Saturday, November 14, 2020

কাব্যপ্রেমী বেগম

 

কবিতা জিনিসটা কবে থেকে তিসির ভালো লাগতে শুরু করেছে, ওর মনে পড়ে না। না, ওই একেবারে ছোটোবেলার কবিতা, যেগুলো মা-মাসীরা সুর করে, হাততালি দিয়ে দিয়ে শোনাত, সেরকম কবিতা নয়। সিরিয়াস কবিতা। যে কবিতা শুনলে মন ভালো হয়ে যায়, যে কবিতা শুনলে শিরদাঁড়া বেয়ে ঠাণ্ডা স্রোত নামে, বুকের রক্ত টগবগিয়ে ওঠে, চোখে জল আসে সে রকম কবিতা। প্রথম কবিতা লেখার সখ কবে হয়েছিল তা-ও মনে পড়ে না। শুধু মনে পড়ে কিছুদিন পরে মা একটা খাতা কিনে দিয়েছিল, সেটাতে কবিতা লিখত। সে খাতাগুলো মা যত্ন করে তুলে রেখেছে কোথাও। প্রথম তিনটে খাতা মার কাছে আছে। তার পরেরগুলো সব ওর কাছেই। আর দেয়নি মা-কে।

নানা রকমের কবিতা লেখে তিসি। ওদের বাংলা ম্যা’ম বলেছেন, ওর কবিতায় ছন্দ আছে, খুব ভালো ছন্দ। অত বোঝে না তিসি। শুধু বোঝে, যে কোনও একটা নতুন ছন্দ ও সহজেই তুলে নিতে পারে। বাংলা ম্যা’ম বলেছিলেন ওটা শেখা নয়। বলেছিলেন ছন্দ শিখতে। কয়েকটা বইও দিয়েছিলেন। তিসির ভালো লাগেনি। অনেক চেষ্টা করেও বুঝতে পারেনি। ওদের ম্যা’ম কবিতা বোঝেন খুব ভালো। পড়ানও দারুণ। কিন্তু তিসিকে ছন্দ শেখানোর চেষ্টা করে পারেননি। আর তিসিরও ছন্দ শেখার ধাক্কায় কবিতা লেখা বন্ধ হয়ে গিয়েছিল প্রায়। কিন্তু বাঁচিয়ে দিয়েছিল সুদীপকাকু। সুদীপকাকু তিসির আত্মীয় না। বাবার বন্ধু। কলেজে পড়ায়। বাড়ি এলেই বলে, “তিসি, নতুন কবিতা কই?” সেবার মুখ ব্যাজার করে তিসি বলেছিল, “কবিতা তো লিখিনি কাকু, একটাও লিখিনি।” সব শুনে কাকু বলেছিল, “ছন্দ জানা, আর ছন্দ পড়া এক নয়। তোর কবিতায় ছন্দ আছে, তুই ন্যাচারাল ছান্দিক। ওই পড়ার বই ভুলে যা। যেমন কবিতা লিখছিলি তেমনই লিখে যা। ব্যাস।”

সেইদিন থেকে তিসি আর ভাবেনি। বাংলা ম্যা’ম দুঃখ পেয়েছিলেন? কে জানে? তিসির কবিতা নিয়ে তো এখনও অমনই আনন্দ করেন। যদিও এখন আর ওদের ম্যাম নন।

যেদিন তিসি মাকে এসে বলেছিল, “আমি উর্দু শিখব...” মা খুব চমকে উঠেছিল। কেন, উর্দু কেন? লোকে ফরাসী শেখে, জার্মান শেখে, এমনকি স্প্যানিশ, বা পোর্তুগীজ শেখা লোকও পাওয়া যায়। তবে উর্দু কেন?

নয় কেন? মেয়ের এ প্রশ্নের উত্তর বাবা মা কেউই দিতে পারলেন না। সেবারও খোঁজ পড়ল সুদীপকাকুর। কাকু দশ মিনিট কথা বলেই বলল, “বেশ তো। আগে তুই ভাষাটা শিখে নে, উর্দু কবিতা লেখা না-হয় পরে হবে। উর্দু কবিতার ধরণও আলাদা। গজল, মার্সিয়া, মাসনাভি, রুবাই – আরও কত রকম আমি ভালো করে জানি না, তবে শেখানোর লোক নিশ্চয়ই পাব।”

কবিতা শেখানোর লোক চায়নি তিসি। উর্দু কবিতার স্বাদ পেয়েছে ও সবে, শুধু ভাষাটা বুঝতে চায়, নইলে কবিতার অর্থ বুঝতে পারছে না।

সুদীপকাকুর বলে দেওয়া উর্দু প্রফেসরের কাছে উর্দু শেখায় নিমগ্ন হয়ে যায় তিসি।


*

দিন কাটে। তিসি আর কবি নয়, তিসি এখন শায়ের। এবং অবাক হয়ে ওর মা বাবা সুদীপ কাকুর কাছে সেদিন শুনল যে তিসি এখন নামী শায়ের। উর্দু শেখার সঙ্গে সঙ্গে উর্দুতে শায়েরী লেখায় ওর হাত এতই পেকেছে যে ওর উর্দু শিক্ষক প্রফেসর সইদুল ওর পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন ওঁর একজন শিক্ষিকা বন্ধুর সঙ্গে। তিনি শহরের কবি-শায়েরদের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিয়েছেন তিসির। এই নাজমিন আপার দৌলতে তিসি উর্দু শায়েরদের জগতে আজ পরিচিত নূর নামে নূর অর্থাৎ ঔজ্জ্বল্য। এবং এই প্রফেসর নাজমিন আগামীকাল আসবেন তিসির মা-বাবার সঙ্গে কথা বলতে তিসিকে কোনও একটা দেশবিখ্যাত কবিতার মেহ্‌ফিলে নিমন্ত্রণ করতে।

মেহ্‌ফিল! দেশবিখ্যাত! তিসি! অবাক হয়ে চেয়ে রইল মা-বাবা সুদীপকাকুর দিকে।

সুদীপকাকু অল্প কাঁধ ঝাঁকিয়ে বলল, “ওয়েল, ও যে ভালো কবিতা লেখে তা তো আমি তোদের অনেক দিন ধরেই বলেছি কিন্তু আজকাল কেমন কী লিখছে তো আর আমি শুনলেও বুঝি না। উর্দু ভাষা যে দক্ষতার সঙ্গে লেখে মেয়েটা, তা বোঝার ক্ষমতা আমার নেই। যা-ই হোক, সইদুল আমাকে বলল, আমি তোদের কাছে এলাম। তোরা অনুমতি দিলে কাল প্রফেসর নাজমিন আর সইদুল দুজনেই আসবেন।”

আপনিও আসবেন তো?” আমতা আমতা করে জানতে চাইল তিসির মা।

হা হা করে হেসে উঠল সুদীপকাকু। বললেন, “এত নার্ভাস হয়ে পড়লে কেন? আমি তো আসবই। কিন্তু সেটা তোমাদের সাহস যোগান’র জন্য নয়। শুধু জানতে যে ব্যাপারটা কতদূর গড়িয়েছে। তিসির কবিত্ব নিয়ে আমার একটা ইন্টারেস্ট আছে। সেটাকে বাড়াতে হবে না?”

পরদিন ঘণ্টা দুয়েক বসে চা-জলখাবারের সঙ্গে মা-বাবাকে সমস্ত ব্যাপারটা বুঝিয়ে দুই উর্দু প্রফেসর বিদায় নিলেন। ওঁরা চলে গেলে ঘরে হতভম্বের মতো বসে রইল মা-বাবা আর সুদীপকাকু।

কতোটুকু বয়েস ওর?” অবাক হয়ে তিসির বাবার কাছে জানতে চাইল তিসির মা। “এই বয়সেই ওকে অতদূর গিয়ে কবিত্ব ফলাতে হবে? আর দুটো দিন অপেক্ষা করলে হত না? স্কুলই তো শেষ হলো না...”

অতিথিরা চলে গেছেন। নতুন করে বানানো চায়ের কাপে চুমুক দিয়ে সুদীপকাকু বলল, “আরে, আজকাল এই বয়সটা কোনও কম বয়সই নয়। সবাই দেখবে এই সময় থেকেই শুরু করছে। খেলোয়াড়, টেলোয়াড়...”

সুদীপকে থামিয়ে দিয়ে তিসির বাবা বলল, “খেলোয়াড়দের কথা আলাদা। কবিদের কথা বল। তোদের কোন কবি এই সতেরো বছর বয়স থেকে ইন্টার্ন্যাশনাল কবি সম্মেলনে কবিতা পড়েছে রে? শক্তি চট্টোপাধ্যায়, শঙ্খ ঘোষ, নীরেন, সুভাষ...”

সুদীপ তেড়ে উঠে বলল, “রাখ, চারটে কবির নাম জানিস, ওমনি চারটে নাম উগরে দিলি...”

তিসির বাবা রেগে যায় না। হেসে বলল, “বেশ তো, এঁরা কত বয়সে নাম করেছেন না জানলেও একজনের অন্তত নাম বল যিনি তিসির বয়সে নাম না করুন, অন্তত উল্লেখযোগ্য কবিতা লিখেছেন?”

সুদীপ বলল, “কেন, সে নাম তুই-ও জানিস। রবীন্দ্রনাথ...”

তিসির বাবা হেসে বলল, “ওই দেখ, আমি তবু চারটে অন্য নাম বললাম, আরও জানি বলছি না। কিন্তু তুই ওই বাঙালির একমাত্র নামটাই করতে বাধ্য হলি।”

সুদীপকাকু বলল, “তোদের সমস্যাটা কোথায় বলবি?”

তিসির মা বলল, “আসলে পরীক্ষার বছর তো...”

