১
বদ্রী কুয়ো থেকে জল তুলে বালতিটার ভেতরে তাকিয়ে একটা দীর্ঘশ্বাস ফেলল। যত গরম বাড়ছে, ততো
জল শুকোচ্ছে। আর কিছুদিন পরে কাদা, আর
তার পরে বালি উঠবে শুধু। একবার মুখ তুলে তাকাল
দূরের আকাশের গায়ে পাহাড়ের দিকে।
স্পষ্ট দেখা যায় না, কিন্তু ওই পাহাড়ের ওপরে
রাজার প্রাসাদে কাজ করছে ওর বাবা।
অপেক্ষা না করে কুয়োর বালতির কাদাজলটা নিজের বালতিতে ঢেলে নিয়ে আবার বালতিটা
কাদাজল ভরে টেনে তুলল।
দু বালতি কাদাগোলা জল নিয়ে
সাবধানে আঙিনায় ঢুকতেই ছুটে এল বোন।
বালতিতে উঁকি দিয়ে মুখটা শুকিয়ে গেল ওরও।
একবার রাজপ্রাসাদের দিকে তাকিয়ে বলল,
“বাবা যে কবে ফিরবে...”
“বাবা
কি কুয়োর জল নিয়ে আসবে?” বলতে গিয়ে থমকে গেল বদ্রী। মনে পড়ল বালতিতে কাদা দেখে ও নিজেও মুখ তুলে
বাবার দিকেই তাকিয়েছিল। বলল, “দাঁড়া, আগে সাবধানে ঘরে নিয়ে রাখি। ভাল করে থিতিয়ে যাক...”
ঘরের কোনে বালতি দুটো
রাখতে না রাখতেই মা ঢুকল ভেতরবাড়ি থেকে।
“দাদা
এল, গিরিজা?” ছেলেকে দেখে এগিয়ে এসে বালতি
দেখে বলল, “সারাদিন রেখে দিলে যদি আধ বালতি জল বেরোয়... মরুভূমির দেশ, কী আর আশা করা যায়!”
কাদাজল থিতোতে দিয়ে বদ্রী
জলখাবার খেয়ে দৌড়ল কামারশালায়।
বাবা গাঁয়ের কামার। ওস্তাদ হিসেবে নাম আছে
বলেই রাজা ডেকে নিয়ে গেছে।কামান
তৈরির জন্য। বাবা নেই বলে এখন
কামারশালা চালায় বদ্রী। কাজ সামান্যই, এর
ওর ঘটিবাটির ফুটো সারানো, আর কালেভদ্রে কারও ঘোড়ার
পায়ে নাল পরানো।
আজও কাজ নেই। কামারশালার গরম থেকে বাঁচতে আগুনের আঁচ
কমিয়ে বদ্রী গিয়ে দরজার কাছেবসল।
মাটি তেতে উঠেছে। দূরের গাছপালা তিরতির করে
কাঁপতে লেগেছে গরম হাওয়ায়।
পাহাড়ের মাথায় রাজার প্রাসাদ আর দেখাই যায় না।
বসে বসে ঝিম ধরছিল। হঠাৎ একটা ঘোড়ার পায়ের শব্দে চটকা ভেঙে গেল। তারপরেই ঘোড়ার নাক ঝাড়ার শব্দ, আর
মানুষ আর ঘোড়ার ঘামের গন্ধ ভেসে এল বাতাসে।ধড়ফড়িয়ে
উঠে দাঁড়াল বদ্রী। এই শব্দ আর গন্ধ, দুইই
ওর চেনা। বাবা আসছে।
দেখতে দেখতে ঘোড়াটা টিলার
উঁচু জায়গাটা পার করে উঠল।
সারা গা বেয়ে ঘাম ঝরছে। বদ্রী একটু অবাক হল, বাবা
কখনও ঘোড়াটাকে কষ্ট দেয় না।
কিন্তু আজ যেন না থেমেই আমের থেকে এসেছে?
