলমাত্র স্মিতা আর মিতুর হাতে। বাবা স্মিতা আন্টিকে বুঝিয়ে বলেছে যে এটা উচিত নয়। তিন মেয়ের মধ্যে একজনের বিয়ে হয়ে গিয়েছে বলে বাবার সম্পত্তি থেকে তাকে বঞ্চিত করা ঠিক না। হাসপাতালে গিয়ে মিতু আন্টিকেও একই কথা বুঝিয়েছে স্মিতা আন্টি আর বাবা। আন্টিরা অত বোঝে না। বাবাকে বলেছে, যেটা উচিত হবে তাই করতে। পাড়ার অন্যান্য মাতব্বরদের সঙ্গে আলোচনা করে বাবা গীতা আন্টিকেও ডেকে এনেছিল। এর মধ্যে বাবার স্কুলের বন্ধু অসিত আঙ্কেল এসে বাড়িটা দেখে গেছে। অসিত আঙ্কেল স্ট্রাকচারাল ইঞ্জিনিয়ার। বাড়ি তৈরির ব্যাপারে সব জানে। বাড়ি দেখেই আঙ্কেল বলেছে এ বাড়ি মেরামত করা যাবে না। ভেঙে ফেলে আবার নতুন করে তৈরি করতে হবে। পাড়ার লোকজন, স্মিতা আন্টি, বোম্বে থেকে আসা গীতা আন্টি, আর তার বর পূর্ণ — সেইসঙ্গে বাবা-মা অনেকক্ষণ ধরে মিটিং করেছিল। পাড়ার লোকেরা গীতা আর পূর্ণর ওপরে খুব রেগে ছিল ওরা বাড়িটা দখল করতে চেয়েছিল বলে। গীতা আর পূর্ণও প্রথমে খুব রাগ করে কথা বলছিল। পরে সবাই বুঝতে পেরেছিল বাবা আসলে তিন বোনেরই ভালো চাইছে। তারপরে আস্তে আস্তে সবার রাগ কমে গেল, আর ঠিক হলো যে মিতু আন্টি হাসপাতাল থেকে ফিরে এলেই নতুন করে দলিল তৈরি হবে, যেখানে স্মিতা আন্টি আর মিতু আন্টি গীতা আন্টিকে তাদের অংশের সমান ভাগ দিয়ে গোটা বাড়িটাকে সমানভাবে ভাগ করে নেবে। অসিত আঙ্কেলের চেনা একজন প্রোমোটারের সঙ্গেও কথা হয়েছে, ভাঙা বাড়িটাকে পুরো ভেঙে ফেলে সে ওখানে চারতলা বাড়ি তৈরি করবে। নতুন বাড়িতে আটটা ফ্ল্যাট হবে। তিনটে ফ্ল্যাট পাবে স্মিতা, গীতা আর মিতু আন্টিরা। বাকিগুলো বিক্রি হবে। এখন তাই সবাই অপেক্ষা করে আছে ডাক্তার আঙ্কেল কবে মিতু আন্টিকে হাসপাতাল থেকে ছুটি দেবে।
বাটাম, বুকান আর পাড়ার ছেলেমেয়েরা একটা ক্লাব খুলেছে — নাম দিয়েছে কৃত্তিকাপুর কিশোর সঙ্ঘ। ওদের তো এখন আর কাজ নেই, ওরা তাই খুঁজছে, এর পরে পাড়ায় কার জন্য কী কী ভালো কাজ করা যায়।
No comments:
Post a Comment