সুদীপ বলল, “উঁ-উঁ-উঁ-হুঁ, তা নয়। আসল কথাটা, তোমাদের ভয় হচ্ছে। পুরো ব্যাপারটাই তোমাদের কাছে অচেনা ঠেকছে, মেয়েকে নিয়ে শায়েরির আড্ডায় যেতে দেওয়া, সেখানে কীরকম লোক আসবে যারা আসবে তারা সকলে তোমাদের চেনাশোনা গণ্ডীর বাইরের লোক... তাই না?”

দুজনকে চুপচাপ থাকতে দেখে বলল, “বেশ তো। নাজমিন ম্যাডামের সঙ্গে মেয়েকে একা যেতে দিস না। তোরা একজন যা।”

তারপরে দুজনের মুখ দেখে বলল, “এতো এত ভয়? তাহলে তো খুব মুশকিল।”


*

দুশ্চিন্তায় মা-বাবার মুখ গম্ভীর দেখে দ্বিতীয় দিন তিসি নিজেই কথাটা পাড়ল। বাবা মা দুজনেই কিছু ভেবে পায়নি। যদিও সময় আছে, প্রায় মাস আড়াই, কিন্তু ট্রেনের টিকিট কাটার দিন এগিয়ে আসছে।

বাবা বলল, “আরে দূর, ওটা সমস্যাই না। কিন্তু আগে তো স্থির করতে হবে... মা যদি সঙ্গে যায় তাহলে থাকবে কোথায়... কাল তো প্রফেসর নাজমিন বলেছিলেন তুই ওনার সঙ্গেই থাকবি...”

মা তড়বড়িয়ে বলল, “আমি কেন? তুমি যাও... তোমারও তো মেয়ে...”

বাবা বলল, “আমার ইয়ার এন্ডিঙ-এর তিন সপ্তাহ আগে? চাকরি চলে যাবে...”

মা বলল, “তাহলে কী করা যাবে?”

বাবা বলল, “তুমি যাবে।”

তিসি বলল, “কানপুর কত দূরে?”

মা বলল, “অনেক দূর। কেন?”

তিসি বলল, “কাছে হলে নূপুর দিদার কাছে থাকা যেত। চেনা লোকের বাড়িতে থাকা...”

তারপরে অবাক হয়ে দেখল, বাবা মায়ের দিকে চোখ গোল গোল করে চেয়ে আছে, মা-ও বাবার দিকে চোখ গোল গোল করে চেয়ে আছে, একটু অপেক্ষা করে বলল, “কী হলো?” তখন মা বলল, “দেখো কাণ্ড!” বাবা বলল, “তুমিও একই কথা ভাবছ? দেখেছ, বয়েস হলে কী রকমের বুদ্ধি কমে মানুষের!” তিসি আবার বলল, “কী হলো?” বাবা তখন তিসির দিকে তাকিয়ে বলল, “তোর সেগুনমামা তো বেনারসেই থাকে! আমরা সেগুনদার কথা ভুলে গেলাম কী করে!”

সেগুনমামা?” তিসি অবাক! এটা আবার কে?

তোর মায়ের পিসতুতো দাদা। একসময়ে আমাদের খুব আড্ডা ছিল। তখন তুই খুব ছোটো। তারপরে ওরা বেনারস চলে গেল। আস্তে আস্তে যাতায়াত কমে গেল। ওদের আর কলকাতায় কেউ নেই – তাই আর আসে না বললেই চলে। সেগুনদার বউ মারা যাবার পরে ছেলেকে নিয়ে ব্যস্ত হয়ে পড়ল...”

মা বলল, “সেগুনদার ছেলে সাওন তোর চেয়ে বছর তিনেকের বড়ো। এখন নিশ্চয়ই কলেজ শেষ করছে। সেগুনদাকে ফোন করি।”

সেগুনমামার নম্বর পেতে প্রায় সাত আটটা ফোন করতে হলো মা-কে। তারপরে প্রায় রাত এগারোটার সময় কিছুক্ষণ আলোচনা করে মা-বাবা ঠিক করল, আজকাল কেউ এত তাড়াতাড়ি ঘুমোয় না। সুতরাং ফোন করাই যাক। মোবাইল তো। যদি আধ মিনিট বাজার পরেও কেউ না ধরে, তাহলে আজ কেটে দিয়ে কাল চেষ্টা করা যাবে।

বাজামাত্রই ধরল। আর মাকে সেগুনমামা চিনতেও পারল সঙ্গে সঙ্গেই। তারপরে ফোন লাউডস্পিকারে দিয়ে মা বাবা আর মামা কিছুক্ষণ হা হা হি হি করল। “তোদের তো কোনও খবরই নেই...” “আহা রে, তোদের যেন কত খবর...” মার্কা, তারপরে সেগুনমামা বলল, “এবারে একদিন আয়, ঘুরে যা। কতবার বলেছি...” তার উত্তরে মা বলল, “শোন না, সেগুনদা, সেই কথা বলতেই ফোন করেছি...” বলে সবটাই বলল।

খানিকটা শুনেই সেগুনমামা বলল, “কী বললি? আর একবার প্রথম থেকে বল। কী কবি সম্মেলন?”

মা উত্তর দেওয়ার আগেই বাবা বলল, “কবি সম্মেলন না। শায়েরী ইন্টার্ন্যাশনাল শায়েরী সম্মেলন হবে বেনারসে। প্রতি বছর হয়...”

সেগুনমামা আবার থামিয়ে দিয়ে বলল, “বুঝেছি। বসন্ত্‌ মঞ্জিলে। প্রতি বছরই হয় বটে। কিন্তু সেখানে কে আসবে? তুই?”

আবার বলা হলো। সেগুনমামা আবার খানিকটা শুনে নিয়ে বলল, “দাঁড়া, দাঁড়া... আমার মাথা ঘুলিয়ে যাচ্ছে। তোর মেয়ে, মানে ওই খুদে তিসি, সে এখন শায়ের... আর আমাদের এখানে আসছে শায়েরী সম্মেলনে? কার সঙ্গে আসবে বললি? নাজমিন ম্যাম, মানে নাজমিন হুদা! মাই গড্‌...”

কিছুক্ষণ মামা কিছু বলতে পারল না। তারপরে বলল, “দাঁড়া দাঁড়া। আমি সাওনকে বলি। সাওন, শোন, শোন... তোর মনে আছে, বুবুপিসির কথা? নেই... তবু... শোন, বুবুপিসির মেয়ে তিসি শায়েরী সম্মেলনে আসবে, কার সঙ্গে আসবে জানিস? নাজমিনি হুদার সঙ্গে... আরে আরে, দাঁড়া, দাঁড়া, দিচ্ছি ফোন দিচ্ছি... এই নে, বুবু, সাওনের সঙ্গে কথা বল...”

সাওনের গলা এল। “তিসি, তিসি, মানে ত্বিষান্তিকা? তুমি ত্বিষান্তিকা? তুমি নাজমিন আপার সঙ্গে আসবে? তুমি জানো নাজমিন আপা তোমার সম্বন্ধে কী বলেছেন আমাদের? আমরা সাংঘাতিক উত্তেজিত। তুমি নাকি দারুণ শায়েরী লেখো... আমরা সবাই অবাক হয়ে যাব...”

তিসির মুখ লাল। সেগুন মামা আবার ফোনে ফিরল, মা-বাবা এবারে তিসির যাওয়ার দিনক্ষণ আর থাকা নিয়ে আলোচনা করতে শুরু করে দিল।


*

বেনারসে নাজমিনদির সঙ্গে একাই গেল তিসি। শেষ পর্যন্ত মা-বাবা কারওরই আসা হলো না। বাবার অফিস, আর ডিঙ্গো কুকুরটা অসুস্থ হয়ে পড়ল, অপারেশন হলো, তাই মা রয়ে গেল। সাওন তিসির মামাতো দাদা জেনে নাজমিনদিও দারুণ উত্তেজিত। বললেন, “তাই বলো, তুমি ঘোষ-জীর ভাগ্নী! ওরকম একটা সম্পর্ক তোমার জীবনে আছে বলেই তুমি আজ এরকম কবি হতে পেরেছ। সত্যি তুমি খুব ভাগ্যবতী। নরানাং মাতুলক্রমঃ! জানো তো?”

তিসি বলতে গেছিল, ওটা তো ভাগ্নেদের সম্বন্ধে বলা, কিন্তু নাজমিন এমন চোখ পাকিয়ে বললেন, “ভাগ্নীরা কি বানের জলে ভেসে এসেছে?” যে তিসির কিছু বলা হলো না।

স্টেশনে ওদের নিতে এসেছিল সাওনদা। প্রথমে নাজমিনদির পায়ে হাত দিয়ে কদমবুশী করল, তারপরে তিসিকে বলল, “আমি শুনেছি, শেষ যখন তোমার সঙ্গে দেখা হয়েছে, তখন তোমার বয়েস তিনের কম, আমি প্রায় ছয়। সুতরাং আমরা অপরিচিত নই। কিন্তু আমার কিচ্ছু মনে নেই। তোমার আছে?”

মাথা নাড়ল তিসি। “ছ’বছরের কথা তোমার যদি মনে না থাকে, আমার কী করে তিনবছরের কথা মনে থাকবে?”

বাইরে বেরোতে বেরোতে দু’হাতে নাজমিন আর তিসির স্যুটকেস সামলাতে সামলাতে সাওন হেসে বলল, “আমার একেবারে মনে নেই তা নয়, তবে নিয়মিত যাওয়া না হলে যা হয়, স্মৃতিগুলো সব তালগোল পাকিয়ে গেছে।”

গাড়িতে উঠে সাওন বলল, “আপা, আপনি বলেছিলেন তিসি আপনার সঙ্গে থাকবে, কিন্তু বাবা বলেছে তিসিকে আমাদের সঙ্গেই রাখতে।”

ছদ্ম-গাম্ভীর্যে নাজমিন বললেন, “তা হবে না। আমরা দুজনে একসঙ্গে এসেছি, একসঙ্গে যাব, মাঝখানে আলাদা থাকব, তা কী করে হবে?”