ছুটে গিয়ে লাগাম ধরল বদ্রী। বাবা নেমে লাগামটা আবার নিয়ে নিল। বলল,
“দলাই মলাই আমি করব। ছুট্টে বাড়ি যা, মা
আর বোনকে নিয়ে সরপঞ্চের বাড়ি আয়।
কথা আছে। রাস্তায় সবার বাড়িতে একই
কথা বলে আসবি। ভীষণ জরুরী।”
ঘোড়া ছেড়ে দৌড় লাগাতে যাবে, বাবা
বলল, “এই মশকটা নিয়ে যা,
পরিষ্কার জল আছে।”
মশক কাঁধে ছুটল বদ্রী।“সরপঞ্চের বাড়ি যাও, জলদি, সব্বাই...” হাঁক পাড়তে পাড়তে।
২
মা আর বোনকে নিয়ে যতক্ষণে বদ্রী এসে সরপঞ্চের
বাড়ির সামনে পৌঁছলো, তখন গ্রামের প্রায় সব লোকই
এসে পৌঁছে গেছে। এমনিতেই বদ্রীদের বাড়ি
গ্রামের বাইরের দিকে, তার ওপর মা সবে রান্না
চড়িয়েছিল।
সবাই এসে হাজির হবার পর
বাবা সরপঞ্চের বাড়ির ভেতরে গিয়ে সরপঞ্চের ছেলেরসঙ্গে ধরাধরি করে বৃদ্ধ সরপঞ্চকে
এনে দাওয়ার খাটিয়াতে বসাল।
বদ্রী দেখছিল, বাবা
ছটফট করছে। সরপঞ্চ অনুমতি দেবার আগেই
বলল, “মুখিয়া, মাফি মাঙ্গে, আমাদের
এক্ষুণি গ্রাম ছেড়ে চলে যেতে হবে।
এক্ষুণি।”
সবাই থতমত খেয়ে চুপ করেছে, এই
ফাঁকে বাবা বলেই চলেছে, “মুখিয়া, গত
সাত মাস ধরে আমি রাজবাড়িতে একটা কামান বানানোর কাজে সাহায্য করেছি। এত বড় কামান কেউ কোনও দিন বানায়নি। কামান বানানো শেষ হয়েছে গত সপ্তাহে।কাল সেটা চালানো হবে। কাল বিকেলে ওটার মুখ ঘুরিয়ে তাক করেছে রাজার
সৈন্যরা।”
বাবা দম নেবার জন্য থামল, সরপঞ্চ
বলল, “তো?”
বাবা বলল, “কামানের মুখ আমাদের গাঁয়ের দিকেই তাক করা,
মুখিয়া।”
এবার লোকে হাসতে শুরু করল। গোয়ালা দীনদয়াল আমেরের দিকে হাত তুলে বলল, “আমের এত দূরে, যে দেখাই যাচ্ছে না। সেখান থেকে কামান ছুটলে আমাদের গাঁয়ে এসে
পড়বে? তোমার মাথা খারাপ হয়েছে,
রামপ্রকাশ? তুমি
জান না, চাকসু থেকে আমের কত দূর?”
বাবা জানে।“বারো ক্রোশ।”
“বারো
ক্রোশ দূর থেকে কামানের গোলা আসবে এখানে?”
দীনদয়ালের কথায় রামপ্রকাশ
আরও উৎকণ্ঠিত হয়ে বলল, “মুখিয়া, ও
যে সে কামান নয়। রাজার নতুন কামান পনেরো
হাতেরও বেশি লম্বা। তার চাকাই সাড়ে তিন হাত
উঁচু। ডাইনে বাঁয়ে ঘোরাতে চারটে
হাতি লাগে। কাল রাজা জয় সিংহর হুকুমে
দশ মন বারুদ এনে রাখা হয়েছে।
একবার দাগতেই নাকি দু’মনের বেশি বারুদ লাগবে। একএকটা গোলার প্রায় এক মন ওজন।”
এবার একটা সোরগোল শুরু হয়ে
গেল। কেউই প্রায় বাবার কথা
বিশ্বাস করতে চায় না। বলে, অত
বড় কামান হয় নাকি! অত বড় গাছই হয় না! তো
কামান।
রামপ্রকাশ রেগে বলল, “বেশ তবে তোমরা থাক। আমি চললাম আমার বউ বাচ্চা
নিয়ে।”
এই হট্টগোলের মধ্যে সরপঞ্চ
হাত তুলল। সবাই চুপ করলে সরপঞ্চ
রামপ্রকাশকে বলল, “কামান কখন চলবে?”