সাওন বলল, “সেটাও বাবা বলেছে বলেছে, আপনি চাইলে আমাদের বাড়িতে থাকতে পারেন।”

নাজমিনদি হেসে বললেন, “ওরে বাবা, তিসির কল্যাণে আমার কদর বেড়ে গেল! কিন্তু নাহ, আমি ঠাট্টা করছিলাম, আমি মামা-ভাগ্নী-কাজিনের মাঝখানে হাড্ডি হতে চাই না।”

সাওন বলল, “বেশ, সে সব কথা বাড়ি গিয়ে হবে। আগে তো ওখানে গিয়ে চা খেতে হবে।”

চা খেয়ে, গল্প করে, নাজমিনদি চলে গেলেন নিজের থাকার জায়গায়। ওখান থেকে বেশি দূর নয়, তবে বসন্ত মনজিল দূর আছে। তিসি জানল সেগুনমামা শায়েরী সম্মেলনের মুখ্য কর্মকর্তাদের মধ্যে একজন, আর সাওন এখনও ভলান্টিয়ার।

তুই লিখিস না?”

সাওন মাথা নাড়ল। বলল, “তোর শায়েরী শোনা। কাল-পরশু সম্মেলনে যা পড়বি সেগুলো নয়। অন্য কিছু।”

পড়ল তিসি। তিন চারটে শুনে সাওন বলল, “তুই কিছু মনে না করলে, আমার এক বন্ধুকে ডাকব? ও শায়েরী পছন্দ করে কাল পরশু যাবে, কিন্তু ওখানে তো সবগুলো পড়বি না...”

একটু পরে সেগুনমামা এসে বললেন, “তুই একটু বিশ্রাম করে নে, তিসি। সারা রাত ট্রেনে এলি...”

তিসি বলল, “সাওনদার এক বন্ধু আসবে। ওকে শায়েরী শোনাব।”

ভুরু কুঁচকে মামা বললেন, “কে বন্ধু?” তিসি মাথা নাড়ল। ও জানে না। গলা তুলে সেগুনমামা বললেন, “সাওন, কাকে ডেকেছিস?”

সাওন ও ঘর থেকে বেরিয়ে বলল, “ওয়াহিদাকে। ও তো শায়েরী ভালোবাসে...”

মামা একটু বিরক্তস্বরে বলল, “এখনই ডাকতে হল? মেয়েটা সবে সারারাত ট্রেন জার্নি করে এসেছে...”

পাছে মামা সাওনদাকে বকাবকি করে, তিসি তাড়াতাড়ি বলল, “না, ঠিক আছে, মামা, রাতে ট্রেনে ভালো ঘুম হয়েছে। আমার ঘুমোতে হবে না। দুপুরে শুয়ে নেব একটু।”

মামা বললেন, “বেশ, তবে বিকেলে তোকে নিয়ে বেরোব একটু। এখন আমি অফিস চললাম।”

ওয়াহিদাকে বেশ লাগল তিসির। প্রথম দিকে মনে হয়েছিল একটু যেন বেশি গম্ভীর, কিন্তু এমন হাসল আর সম্ভ্রান্ত উর্দুতে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে নূরের আসল পরিচয়টা কি জানতে পারি?” যে তিসির নার্ভাস ভাবটা কাটতে দেরী হলো না। দুপুর অবধি ওয়াহিদা শায়েরী শুনে বেরোল। সাওন বলল, “দুপুরে খেয়ে যাও, গরীবের বাড়িতে যা হয়েছে, তা-ই না হয় খেলে একদিন?” শুনে ঝকঝকে সাদা দাঁত বের করে হেসে ওয়াহিদা বলল, “না, আমাকে মালকিনের কাছে যেতে হবে। সারা দিন যেখানে খুশি যেতে পারি কিন্তু দিনের কিছু সময় আমার মালকিনকে দিতেই হয়...” বলে ওয়াহিদা বেরিয়ে গেল।

সন্ধেটা ভালোই কাটল তিসির। মামা বলল, কাল যেহেতু শায়েরী সম্মেলন শুরু, তাই তিসিকে নিয়ে বেনারস ঘোরা হবে না। সেটা হবে সোমবার সকাল থেকে। মামা দু’দিনের শায়েরী সম্মেলনের পরদিন অফিস থেকে ছুটি নিয়েছে। সারা সন্ধে বসন্ত্‌ মঞ্জিলে তিসি নানা দেশের বিখ্যাত কবিদের সঙ্গে সময় কাটাতে পারল। নাজমিনদি অনেকের সঙ্গে পরিচয় করিয়ে দিলেন। সবাইকে বললেন, “নূর সে মিলিয়ে, ইয়ে বাঙ্গাল সে আয়ী হ্যায়, অগলী পীঢ়ী কী সবসে প্রতিভাশালী মহিলা কবিয়োঁ মেঁ সে এক।” তিসির অবস্থা একরকম ওরই সেই প্রিয় মহিলা কবির মতো যিনি নিজের যৌবনের অভিজ্ঞতা সম্বন্ধে লিখেছিলেন, “মধুর লজ্জায়” অবস্থা সাংঘাতিক!

সেগুনমামা অবশ্য বেশি দেরি করলেন না, বললেন, “কাল সকালে আসতে হবে, বেশি রাত অবধি আমরা থাকব না। চলো, তিসি, রাতে ভালো করে ঘুমোতে হবে।”

সারা রাত তিসি বহু উত্তেজক স্বপ্ন দেখল। সবই বসন্ত্‌ মঞ্জিল আর শায়েরী পাঠ করা নিয়ে।


*

পরের দু’দিনও কেমন স্বপ্নের মতোই কাটল তিসির। এমন সুন্দর অভিজ্ঞতা সব মিলিয়ে হতে পারে, কখনওই ভাবেনি। যেমন কবিতা, তেমনই কবিরা। তবে সবারই কবিতা সুন্দর তা নয়। দুর্বোধ্যও আছেন অনেকে। দ্বিতীয় দিন সকালেই তিসির কবিতা পড়ার কথা। দুটো শায়েরী পড়তে হবে, নাজমিনদি বলে দিয়েছিলেন, সে দুটোই পড়ল। ওরও পছন্দের শায়েরী। তবে নাজমিনদি যেমন মনে করেছিল লোকের প্রতিক্রিয়া তেমন হলো না। কবিতা পাঠের সময় দর্শক-শ্রোতারা অনেকে অনেক বার কলিগুলো শুনতে চাইলেও পরে সেরকম কিছু শুনতে পেল না। কেউ খারাপ বলল না, তবে খুব আহা-উহু-ও কেউ করল না। তবে কয়েকজন এসে তিসিকে অভিনন্দন জানিয়ে গেল। তার মধ্যে বাংলাদেশের কবি লিটন চৌধুরীও ছিলেন। আর ছিলেন শ্রীলঙ্কার একজন, তাঁর নামটা এত বড়ো আর অপরিচিত শব্দের যে তিসি শুনেই ভুলে গেল।

দুপুরের কবিতার আসর ক্রমে কঠিন হয়ে উঠল। অভিজ্ঞ কবিদের কবিতায় ছন্দের ঠাস-বুনোট আর কথার প্যাঁচে বিকেলের মধ্যে তিসির মাথা ঝিমঝিম করতে শুরু করল। হলের পেছনের দিকেই বসেছিল তিসি, বেরিয়ে এল বাইরের ছাদে। ছাদের ওপর ছত্রী। বসার জন্য ছোটো গোল ছাদের নিচে বারান্দা। শহর থেকে কিছু দূরে হলেও নদীর পাড়েই বসন্ত্‌ মঞ্জিল। ছাদ থেকে নদী দেখা যায়। তিসি গিয়ে বসল। নিচে, বেশ অনেকটাই নিচে ঘাট। তারপরে নদী।

আকাশ এখন অন্ধকার হয়ে এসেছে। অনতিদূরে বেনারসের ঘাটগুলো প্রদীপের আলোয় উজ্জ্বল। এখান থেকে ভালো করে দেখা যায় না। ওই দূরে নৌকাগুলো? তা-ই হবে, নইলে জলে অত আলো কেন?

কী করছ?” হঠাৎ ওয়াহিদার প্রশ্নে চমকে তাকাল তিসি। সরে গিয়ে বলল, “বোসো। নদী দেখছিলাম।”

ওয়াহিদা বসল। বলল, “বেরিয়ে এলে দেখলাম। ভালো লাগছে না?”

মাথা নাড়ল তিসি। বলল, “তা নয়। আসলে ভীষণ কঠিন লাগছে, মাথা চলছে না।”

ওয়াহিদা ঘাড় হেলাল। বলল, “ঠিক বলেছ। বড্ডো কঠিন। বেগম সাহেবা বলেন, ভালো শায়েরী শুধু নিয়ম মেনে হতে হবে তা নয়, সেই সঙ্গে হতে হবে নির্মল এবং সরল। কঠিন শব্দ, কঠিন বাক্য – কোনওটাই বেগম পছন্দ করেন না।”

তিসি অবাক হয়ে তাকাল। “বেগম সাহেবা?”

ওয়াহিদা অবাক হয়ে বলল, “সাওন তোমাকে বলেনি?” তিসির মাথা নাড়া দেখে হেসে বলল, “আমি বেগম লুৎফারুন্নিসার কাছে কাজ করি আমার প্রধান কাজ বেগম সাহেবার মেয়েদের দেখাশোনা করা। যাকে বলে গভর্নেস।”

তিসি কিছু বলার আগেই বলল, “তোমার হাতে কবিতার খাতা দেখছি রয়েছে... চলো একটা কাজ করি... তুমি কি আর ভেতরে যেতে চাও?” তিসি চেয়ে দেখল, ওয়াহিদা একটা অদ্ভুত দুষ্টু কিন্তু চিন্তাশীল দৃষ্টিতে ওর দিকে তাকিয়ে। বলল, “কী কাজ?”

ওয়াহিদা বলল, “বেগম সাহেবা ভালো শায়েরী শুনতে ভালোবাসেন। কিন্তু এখন আর শরীর ভালো নেই, বিছানাশয্যা। তাই আমার কাজ এখান থেকে ভালো শায়ের ওনার কাছে নিয়ে যাওয়া। আমি আগেই ঠিক করেছিলাম, তোমাকে কাল নিয়ে যাব। কিন্তু এখন যদি তুমি আবার ভেতরে না যেতে চাও...”

কিন্তু কিন্তু করে ওয়াহিদার দিকে তাকাল তিসি। ওয়াহিদা বলল, “বেশি দেরি হবে না। এই যাব, আর আসব। গাড়ি আছে সঙ্গে।”

তিসির দোনোমোনো ভাবটা কাটল না। বলল, “না, তা নয়, কিন্তু সেগুনমামা বা সাওনকে না বলে... ওরা তো আবার একেবারে সামনে বসে আছে।”

এক মুহূর্ত ওদিকে দেখে নিয়ে ওয়াহিদা বলল, “আমি বলে দিচ্ছি...” বলে চট করে পাশের একটা দরজা দিয়ে ঢুকে গেল ভেতরে। বসন্ত্‌ মঞ্জিলের ওদিকটায় আগে যায়নি তিসি। পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে দরজাটা টেনে দেখল – খুলল না। ভেতর থেকে বন্ধ। তাহলে কি ওয়াহিদা ভেতরে ঢুকে বন্ধ করে দিয়েছে? কী আশ্চর্য! কবিতা পাঠের হলের দরজার সামনে এসে দেখল, ওয়াহিদা ভেতরে ঢুকে গেছে। পাশের দরজা দিয়ে ঢুকেছে, তাই সরাসরি প্রথম সারির সামনে দিয়ে নিচু হয়ে গিয়ে সেগুনমামাকে কী একটা বলল, তারপরে মুখ তুলে সাওনের দিকে তাকিয়ে বাঁ হাতের আঙুলগুলো ঢেউ খেলানোর মতো করে নাড়িয়ে বিদায় জানাল। তারপরে বেরিয়ে গেল আবার পাশের দরজা দিয়েই। খানিকক্ষণের মধ্যেই বাইরে বেরিয়ে এল আবার ওই বন্ধ দরজাটা দিয়েই। তিসিকে বলল, “চলো, চট করে। যাব, আর আসব।”

বেনারসের প্রধান শহরের থেকে একটু দূরে বসন্ত্‌ মঞ্জিলের বাইরের রাস্তাটা অন্ধকার মতো। সামনেই মস্তো একটা ঘোড়ার গাড়ি দাঁড়িয়ে। দুটো ঘোড়া দুটোই কুচকুচে কালো। এত বড়ো ঘোড়া তিসি বেশি দেখেনি জীবনে। একবার বাবা রেসের মাঠে নিয়ে গিয়েছিল, সেখানে ঘোড়াগুলো এরকম তাগড়া। অবাক হয়ে চেয়ে ছিল তিসি, ওয়াহিদা হেসে বলল, “এ দুটো নবাব সাহেবের প্রিয় ঘোড়া। দুটোই আরবী... চলো, ওঠো, দেখবে কেমন হাওয়ার বেগে চলে, কোথায় লাগে গাড়ি...”

অবাক হয়ে তিসি বলল, “ঘোড়ার গাড়িতে যাব?”

ওয়াহিদা বলল, “তবে? চলো, ওঠো।”

আরও অবাক হয়ে তিসি দেখল, গাড়ির সামনে বসে কোচওয়ান, আর পেছন থেকে নেমে এল আর একজন উর্দিপরা লোক, সে দরজা খুলে দাঁড়াল ওদের ওঠার জন্য। এদের ইংরিজিতে ফুটম্যান বলত। হিন্দিতে বোধহয় পেয়াদা-ই বলে। পেছন থেকে কোমরে আলতো ঠেলা খেল তিসি। ওয়াহিদা। আর অপেক্ষা না করে উঠে পড়ল। ওয়াহিদা উঠল ওর পেছনে। দুজনে পাশাপাশি বসল। ভেতরটা অন্ধকার। কিন্তু তা সত্ত্বেও তিসি বুঝতে পারল গদিটা বেশ রাজকীয় না কী নবাবী ধরণের। নরম, ভেলভেটের। পেছনে দরজাটা বন্ধ হয়ে গেল। তিসির একমুহূর্ত লাগল বুঝতে যে গাড়ির জানলাগুলো সবই পর্দায় ঢাকা। বাইরে কিছুই দেখা যাচ্ছে না। হাত তুলেছিল পর্দা সরানো যায় কি না দেখতে, কিন্তু ওর কনুইয়ে ওয়াহিদার হাত পড়ল। ঘুরে দেখল ওয়াহিদা মাথা নেড়ে না বলছে।

এটা নবাবের জেনানার গাড়ি। এর পর্দা খুলবে না। বাইরে দেখা বারণ বাড়ির মেয়েদের।”

তিসি অবাক! এ আবার কী! আজকের যুগে এরকম হয় নাকি?

হঠাৎ কী মনে পড়ল আবার ঘুরে জিজ্ঞেস করল, “তাহলে তুমি যে বললে বেগম অসুস্থ, শয্যাশায়ী সেটা কি ঠিক, না কি উনি অসূর্যম্পশ্যা বলে বেরোননি?”

ওয়াহিদা খিলখিল করে হেসে গড়িয়ে পড়ল। বলল, “অসূর্যম্পশ্যা প্রাচীন হিন্দু রীতি। আমরা পর্দা রাখি। সূর্যের সঙ্গে আমাদের কোনও ঝগড়া নেই।” তারপরে থেমে বলল, “না, বেগম সত্যিই অসুস্থ। তবে অসুস্থ না হলেও বেরোতেন না। পর্দা রাখেন তো, তাই।”

হঠাৎ তিসির খেয়াল হলো ঘোড়ার গাড়িটা বেশ জোরেই চলছে। এবং এতক্ষণ বেনারসের গাড়িঘোড়া, ডাইনে বাঁয়ে চলছিল, এখন কেমন যেন তিরবেগে ছুটেছে কোনও বাধাবিঘ্ন ছাড়াই। বাইরের দিকে তাকিয়ে দেখল ভারি পর্দা ভেদ করে রাস্তার আলো দেখা যাচ্ছিল যতটুকু, তার আর কিছুই নেই। পর্দার ওপারে সবই অন্ধকার।

এত জোরে ছোটে ঘোড়া! এ তো মনে হচ্ছে গাড়ির চেয়েও জোরে চলছে। বাইরেটা দেখার উপায় নেই, কিন্তু ভেতরে বসেও যে চলার অনুভূতি, তাতে যেন মনে হচ্ছে হাওয়ার মতো চলছে। আর সেইসঙ্গে... ঘোড়া যদি গাড়ি টানে তাহলে তার চলা এত মসৃন হয়?

বোধহয় ওর মনের কথা কিছুটা আন্দাজ করতে পেরেছিল ওয়াহিদা। বলল, “এত জোরে কখনও ঘোড়ার গাড়িতে চড়েছ?”

এত জোরে! ঘোড়ার গাড়িতেই কবার চড়েছে... সেই একবার লক্ষ্ণৌতে টাঙা, আর একবার বম্বেতে মেরিন ড্রাইভে ফিটন। সে তো রিক্সা চড়ার মতো। তেমন জোরে চলেছিল কই?

কিন্তু ওয়াহিদা বলেছিল, কাছেই। ওরা তো অনেকক্ষণ চলছে বলে মনে হচ্ছে। হাতে ধরা মোবাইলটা জ্বালিয়ে দেখল অন্তত পনেরো মিনিট তো হয়েইছে, আরও বেশিও হতে পারে। ওয়াহিদা বলল, “এই তো এসে গেছি প্রায়। কাছেই।”

কিন্তু প্রায় না। আরও পাঁচ মিনিট কেটে গেল। ওদের গাড়ির গতি শ্লথ হবার কোনও লক্ষণই দেখা গেল না। এবার একটু উদ্বিগ্ন লাগছে তিসির। আর কত দূর? ওয়াহিদা বলেছিল এখানেই, কাছে... না, বলেছিল, দেরি হবে না। যাব আর আসব। কিন্তু কতক্ষণ লাগবে যেতে তা কি বলেছিল? মনে পড়ছে না...

হঠাৎ, বাইরে তখনও মনে হচ্ছে অন্ধকারই, ওদের গতি কমল। আর তারপরেই ওরা ডাইনে ঘুরে আস্তে আস্তে এসে দাঁড়াল।

অন্ধকার এখন আরও গাঢ়। পাশে বসা ওয়াহিদাকে দেখতে পাচ্ছে না তিসি। শুধু ওর হালকা নীল কুর্তাটা পাশে ওর অবয়বটা জানান দিচ্ছে। বলল, “এসে গেছি?”

ওয়াহিদা কি মাথা নাড়ল? দেখতে পেল না তিসি। শুনল ওয়াহিদা বলছে, “হ্যাঁ। এবার চলো বেগম-সাহেবার কাছে...”