রামপ্রকাশ বলল, “কাল সকালে।”
সরপঞ্চ বলল, “গোলা এ গাঁয়েই মারা হবে?”
রামপ্রকাশ বলল, “তা নয়।তবে এ দিকেই কামানের মুখ। সে কামান চললে কী হবে কেউ জানে না। কত দূর গোলা যাবে কেউ জানে না। কেউ বলছে পাঁচ ক্রোশ, কেউ
বলছে আট। কাল এক সর্দার বলল, ‘দশ বারো ক্রোশও যেতে পারে।’ সেই শুনে আমি আর দাঁড়াইনি, ভোর
না হতেই জয়গড় ছেড়ে বেরিয়ে এসেছি।”
দাঁতের ফাঁকে ‘ধ্যাৎ’
শব্দ করে গোয়ালা দীনদয়াল বলল, “রাজাকে একবার বলবে তো, যেএখানে
আমাদের গ্রাম আছে!”
আরও বিরক্তিভরে রামপ্রকাশ
বলল, “আরে আমি কি রাজাকে কোনও দিন দেখেইছি? রাজা
কি গাঁয়ের মুখিয়া, যে দরজার সামনে এসে ডাকলেই
হবে?”
ভুরু তুলে দীনদয়াল বলল, “তুমি রাজার কামান বানালে, রাজা তোমার কথা শুনবে না?”
এবার দীনদয়ালকে ছেড়ে আবার
সরপঞ্চের দিকে ফিরল রামপ্রকাশ, “এই বোকাটাকে বোঝাই কী করে
মুখিয়া, ওখানে কত কামার – আমি তো তাতে ছোটো
মিস্তিরি। আসল কারিগর তো দিল্লী
থেকে এসেছিল। বাদশা পাঠিয়েছে।”
সরপঞ্চ বলল, “দীনু, রামু, বাচ্চাবেলা থেকে তোমাদের
ঝগড়া থামল না। দীনু, এবার
চুপ কর।”
রামপ্রকাশের দিকে তাকিয়ে বলল, “গোলা কোথায় পড়বে যদি না
জানি, তাহলে যাব কোথায়?”
রামপ্রকাশ বলল, “বারো ক্রোশের বেশি তো গোলা যাবে না বলেই সবাই বলছে, তাহলে
আমরা আরও দূরে চলে যাই...”
দুর্বল পায়ে উঠে দাঁড়িয়ে
সরপঞ্চ বলল, “আমরা আর এক প্রহরের মধ্যে
বেরোবো। সবাই যাবে। গাড়ি জুতে নাও। যত পেয় জল আছে সব নেবে। দামি জিনিস সামান্য নেবে।” উত্তরে চিল কা টিলা
পাহাড়ের মাথায় রোদের তেজে আবছা জয়গড় কেল্লার দিকে এক আঙুল তুলে বলল, “কামান ওখানে,” তারপর অন্য হাত দিয়ে
দক্ষিণ দিকের দিকচক্রবাল দেখিয়ে বলল,
“আমরা যাব ওখানে। সারা দিন সারা রাত চলে যতদূর সম্ভব। এর বেশি আর কী করব? এর
পর রণছোড়জীর কৃপা।”
৩
সারা দিন রোদ্দুরের মধ্যে চলে কতটুকু এল ওরা? “বেশিদূর না,” বলল বাবা। গাঁয়ের অনেকেই তাড়াতাড়ি পথ চলতে পারে না। বুড়োবুড়িরা, মেয়েরা, বাচ্চারা
আস্তে হাঁটে। রাস্তায় দুটো গাড়ি বসে
গেল - সেগুলো খালি করে ভৈঁসদের খুলে, মালপত্র
অন্যগাড়িতে তুলতে সময় গেছে।
সন্ধেবেলা সরপঞ্চ বলল, এখন
বিশ্রাম। তার পর আবার চাঁদ উঠলে
চলা।“রামু,”
ডেকে জিজ্ঞেস করল বাবাকে, “কাল সকালের আগে তো কামান
চলবে না?”
বাবা ভুরু কুঁচকে দূর
দিগন্তে আবছা চিল কা টিলার দিকে তাকিয়ে বলল,
“দিল্লীর বাদশা মহম্মদ শাহ
নাকি আসবেন। তাঁকে অভ্যর্থনা করতে
কামান চলবে। আজ সকাল অবধি তিনি তো
আসেননি।”
সরপঞ্চ বলল, “আর দেড় প্রহরে চাঁদ উঠবে।
চাঁদের আলোয় চলব। রাতে হয়ত দিনের চেয়ে চলা
সহজ হবে... জয় রণছোড়জী।”
রাত বাড়লে সবাই আবার চলা
শুরু করল। রোদের তেজ না থাকলেও চলা
সহজ হল না। চাঁদের আলো সামান্য। পথ বলে কিছু নেই। বাচ্চারা কাঁদছে। বাচ্চাদের মায়েরা বিরক্ত হচ্ছে। গ্রামের পুরুষরাও বিরক্ত। এমন অজানার দিকে কতক্ষণ হাঁটবে মুখিয়া? কামানের
গোলা যদি বারো ক্রোশ না হয়ে পনেরো ক্রোশ আসে?
এখন কত দূর ওরা? সাতাশ-আঠাশ
ক্রোশ? গোলা যদি আঠাশ ক্রোশ পেরিয়ে এসে ওদের মাথায়ই পড়ে? তার
চেয়ে এখানে থাকাই ভাল না?
সরপঞ্চের এক কথা, যে
চাও চল, যে চাও থাক,
যে চাও গাঁয়ে ফিরে যাও।
সবাই চলল।
শেষে, পুবের
আকাশ যখন ফর্সা হচ্ছে, তখন সরপঞ্চ বলল, এবার
থাম। এবারে রণছোড়জী ভরসা।
মাটিতে পড়েই ঘুমিয়ে পড়ল
মানুষগুলো। বদ্রীও।
৪
বদ্রীর ঘুম যখন ভাঙল, তখন
সূর্য উঠছে। পুব দিগন্তে লাল থালার
ওপরটুকু উঁকি দিচ্ছে। ধড়ফড়িয়ে উঠে দেখল আশেপাশে
কেউই প্রায় ওঠেনি। বাবা শুধু উবু হয়ে বসে। ঠায় দৃষ্টি উত্তরের পাহাড়ের।দিকে।
একটু দূরে সরপঞ্চও তেমনই বসে।
বাবা বলল, “সূর্য উঠেছে।
এতক্ষণে রাজপুরোহিত কালীর আরতি শেষ করেছে।
আর দেরী নেই।”
কেমন যেন বাবার কথা শুনেই
এক এক করে সকলে উঠে বসল। চোখ কচলে দীনদয়াল বলল, “কামান দেগেছে?”
আর তখনই, ভোরের
কুয়াশা ফুঁড়ে দূর পাহাড়ের গায়ে একটা আলোর ঝলকানি, আর
তার পরেই বাজ পড়ার মত গর্জন, বাতাস চিরে কিছু একটা ছুটে
আসার চিল চিৎকার, আর তার পর...
প্রচণ্ড শব্দে মাটি কেঁপে
উঠল এত জোরে, যে বদ্রী সামলাতে না পেরে
পড়েই গেল। খানিকক্ষণ সময় লাগল
সম্বিৎ ফিরে পেতে। তারপর দেখল কেবল ও একা নয়, অনেকেই
মাটিতে কুমড়ো গড়াচ্ছে। সরপঞ্চকে ধরে তুলছে
দীনদয়াল। বাবা ধরেছে আর একজন
বৃদ্ধকে। লজ্জা পেয়ে বদ্রী
তাড়াতাড়ি উঠে গেল অন্যদের সাহায্য করতে।
একবার মুখ তুলে তাকিয়ে দেখল অনেকটা দূরে,
ওদের পেরিয়ে আসা পথের
কোথাও, একটা বিশাল ধুলোর মেঘ আস্তে আস্তে পাকিয়ে উঠছে আকাশের দিকে।
সব জানা সত্ত্বেও ঘটনার
ভয়াবহতায় সকলেই বিহ্বল। বাচ্চারা প্রায় সকলেই, বড়রাও
কেউ কেউ হাউহাউ করে কাঁদছে।
দু চারজন বমি করছে। কেউ দু হাতে মাথা চেপে
ধরে দুলতে দুলতে ইষ্টনাম জপছে।
যারা অতটা থতমত খায়নি, তারা আশেপাশের বড় পাথরে
চড়েবোঝার চেষ্টা করছে কোথায় পড়েছে কামানের গোলা।
এরই মধ্যে সরপঞ্চের গলা
শোনা গেল।“আরও
চল। এতদূরও নিরাপদ নয়। এর পরের গোলাটা যদি।আরও এগিয়ে পড়ে? চল, চল, ওঠো, জলদি!”