বাইরে থেকে দরজা খুলল পেয়াদা। খোলামাত্র তিসি বুঝল কেন এতক্ষণ বাইরে এত অন্ধকার লাগছিল। ঘন কুয়াশা চারিদিকে। সাদা কুয়াশার মেঘ চারিদিকে গোল গোল করে ঘুরছে। এত কুয়াশা কোথা থেকে এল? কিচ্ছু দেখা যাচ্ছে না। মায় যে লোকটা দরজা খুলে দাঁড়িয়েছে, তার সাদা উর্দিটাও প্রায় দেখাই যাচ্ছে না। তার মুখ দেখা তো দূরের কথা।

এত কুয়াশা?”

তিসির প্রশ্নে হালকা হাসল ওয়াহিদা। নেমে এসে হাত বাড়িয়ে দিল তিসির দিকে। তিসি ওর হাতটা না ধরে ওর হাতে নিজের কবিতার খাতাটা দিয়ে এক হাতে নিজের কুর্তা, আর এক হাতে গাড়ির দরজা ধরে নেমে এল।

চারিদিক অন্ধকার। এত কুয়াশা তিসি দেখেনি কোথাও। কিন্তু আলো নেই কেন? কুয়াশা থাকলে কী আলো নিভে যায়? ওয়াহিদা বলল, “নদী থেকে কুয়াশা উঠে এসেছে। এরকম প্রায়ই হয়।”

জানে তিসি। দিল্লি থেকে কানপুর অবধি খুব কুয়াশা হয় শীতে। কিন্তু এরকম কুয়াশা?

অন্ধকারে চোখ সয়েছে একটু। ওরা একটা গাড়ি বারান্দায় দাঁড়িয়ে আছে। গাড়ির দরজা বন্ধ হয়ে গেল। উর্দিপরা পেয়াদা উঠে পড়ল গাড়ির পেছনের পা-দানিতে, কুয়াশায় স্তব্ধ ঘোড়ার খুরের শব্দ মিলিয়ে গেল প্রায় গাড়িটা মিলিয়ে যাওয়ার সঙ্গে সঙ্গেই।

সামনে দরজা খুলল। উর্দিপরা আর একজন কে, হাতে একটা লম্ফ। কেন? কারেন্ট নেই? এবারে চারিপাশের অন্ধকারের অর্থ বুঝল তিসি।

ওয়াহিদা গিয়ে নিচুস্বরে কী বলল, দরজায় দাঁড়ান উর্দিধারী তিসির দিকে ফিরে অল্প কোমর বাঁকিয়ে অভিবাদন জানিয়ে উর্দুতে বলল, “আপনাকে স্বাগতম। বেগমসাহেবা আপনার জন্য অধীর আগ্রহে অপেক্ষমানা।”

দুজনে ভেতরে ঢুকল। মস্তো হল। সামনে বিরাট সিঁড়ি কিছুটা উঠে ডাইনে বাঁয়ে দু ভাগ হয়ে গেছে। হল থেকে ডাইনে বাঁয়ে দু’দিকে করিডোর চলে গেছে। অন্ধকারে মনে হলো সিঁড়ির দু’দিকেও নিচের তলায় দুটো করিডোর বাড়ির পেছন দিকে গেছে। সব দেওয়ালে বড়ো বড়ো তৈলচিত্র, আর বিরাট বিরাট বাঘ, সিংহ, মোষ আর হরিণের মাথা মাউন্ট করে লাগানো আছে।

আর সবটাই উজ্জ্বল হয়ে আছে ঝাড়বাতি, মোমবাতি আর লম্ফের আলোয়। দেওয়ালে দেওয়ালে শুধু ছোটো ছোটো আগুনের শিখা। কোথাও কোনও বিজলি বাতির লক্ষণ নেই।

এখানে ইলেকট্রিসিটি নেই?” তিসির দৃষ্টি অনুসরণ করে ওয়াহিদা মোমবাতি আর লম্ফগুলো দেখে বলল, “আছে, কিন্তু নবাবের চোখের ডাক্তার উজ্জ্বল আলো ব্যবহার করতে বারণ করেছেন বলে আপাতত সেগুলো সরিয়ে রাখা আছে। এসো...”

সিঁড়িতে ওঠার মুখে একটা ছোটো টেবিল থেকে একটা জ্বলন্ত লম্ফ তুলে নিয়ে ওয়াহিদা সিঁড়ি উঠতে আরম্ভ করল। তিসি ওর পেছনে উঠতে উঠতে আড় চোখে দেখল যে লোকটা দরজা খুলেছিল, সে তার লম্ফ নিয়ে সিঁড়ির নিচের দিকে কোথায় চলে গেল, আর অন্য দিক থেকে আর একটি মেয়ে, শাড়ি পরা, ঘোমটা দেওয়া, এসে আর একটা জ্বলন্ত লম্ফ সিঁড়ির নিচের ছোটো টেবিলটায় রেখে অন্ধকারের মধ্যে চলে গেল।

সিঁড়ি উঠে যেখানে শেষ হয়েছে, সেখানে আর একজন পরিচারিকা অপেক্ষা করছিল হাতে বাতি নিয়ে। তাকে চাপাস্বরে, “এঁকে বেগমসাহেবার কাছে নিয়ে যাও...” বলে তিসিকে বলল, “তুমি যাও, আমি পরে আসব।” বলে অন্যদিকে চলে গেল। পরিচারিকাও মৃদুস্বরে, “তসরিফ লাইয়ে...” বলে একটা দরজা দিয়ে ঢুকে গেল তিসির কিছু করার নেই, একদিকে ওয়াহিদার লম্ফের আলোও একটা দরজা দিয়ে কোথায় চলে গেছে, অন্য দিকে পরিচারিকা আর একটা দরজা খুলে ওর জন্য ধরে দাঁড়িয়ে আছে। বাধ্য হয়ে পরিচারিকার পেছনে চলল।

এই দরজাটার ওপারে লম্বা সরু করিডোর। এখানে আলো কম। অনেক দূরে দূরে দেওয়ালে কুলুঙ্গিতে আলো জ্বলছে। প্রধানত প্রদীপ। চক-মেলানো মেঝেতে পরিচারিকার পেছনে হাঁটতে হাঁটতে একবার পেছনে ফিরে দেখল যে দরজাটা দিয়ে ঢুকেছিল, সেটা এর মধ্যেই কেমন অনেক দূরে চলে গেছে। সামনে আর একটা দরজা। সেটা দিয়ে ঢুকে ডানদিকে গিয়ে আর একটা... তারপরে আবার ডানদিকে গিয়ে আর একটা... তাহলে কী আবার বাইরের দিকে ফেরত যাচ্ছে? তিসির গুলিয়ে যাচ্ছে। হাঁটছে তো হাঁটছেই? ঘোড়ার গাড়ি যাত্রাও থামতে চায় না, এখানে হাঁটাও থামতে চাইছে না। কতক্ষণ গেল। চলতে চলতে হাতের মোবাইল ফোনে সময় দেখে চমকে উঠল তিসি। আরও পনেরো মিনিট পেরিয়েছে? এইটুকু আসতে গিয়েই? তা তো হতে পারে না, গাড়িতেই যখন প্রথম সময় দেখেছিল, তখন কতক্ষণ পরে পনেরো মিনিটের একটু বেশি সময় কেটেছিল। এখন?

ভাবার সময় পাওয়া গেল না। পরিচারিকা একটা বন্ধ দরজার সামনে দাঁড়িয়ে ওকে বলল, “আপ অন্দর জাইয়ে...” বলে দরজা খুলে দিল। নিজে ঢুকল না।

তিসি পায়ে পায়ে ভেতরে গেল। বাইরে যতটা অন্ধকার, ভেতরেও ততটাই। বিরাট ঘরের দেওয়াল ধরে দূরে দূরে লম্ফ রয়েছে, কিন্তু সেগুলো সবই ঘষা কাচের আড়ালে। সাদা অর্ধগোলকের মধ্যে আলো জ্বলছে, কিন্তু অপরিষ্কার আলোর বৃত্ত দূরে দূরে।

নরম কার্পেটে পা ডুবে গেল। চটি খোলা উচিত ছিল? কিন্তু কেউ তো কিছু বলেনি। যে পরিচারিকা নিয়ে এল, তারও তো পায়ে জুতো ছিল। এক লহমা ভেবে ঠিক করল চটি খুলবে না। সামনে মস্তো দুটো আরাম কেদারা। তাতে দু’জন এলিয়ে শুয়ে আছে। এত দূর থেকে দেখা যাচ্ছে না। কিন্তু একজন পুরুষ, অন্যজন নারী। এঁরাই নবাব আর বেগম? বুকটা দুরদুর করে উঠল তিসির। কীভাবে ওদের অভিবাদন জানাবে? কুর্নিশ করতে হবে? কী ভাবে কুর্নিশ করে? কেউ বলে দেয়নি। সিনেমায় যা দেখেছে তার বেশি জানে না কিছু। কুর্নিশ করার সময় বলতে হয় কিছু? কী বলতে হয়? বন্দেগী জাঁহাপনা? না কি সেটা কেবল শাসকের জন্য বলবৎ? ভাবতে ভাবতে কাছে পৌঁছে গেল তিসি। আর ভাবার সময় নেই, তাই কোমর থেকে শরীরটা যতটা নামে ততটাই ভাঁজ করে মাটির দিকে তাকিয়ে ডান হাতটা কপালে ঠেকাল।