এবার আর কেউ দ্বিরুক্তি
করল না।
কিন্তু আর গোলা এল না। বার বার ফিরে দেখা সত্ত্বেও পাহাড়ের গায়ে
আলোর ঝলক বা কামানের নির্ঘোষ শুনতে পাওয়া গেল না।
দুপুরের আগেই রামপ্রকাশই
সরপঞ্চকে বলল, “মুখিয়া, আর
মনে হচ্ছে বিপদ নেই। আবার কামান দাগলে এতক্ষণে
হয়েযেত। আমি বলি কী, বাকি
দিনটা এখানেই বসে যাই। রাত নামলে আবার ফেরা যাবে।”
সরপঞ্চ বলল, “তাই ভাল। কাল থেকে তো ঠিক করে কেউ
খায়ওনি।”
গাড়ি দাঁড়াল কয়েকটা পাথরের
ছায়ায়, কাঠকুটো জড়ো করে আগুন জ্বেলে রান্নাও হল সামান্য কিছু। তার পরে,
ক্লান্তিতে সকলেই ছায়া
খুঁজে ঘুমিয়ে পড়ল।
৫
এক এক করে সকলে উঠল রোদ পড়ে সন্ধে নামছে তখন। সরপঞ্চ গ্রামের বয়স্কদের নিয়ে পরামর্শ করে
ঠিক করল এখনই ফেরা। গাই ভৈঁসগুলো অত ক্লান্ত
নয়। যারা পারছে না, তারা
গাড়িতে যাবে।
শুরু হল ফেরার পথচলা। খানিক চলে, খানিক
থামে, খানিক বিশ্রাম নেয়।
রাত নামল, কেউ থামার কথা বলল না। তবে সরপঞ্চ নিজেই কিছুক্ষণ পর পর বিশ্রাম
ঘোষণা করল। সারা রাত চলল, থামল। ভোর যখন হল তখন গ্রাম আর বেশি দূরে না।
গ্রামের যত কাছে আসে ততই
যেন মানুষের হইচই শুনতে পায়? পা চালিয়ে চলে। ওই তো,
গাঁয়ের চারপাশের টিলাগুলো
দেখা যাচ্ছে। আর দেরি নেই।
কিন্তু গাঁয়ে মানুষ কোথা
থেকে এল? ওরা তো সকলেই একসঙ্গে!
হাত তুলে সবাইকে দাঁড় করাল
সরপঞ্চ। আর তখনই, এক
এক করে আটজন ঘোড়সওয়ার এসে দাঁড়াল টিলার ওপরে,
আকাশের গায়ে।
খানিককাল দুপক্ষই নিশ্চল, তার
পর সওয়াররা ঘোড়া ছুটিয়ে এগিয়ে এল।
রাজার সৈন্য।
সৈন্যদের দলপতি এগিয়ে এসে
বলল, “তোমরা কে? এখানে কী করছ?”
সরপঞ্চের ছেলে বলল, “আমরা গ্রামবাসী, ওই পাথরের ওপারের গ্রাম।”
অবাক হয়ে দলপতি বলল, “গ্রামশুদ্ধ লোক?কোথা থেকে আসছ?”
সরপঞ্চ বলল, “আমরা কামানের গোলার ভয়ে গ্রাম ছেড়ে গেছিলাম। আবার ফিরে এসেছি। তোমরা এখানে কেন?”
দলপতি জবাব দিল না। একজন সৈনিককে কী বলা মাত্র সে ঘোড়া ঘুরিয়ে
দৌড় দিল গ্রামের দিকে। সরপঞ্চ বলল, “আমাদের রাস্তা আটকাচ্ছ কেন?”
দলপতি কী ভেবে বলল, “গ্রামে রাজা এসেছেন।”
রাজা!
কিন্তু কেউ কিছু বলার আগেই
শান্ত্রী ফিরে এসে বলল, “রাজামশাই সবাইকে ডাকছেন।”
রাজা ডাকছে! সরপঞ্চ
পা চালিয়ে পাথরগুলো পার করে গ্রামের চৌহদ্দিতে পা দিয়েই থমকে দাঁড়াল। আস্তে আস্তে তার চারপাশে ভীড় করে এল বাকি
গ্রামবাসীরা।
এক ভয়ানক দৃশ্য অপেক্ষা
করে ছিল তাদের জন্য। গ্রামের মাঝখানটা, যেখানে
সরপঞ্চের বাড়ি ছিল, সেটা আর নেই।এক বিরাট গহ্বর সেখানে। সরপঞ্চের বাড়ি, আসেপাশের
চার পাঁচটা বাড়ি সেই গহ্বরের ভিতরে।
তাদের কোনও চিহ্নই আর অবশিষ্ট নেই।
তাদের চারিপাশে অজস্র বাড়ি সম্পূর্ণ ধূলিসাৎ,
তাছাড়া, প্রায়
সব বাড়িই অল্পবিস্তর ক্ষতিগ্রস্ত।
কিন্তু ধ্বংস নিয়ে হাহাকার
করার সময় পাওয়া গেল না। দূরের বাড়ি-ঘরের
আড়াল থেকে বেরিয়ে এল একটা অশ্বারোহী মূর্তি,
তার পেছনে আরও কয়েকজন।
বাইরের লোক, রাজার
মত পোষাক পরা লোক – এ গাঁয়ে কোনওদিন দেখেইনি কেউ। হাঁ করে তাকিয়ে রইল সবাই।
প্রথম জন ঘোড়া থেকে নেমে
জিজ্ঞেস করল, “তোমরাই গ্রামবাসী? মুখিয়া
কে?”
সরপঞ্চ এগিয়ে এসে হাত জোড়
করে বলল, “প্রণাম, মহারাজ,”
তার পর মাটিতে হাঁটু গেড়ে বসে মাটিতে মাথা ঠেকাল।
সবাই অবাক। রাজা!
রাজা জয় সিংহ! তাদের
এই গ্রামে! বদ্রীর হঠাৎ খেয়াল হল,
পাশে বাবা অনেকক্ষণ ধরেই
প্রণাম করছে। আসেপাশে সকলেই এক এক করে
হাঁটু মুড়ে বসছে। বদ্রীও তাড়াতাড়ি মাথা
নুইয়ে প্রণাম করল।
রাজা ঘোড়া থেকে নামল। বদ্রী আড়চোখে দেখল পাশে বাবা মাথা তুলছে। বদ্রীও মাথা তুলল। সরপঞ্চও মাথা তুলেছে। রাজা এগিয়ে এসে নিজে হাতে সরপঞ্চকে তুলল। বলল,
“কী নাম, এই
গ্রামের?”
সরপঞ্চ হাতজোড় করে বলল, “চাকসু, হুজুর।”
রাজা জিজ্ঞেস করল, “কত পুরনো গ্রাম?”
এবার সরপঞ্চ একটু থতমত খেল। বলল,
“সরকার, সে
কি কেউ জানে, আমাদের বাপ দাদা পরদাদা, সবাই
এখানেই থাকত।”
রাজা ঘাড় ঘুরিয়ে জিজ্ঞেস
করল, “রাজার খাজনা দেয় এরা?”
এবার পেছন থেকে একজন এগিয়ে
এসে বলল, “জী হুজুর।
বেশি দেয় না, আছেই বা কি!”
রাজা হাত তুলে থামিয়ে দিয়ে
বলল, “বেশি না কম আমি জানতে চাইনি। খাজনা দেওয়া গ্রামের ওপর কামান দাগা হল –
সেটা কার দায়িত্ব? মন্ত্রী,
সেনাপতি –
কাল সকালের মধ্যে সে লোককে আমি দেখতে চাই।”
আবার সরপঞ্চের দিকে তাকিয়ে
বলল, “ক্ষতি কী হয়েছে তো দেখছিই। জান গেছে ক’
জনের?”