হাত নেড়ে আরও কাছে ডাকলেন বেগম লুৎফারুন্নিসা। তিসি কাছে এসে দাঁড়াল। বেগমের পরণে বিরাট একটা কুর্তা। কোমর থেকে পা অবধি সরু থেকে ছড়িয়েছে এতই যে তা দিয়ে অনায়াসে তিসির সাত আটটা কুর্তা হয়ে যায় বোধহয়। এবং বেগমের বসার আরাম কেদারা থেকে ঝুলে পড়েছে মাটি থেকে একটু ওপর পর্যন্ত – হাতপাখার আকারে। অন্তত দুটো পরত দেখতে পাচ্ছে তিসি। বাইরের দিকে একটা এম্ব্রয়ডারি করা জালির পরত, আর তার নিচে একটা ভারী সিল্কের পরত। দূরে লম্ফের অল্প আলোয় মনে হচ্ছে কচি কলাপাতার চেয়েও হালকা রং। পায়ের কাছে লাল চটি জোড়া বোধহয় মখমলের। তাতে ওগুলো কী? অত বড়ো বড়ো মুক্তো? ঊর্ধ্বাঙ্গও গলা অবধি ডাকা। তার ওপরে পাতলা ওড়না, তাতেও এম্ব্রয়ডারি। ওড়নাটা বেশ কয়েক প্যাঁচ বেগমের কপালে মাথা থেকে ভুরু অবধি জড়ানো। আর মুক্তোর মালা দিয়ে বাঁধা। ওড়নাটা দু হাত ঢেকে রেখেছে, কিন্তু সেখানেও মনে হচ্ছে কবজি থেকে প্রত্যেক আঙুলের আংটি পর্যন্ত মুক্তোর ছড়া। আজ অন্তত বেগমের সম্পূর্ণ সাজই মুক্তো দিয়ে। পাশে, কিন্তু ত্যারচা করে একটা কেদারায় শুয়ে যে পুরুষটি গড়গড়া খাচ্ছেন, তিসি ধরে নিল তিনিই নবাব। তাঁকে দেখা যাচ্ছে না। তিনি তিসির দিকে মুখ করে নেই। শুধু মাথার ওপরের সাদা টুপির ওপর দিকটা তিসির দিকে ফেরানো। তামাকের মিষ্টি গন্ধে ঘরটা ভরপুর।

বসো।” বেগমসাহেবার গলাটা ভাঙা। ফ্যাসফ্যাসে। “আমি আর নবাব তোমারই অপেক্ষায়। পরশু থেকে তোমার কথা শুনেছি অনেক। তুমি সত্যিই বঙ্গাল থেকে এসেছ?”

জি...” হুজুর না জনাব? এক লহমা ভেবে বলল, “জনাব।” তারপরে কিছু বলা উচিত ছিল? এসব আদব কায়দার কিছুই শিখিয়ে দেয়নি ওয়াহিদা। ও-ও জিজ্ঞেস করেনি। উচিত ছিল।

বেগম বললেন, “বোসো।” কোথায় বসবে? গালচেতেই? তাকিয়ে দেখল পায়ের কাছে একটা সুন্দর নিচু বসার জায়গা, তাতে আসন পাতা, দুটো তাকিয়া দেওয়া। কখন কে রেখে গেল? ও তাকিয়ে ছিল নবাব আর বেগমের দিকে, তখন কি কেউ দিয়ে গেল? বসল ওয়াহিদা। বেশ নিচু বসার আসন। চোখের সামনে বেগমের কুর্তার এম্ব্রয়ডারি। এত কাছে যে হাত বাড়ালেই ছুঁতে পারবে। কবিতার খাতা আর ফোনটা নামিয়ে রাখল পাশে। কখন পড়বে কবিতা?

সরবত? অনেকটা রাস্তা এসেছ...”

তিসি বুঝতে পারল কেউ পেছন থেকে একটা নিচু টেবিল রেখে তার ওপরে একটা গ্লাস রাখল। ওর ডানদিকে। হাত বাড়িয়ে ভারি কাঁসার গ্লাসটা নিয়ে সরবতে চুমুক দিল।

ভারি চমৎকার সরবত। ঠাণ্ডা, বরফ দেওয়া। লান্‌চের পর থেকে কিছু না-খাওয়া। শায়েরী সম্মেলনে টি-ব্রেক হয়েছিল, কিন্তু চা কফির সঙ্গে জিরে দেওয়া মিষ্টি বিস্কুট ছিল কেবল। ওর ইচ্ছে করেনি খেতে। এখন খিদে পেয়েছে। এরকম সরবতে পেটও ভরবে।

বেগম ওর সম্বন্ধে আরও দুচারটে কথা জিজ্ঞেস করলেন। তিসির বাড়ি, মা-বাবা, বেনারসে আত্মীয়-স্বজন, পড়াশোনা, ভবিষ্যতে কী করতে চায়... পাশের আরাম কেদারায় নবাব চুপ করে। শুধু মাঝে মাঝে গড়গড়া টানছেন।

এবারে বেগম বললেন, “পড়ো তোমার কবিতা। প্রথমে ওই দুটো পড়ো, যে দুটো তুমি সম্মেলনে পড়লে।”

ওর পেছন থেকে আলোর রোশনি বাড়ল। আড়চোখে দেখল ওর দু’দিকে দুটো আলো রেখেছে কে। ওমনি ঘষা কাচের বাতিই, কিন্তু বেশ উজ্জ্বল হয়ে উঠল। হাতে খাতা তুলে নিল। সম্মেলনে পড়া কবিতাদুটোর পাতা ট্যাগ করা ছিল। প্রথমটা পড়ল তিসি। ওটা বেশি বড়ো না। আট লাইনের গজল। পড়ে থামল। বেগম বা নবাব বাধা দেননি। তিসি একটু ক্ষুণ্ণ হলো। সম্মেলনে এই গজলের আটটা প্রথম লাইন এতবার পড়তে হয়েছিল দর্শক-শ্রোতার অনুরোধে, যে তিসি ভয় পেয়েছিল, ওর পড়ায় ভুল হচ্ছে কি না। নবাব আর বেগমের কোনও হেলদোল দেখা যাচ্ছে না। পরেরটা পড়বে, না অনুমতির জন্য অপেক্ষা করবে?

আলবোলার নল ধরা হাতটা যেন একটু নড়ল? বেগম বললেন, “ফিরসে পড়ো...”

আবার পুরো গজলটা পড়ল তিসি। এবার থামতে হলো। বার বার। যেমন হয়েছিল সম্মেলনে। বার বার বেগম বাহ, বাহ, বলে থামালেন, যার ফলে বার বার লাইনগুলো পড়তে হলো। শেষ পর্যন্ত যখন শেষ হলো, তখন নবাবের গলা পেল প্রথম। “বহুত খুব।”

একটু সময় গেল নৈঃশব্দে। তারপরে বেগম বললেন, “আগে পড়ো।” পরের কবিতাটাও পছন্দ হলো ওঁদের। তারপরে তিসি বলল, “এবারে কী পেশ করতে হুকুম হয়?”

বেগম একটু ভেবে বললেন, “ওই খাতায় ভর্তি শায়েরী?”

তিসি বলল, “জী, জনাব।”

বেগম বললেন, “প্রথম থেকে পড়ো...”

এবং তার পরে একের পরে এক শায়েরী পড়ে চলল তিসি। আর নবাব আর বেগম দুজনেই উৎসাহভরে শুনলেন। আবার শুনলেন, বার বার শুনলেন। আর একবার সরবত এল। এল তিসির জন্য অল্প আহার। নবাবের আর বেগমের জন্য এল সুরা। তিসি সাবধানে নিশ্চিন্তির দীর্ঘশ্বাস ছাড়ল যখন দুজনের কেউই তিসিকে সুরাপানে আহ্বান জানালেন না। নবাবী আহ্বান হয়ত হুকুমের সমতুল্য। না বলার উপায় থাকত না।

কবিতা পড়তে পড়তে রাত কত হলো? তিসির দুশ্চিন্তা হতে শুরু করেছে। ওয়াহিদার দেখা নেই। কী বলে এসেছে ও সেগুনমামাকে? পাশেই রাখা রয়েছে মোবাইলটা। নবাব-বেগমের চোখের আড়ালে উলটে রাখা মোবাইল ফোনটা সোজা করে স্ক্রিনটা ছুঁতেই সময়টা ফুটে উঠল। চমকে উঠল তিসি। এগারোটা ষোল! এত রাত হয়েছে! এখন ফিরবে কী করে?

ভাবার সময় পেল না। নবাবের প্রায়-আর্তনাদের মত চিৎকারে চমকে উঠল আবার!

ওটা কী? ওটা কী জ্বালিয়েছ? বন্ধ করো, বন্ধ করো...” দু’হাতে চোখ ঢেকে চেঁচাচ্ছেন নবাব।

জাহাঁপনা...” থতমত খেয়ে তিসি আবার ফোনটাকে উলটে রেখে দিল। “আমার মোবাইল ফোন, আমি সময় দেখছিলাম...”

নবাব তখনও চেঁচিয়ে চলেছেন, “বন্ধ করো, বন্ধ করো, আমার চোখ জ্বলে গেল...”

বেগমের কোনও ভ্রূক্ষেপ নেই। উনি নবাবের দিকে তাকাচ্ছেনই না। মুখে একটা তির্যক হাসি নিয়ে চেয়ে আছেন তিসির দিকে। ঘরে ছুটে এল একরাশ কাজের লোক পুরুষ, নারী; বল্লম হাতে প্রহরী। কিন্তু কেউ এগোল না, কারণ বেগম হাত তুলে সবাইকে থাওমতে বলছেন। নবাব কিন্তু ডানহাতে চোখ ঢেকে অন্য দিকে তাকিয়ে তিসির দিকে বাঁ হাতের তর্জনী উঁচিয়ে তখনও চিৎকার করছেন, “নিয়ে নাও, ওর হাত থেকে নিয়ে নাও...” আস্তে আস্তে চিৎকার থামল, নবাব চোখের সামনের হাতের আঙুল ফাঁক করে বললেন, “ওই আলো নিয়ে নিয়েছ ওর কাছ থেকে?”

বেগম নবাবের কথায় কান না দিয়ে একটু কড়া স্বরেই বললেন, “তুমি কবিতা পড়ো...”

তিসি বেগমকে বলল, “গুস্তাখি মাফ, হুকুম সাহিবা, অনেক রাত হয়েছে, আমার কি এখন ফেরা উচিত না? আমার মামাকে ওয়াহিদা কী বলেছে, তা-ও আমি জানি না...”

চিল-চিৎকার করে উঠলেন এবারে বেগম। বললেন, “তোমার সাহস কী করে হয় আমার মুখের ওপর কথা বলতে? তুমি কবিতা পড়বে। কবিতা পড়বে। আমরা বললেই কবিতা পড়বে। সারা জীবন কবিতা পড়বে। আর তারপর, তোমার কবিতা শেষ হয়ে গেলে, আমরা নতুন কবি নিয়ে আসব। নাও, পড়ো...”

বুকটা দুরুদুরু করে উঠল তিসির। এরা কী সত্যি পাগল? সত্যি ওকে এখানে রেখে কবিতা পড়াবে? হঠাৎ কী মনে হলো, বলল, “আমি আর কবিতা পড়ব না, বেগম। আপনার বিশ্বাস না হয়, আপনি দেখতে পারেন এই আমি খাতা বন্ধ করলাম। আপনি গাড়ি বলুন। আমাকে আমার মামার বাড়ি পৌঁছে দিয়ে আসবে আপনার কর্মচারী ওয়াহিদা যে নিয়ে এসেছিল আমাকে।”

দুলে দুলে হাসলেন বেগম। ভারি গলায় বললেন, “তোমার সবক শেখার প্রয়োজন আছে দেখছি। কে আছিস, একে নিয়ে যা চার ঘা চাবুক মারবি আজ। খেতে দিবি না। শুধু জল দিবি। কাল সকালে দেখব এর কত দম থাকে।”

তিসির দু’দিকের দুটো আলো কারা তুলে নিয়ে গেল। এক লহমায় ঘরটা অন্ধকার হয়ে গেল অনেকটাই। দূরে দূরে দেওয়ালের কাছে লম্ফগুলো যেন আলোই দিচ্ছে না। তিসির পেছনে নড়াচড়া। প্রহরীরা ওকে ধরতে আসছে? কী মনে হলো এক ঝটকায় মোবাইল ফোনটা নিয়ে স্ক্রিনে আঙুল টেনে আড়ালের আইকনগুলো বের করে টর্চের আইকনটা ছুঁয়েই মোবাইলটা তুলে ধরল নবাবের মুখের দিকে।

এবার তিসির চিৎকার করার পালা। “আমাকে এক্ষুনি যেতে দিন, নইলে এই আলো আপনার মুখ থেকে নড়বে না...”

তিসির চিৎকার স্তিমিত হয়ে গেল নিজে নিজেই। নবাবের মুখে উজ্জ্বল আলো পড়েছে, কিন্তু নবাবের মুখ কই? মুখের সামনে চাপা দেওয়া হাত কই? তিসি হতভম্বের মতো বেগমের দিকে আলো ঘোরালো, কিন্তু বেগমের মুখই বা কই? উদভ্রান্তের মতো চারিদিকে আলো ঘোরাতে থাকল তিসি। আস্তে আস্তে ওর দিকে এগিয়ে আসছে ওরা। ওই, যে ও তো পরিচারিকা, ও তো পেয়াদা হাতে বল্লম। কিন্তু ওরা তো নেই। ওদের মুখ নেই, হাত নেই... শুধু হাড়! ওরা কেউ রক্তমাংসের মানুষ নয়। সবাই কঙ্কাল...

জ্ঞান হারিয়ে পড়ে যাবার আগে তিসির মনে হলো একটা শিরশিরে ঠাণ্ডা হাওয়া ওর সর্বাঙ্গ দিয়ে বয়ে চলেছে, যেন শীতের রাতের নদীতিরের হাওয়া...


*

জ্ঞান ফিরল। শীতে থরথর করে কাঁপছে তিসি। চারপাশে খোলা জমি, জোলো হাওয়ায় আর শিশিরে সর্বাঙ্গ ভিজে। কাঁপতে কাঁপতে উঠে দাঁড়াল তিসি। ভোরের অস্পষ্ট আলোয় চারিদিকে তাকিয়ে কোথাও বিরাট অট্টালিকা জাতীয় বাড়ি নেই। পায়ের কাছে মোবাইল ফোনটা আর কবিতার খাতা ভিজে। মোবাইলটা হাতে নিয়ে দেখল ব্যাটারি শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে কখন। কাঁপা হাতে ওগুলো তুলে নিয়ে এবড়ো খেবড়ো মাঠ দিয়ে হেঁটে সামনের রাস্তা অবধি পৌঁছল। কাঁধে ব্যাগটা রয়েছে এখনও। রাস্তার ওপারে, একটু দূরেই একটা চায়ের দোকানে উনুনে আগুন দিয়েছে দোকানি। চট করে ব্যাগ খুলে তিসি দেখে নিল – টাকা পয়সা সবই রয়েছে। চায়ের দোকানের কাছে পৌঁছতে পৌঁছতে দেখল বয়স্ক দোকানি হাঁ করে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে। কাছে গিয়ে হিন্দিতে জানতে চাইল, “চা হবে?”

দোকানি বলল, “আপনি কোথা থেকে আসছেন? আপনার সর্বাঙ্গ ভেজা কেন? কাদা মেখেছেন কেন?”

চমকে নিজের দিকে তাকিয়ে তিসি দেখল সত্যিই উপুড় হয়ে মাটিতে পড়ে থাকার দরুন সেই মাটির কাদা সারা জামায় কাপড়ে হাতে, হয়ত মুখেও। কিন্তু সেদিকে নজর দেবার উপায় নেই তিসির। কাঁপতে কাঁপতে বলল, “আপনি দয়া করে আমাকে আগে চা দিন, আমি ঠাণ্ডায় মরে যাচ্ছি। সারারাত ওই মাঠে ছিলাম...”

দোকানদার গলা তুলে ফতিমা বলে কাউকে ডাকল। চুড়িদার কুর্তা পরা এক মহিলা, সারা মাথায় মুখে ওড়না জড়ানো সত্ত্বেও মাথার সাদা চুল দৃশ্যমান, বেরিয়ে এল পেছন থেকে। দোকানদার তিসিকে বলল, “যা বিটি, ভেতরে যা, ভালো করে হাত মুখ ধুয়ে বোস। চা দিচ্ছি। আর, ফতিমা, ওকে একটা জামা দে। এটা তো কাদায় একেবারে গেছে...”

কৃতজ্ঞচিত্তে ফতিমার সঙ্গে দোকানের পেছনে দোকানির বাড়ি গেল তিসি। হাত মুখ ধুতে ধুতে দোকানির বউ ফতিমার জীবনের কাহিনিই জানা হয়ে গেল বোধহয়। সবে ফতিমার জামাকাপড় পরে বসেছে ওদেরই খাটে, দোকানি বাইরে থেকে গলা খাঁকারি দিয়ে জানতে চাইল, “বিটিয়াকে জিজ্ঞেস করো রাতে খেয়েছে কি না। এখানে কী করছিল? এত ভোরে কোথা থেকে এসেছে?”

তিসি হাতের ফোনটা দেখিয়ে বলল, “আপনাদের এখানে ফোনটা একটু চার্জ দিতে পারব? তাহলে আমার মামাকে খবর দিতে পারি...”

দোকানি একটা থালায় চা নিয়ে এসে ওর পাশে বিছানায় রাখল। ওর হাত থেকে ফোনটা নিয়ে চার্জারে লাগিয়ে বলল, “কোথা থেকে এসেছিস, মা?”

তিসি বলল, “কলকাতা। কিন্তু এখানে আমি মামার বাড়িতে এসেছি। পাঠানিটোলা।”

দোকানি আর দোকানির বউ মুখ তাকাতাকি করল। তারপরে মাথা নেড়ে বলল, “সে কোথায়?”

রাজঘাটের কাছে? সরাই মোহনা?”

আবার মুখ তাকাতাকি করল দুজনে। ফতিমা চাওয়ালাকে বলল, “আপনি মৌলবিকে ডাকুন...”

দোকানি উত্তর না দিয়ে আবার জানতে চাইল, “এখানে কোথায় এসেছিলি? কেন?”

গতকাল রাতের কথা মনে পড়ে ভয়ে কেঁপে উঠল তিসি। বলল, “এই রাস্তার ওপরেই বোধহয় – একটা রাজপ্রাসাদে। নবাব... আর তাঁর বেগম... কবিতা শুনতে চেয়েছিলেন...”

ফতিমা এতক্ষণ খাটে বসে তিসির হাত ধরে ছিল। এখন খাট থেকে নেমে প্রায় ঠেলেই দোকানিকে ঘর থেকে বের করে দিল। “আপনি যান, যান। মৌলবিকে ডেকে আনুন। বলছি, এ আমাদের দ্বারা হবে না...”

দোকানি বেরিয়ে যাবার পরে ফতিমা ফিরে এসে তিসির হাতে চায়ের গেলাস তুলে দিল। বৈয়াম খুলে দিল বিস্কুট। তিসি বলল, “কাল আমি...”

ফতিমা থামিয়ে দিয়ে বলল, “চা খাও। মৌলবিকে আসতে দাও।”

চা শেষ হতে না হতে মৌলবি এসে পড়লেন। ওঁকে অবশ্য বসতে হলো দোকানের বাইরেই। ততক্ষণে গরম চা আর বিস্কুট খেয়ে তিসি ধাতস্থ হয়েছে একটু। মৌলবি বললেন, “ইধর আইয়ে, সামনে বৈঠিয়ে। কাহাঁ সে আয়েঁ হ্যায় আপ?”

তিসি আবার সব বলল। একটু ভুরু কুঁচকে মৌলবি বললেন, “ঔর য়িহাঁ কৈসে আনা হুয়া?”

তিসি বলল, “আপনি বসন্ত্‌ মঞ্জিল চেনেন? ওখানে কবিতার একটা সম্মেলন হচ্ছে...”

ভয়ঙ্কর চমকে মৌলবি বললেন, “বেনারসে? শায়েরী সম্মেলন? তওবা! তওবা!”

পাছে আবার ওকে থামিয়ে দেয় কেউ, তাই তড়িঘড়ি তিসি বলল, “আমি ওখানেই কবিতা পড়তে এসেছিলাম। ওখানে ওয়াহিদা বলে একজন আমাকে বলেন এখানে নবাব আর বেগম আমার শায়েরী শুনতে চান। ওঁরা গাড়ি পাঠিয়েছিলেন। ঘোড়ার গাড়ি। সে গাড়িতে রাতে আমি আসি। এখানেই কোথাও নিশ্চয়ই – কাল রাতে এত কুয়াশা ছিল, যে আমি কিছু দেখতে পাচ্ছিলাম না। আমি ওঁদের সারা সন্ধে অনেকগুলো কবিতা শোনাই। তারপরে যখন রাত প্রায় সোয়া এগারোটা, তখন আমি বাড়ি যেতে চাইলে ওঁরা বলেন যেতে পারবে না। আমি তারপরে... তারপরে...”

আমতা আমতা করে থেমে গেল তিসি।

ঝুঁকে পড়ে মৌলবী বললেন, “তারপরে কী? ইয়াদ করকে বোলিয়ে... ইত্মেনান সে বোলিয়ে, কোঈ জলদি নেহি হ্যায়।”

কাল রাতের কথা মনে করে তিসির কপালে বিনবিনিয়ে ঘাম বেরোল। বলল, “লেকিন ওরা আদমি ছিল না... ওরা ভূত ছিল... সবাই কঙ্কাল!”

ততক্ষণে আরও চার পাঁচজন এসে দাঁড়িয়েছে। তারাও সবাই ঘাড় নেড়ে মৌলবির সঙ্গে সুর মিলিয়ে বলল, “তওবা, তওবা...”

মৌলবি বললেন, “জানসে বচ গয়ী বাচ্চি...” সমবেত লোকেদের দিকে ফিরে বললেন, “কাল কুয়াশা ছিল না।” তারপরে তিসির দিকে ফিরে বললেন, “আপনার বাড়িতে খবর দিয়েছেন?”

তিসি বলল, “আমার ফোনটা ব্যাটারি শেষ হয়ে বন্ধ হয়ে গেছে। ভেতরে চার্জে দেওয়া আছে...”

মৌলবি বললেন, “আরে বাচ্চীকে কেউ একটা ফোন তো দাও... না জানি ওর বাড়ির লোকে কী না কী দুশ্চিন্তা করছে...”

তিসি গিয়ে নিজের ফোনটাই নিয়ে এল। মৌলবি বললেন, “বলুন এই জায়গাটার নাম নওয়াওয়া...”

নওয়াওয়া? সে কোথায়?”

মৌলবি একটু হেসে বললেন, “সে ধরুন ইলাহাবাদ।”

চমকে উঠে তিসি বলল, “এলাহাবাদ! সে তো অনেক দূর!”

হা হা করে হেসে মৌলবি বললেন, “বেনারস থেকে অনেক দূর। এখান থেকে কাছেই।”


*

গাড়িতে ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে একশো তিরিশ কিলোমিটার ফিরে তিসি দেখে মা-বাবা এসে গেছে! আগের দিন মাঝরাতে ওদের ফোন করেছিল সেগুনমামা। ওয়াহিদার সঙ্গে তিসি বেরিয়ে গেছে সন্ধেরাতে, কিছুক্ষণ বাদেই ফিরে আসবে এ কথা বলে গেছিল ওয়াহিদা, কিন্তু তারপরে আর দুজনের কাউকেই পাওয়া যাচ্ছে না, দুজনকেই ফোন করলে শোনা যাচ্ছে কভারেজ এরিয়ার বাইরে। সেই শুনে মা-বাবা সেদিন ভোরের ফ্লাইটেই বেনারস এসেছে। যখন তিসি সেগুনমামাকে ফোন করেছে, তখনও ওরা দমদমে। সুতরাং তিসির খোঁজ পাওয়া গিয়েছে জানার পরেই ওরা উড়েছে, আর বেনারসে ল্যান্ড করে সাওনের সঙ্গে বাড়িতে পৌঁছনর আধঘণ্টার মধ্যেই তিসিকে নিয়ে সেগুনমামা ফেরত এসে গেছে। কোনওরকমে কিছু খেয়ে আবার তিসি ঘুমিয়ে পড়েছিল। একেবার সন্ধেরাতে উঠেছে। রাতে খেতে বসে জিজ্ঞেস করল, “অনেক জিজ্ঞেস করেও মৌলবি আমাকে কিছুই বলেনি। তোমাকে কিছু বলেছে?”

খাবার টেবিলে বসে তিসির মা-বাবা, নাজমিন-আপা এবং সেগুনমামা আর সাওন।

তিসির প্রশ্ন শুনে সেগুনমামা তিসির মা-বাবার দিকে তাকাল। মা বলল, “জানতে তো ওকে হবেই। বলে দে।”

সেগুনমামা বলল, “মৌলবি বললেন এরকম ঘটনা ওখানে অনেক ঘটেছে। এই যে বেগমসাহেবা, ইনি একসময় সত্যিই ওইখানে একটা প্রাসাদে থাকতেন। এবং সত্যিই কবিতাপ্রেমী ছিলেন। সে কয়েকশো বছরের কথা। এখন ওই নওয়াওয়াতে ওদের আর কিছুই বাকি নেই। কিন্তু বহুদিন অবধি বাড়িটা ছিল। ভগ্নদশা। আর কিছুদিন বাদে বাদেই ওখানে একজন না একজন কবির মৃতদেহ পাওয়া যেত। লোকে বলে ওই বেগমসাহেবার আত্মাই ওদের ফুসলে নিয়ে যেত, তারপরে মেরে ফেলত। মৃত্যুর পরেও বেগমের পছন্দমত কবিতা শোনাতে পারে যাতে। তিসি-ই নাকি প্রথম কবি, যে ওখানে গিয়েছে, কিন্তু মারা যায়নি।”

থেমে জল খেল সেগুনমামা। তারপরে বলল, “তবে ইন্টারেস্টিং ব্যাপার হলো এই, যে এরকম ঘটনা শেষ যখন ঘটেছিল তখন এই মৌলবির বয়স ছিল দশ বছরের কম। আজ মৌলবীর বয়স হলো পঁচাত্তরের বেশি। অর্থাৎ বছর সত্তর আগে। কিছুদিন আগেও ওখানে ওদের বাড়িটার ধ্বংসাবশেষ ছিল। এখন আর নেই। ওখানে বিরাট রিভারসাইড রিসর্ট হবে বলে একটা হোটেল কম্পানি কিনে সব ধ্বংসস্তূপ পরিষ্কার করে ফেলেছে। ওখানকার বেশিরভাগ লোকের আর মনেই নেই এসব ভূতুড়ে ঘটনার কথা। মৌলবি, চায়ের দোকানদার, এমন কয়েকজন বৃদ্ধ-বৃদ্ধাই জানেন।”

মামা থামার পরে সবাই একটু চুপ করে বসে রইল। মা নিজের চেয়ার থেকে ঝুঁকে পড়ে তিসির মাথাটা নিজের বুকের কাছে টেনে নিয়ে বলল, “ঠাকুর বাঁচিয়েছেন।” মা’র আলিঙ্গন থেকে নিজেকে ছাড়িয়ে নিয়ে তিসি বলল, “বাড়িটা নেই, কিন্তু বেগম আর নবাব রয়েছেন। ওদের গোটা হাউসহোল্ড রয়েছে। এর পরে ওখানে রিসর্ট হলে কী হবে?”

সেগুনমামা বলল, “আগে হলে এই প্রশ্নের উত্তরে আমি হা-হা করে হাসতাম। আজ শুধু এইটুকু বলি, রিসর্ট হলে আর যে-ই ওখানে যাক, তুই যাস না।”

সবাই কিছুক্ষণ চুপচাপ। তারপরে সাওন বলল, “আমি যেটা বুঝতে পারছি না, তা হলো ওদের সঙ্গে ওয়াহিদার কী সম্পর্ক। আর গেলই বা কোথায়? আজ সারাদিন ফোন করেও পাইনি। শুধু বলেছে, এই টেলিফোনের কোনও অস্তিত্ব নেই।”

তিসির মাথায় যে ভাবনাটা এসেছিল, সেটা আর সবার সামনে বলল না। রাতে শুতে যাবার আগে সাওনদার ঘরের দরজায় গিয়ে দাঁড়িয়ে বলল, “সাওনদা, তুই পেত্নীর সঙ্গে প্রেম করতি...”

তারপরে নিজের ঘরে গিয়ে শুয়ে পড়ল।

2 comments:

m sayef said...

premika petni darun bapar

Subhamay Chattopadhyay said...

এটা সমন্বয়ের জন্য নিলাম।