সরপঞ্চ বলল, “কারও জান যায়নি, মহারাজ, আমরা
গাঁয়ে ছিলাম না। আমরা চলেগিয়েছিলাম। এই ফিরছি।”
রাজা আরও অবাক হয়ে বলল, “কেউ গাঁয়ে ছিলে না?”
“না।”
রাজা বলল, “এই গ্রাম আবার তৈরি হবে – রাজকোষের টাকায়। আর সেই সঙ্গে, এই
গ্রামের আজকের সব বাসিন্দা, আর তাদের বংশধরদের, কখনও
খাজনা দিতে হবে না। মুন্সী, লিখে
নাও।”
রাজা ফিরল। গ্রামের সবাই মুখ তাকাতাকি করছে, বদ্রী
দেখল বাবা এগিয়ে গিয়ে সৈনিকদের সঙ্গে কথা বলছে।
রাজা এবার এগিয়ে গেল আর এক
জনের দিকে। এরও রাজার মত পোশাক, মাথায়
পাগড়ি। এ-ও ঘোড়ায় করে রাজার সঙ্গেই এসেছিল, কিন্তু
ঘোড়া থেকে নামেনি।রাজা সেই লোকটার সামনে
দাঁড়িয়ে অল্প মাথা নুইয়ে বলল, “জাঁহাপনা, এই
সব গ্রামের লোক। এরা গ্রাম থেকে চলে
গিয়েছিল বলে বেঁচে গিয়েছে...”
বদ্রীর পিছনে ফিসফিস করে কে
বলল, “বাদশা মহম্মদ শা!”
চমকে উঠল বদ্রী। একই সঙ্গে দিল্লীর বাদশা আর আমেরের রাজা
তাদের এই গ্রামে!
কিন্তু রাজার ভুরু আবার
কুঁচকে গেছে। সরপঞ্চের দিকে ফিরে বলল, “কিন্তু গাঁ শুদ্ধু লোক গিয়েছিল কোথায়?”
সরপঞ্চের উত্তর শুনে রাজা
আরও অবাক। বাদশাও বলল, “তওবা! এই সরপঞ্চের তো দারুণ বুদ্ধি! বহোৎ
খুব! রাজা, এদের এই গর্তে একটা বড়
পুকুর বানিয়ে দাও। দেখেই বোঝা যাচ্ছে এদের
খুব জলকষ্ট।”
রাজা বলল, “খুব ভালো কথা, জাঁহাপনা। কারিগরদের খবর দাও। এ গ্রামে যেন আর জলকষ্ট না থাকে... কিন্তু,” আবার ফিরল রাজা সরপঞ্চের
দিকে।“তুমি
জানলে কী করে, আজ সকালে কামান চলবে?”
সরপঞ্চ এবার মুখ তুলে ডাকল, “রামু?”
রামপ্রকাশ এগিয়ে এল পায়ে
পায়ে।
বাবার দিকে দেখিয়ে সরপঞ্চ
বলল, “ওই যে, ওই ছোকরা কামান তৈরির দলে
ছিল। ও-ই
কাল সকালে এসে আমাদের খবর দেয়।
তারপরেই…”
“ইধর
আও,” বলে বাবাকে কাছে ডেকে রাজা বাবার পিঠ চাপড়ে দিল। গর্বে বদ্রীর বুক ফুলে উঠল।আড় চোখে তাকিয়ে দেখল সবাই তেমনি গর্বের হাসি
হাসছে। পেছন থেকে কে পিঠে হাত
রাখল। দীনু চাচা। বলল,
“তোর বাবা সবার প্রাণ
বাঁচিয়েছে।”
রাজা বলল, “তুমি কামান তৈরির কাজে ছিলে? কিন্তু কামান দাগার সময়ে
থাকনি। ভালই করেছ। কামানের পাশে মস্ত চৌবাচ্চা ছিল, সলতেয়
আগুন দিয়ে কামান চালানেওয়ালারা যাতে তার মধ্যে ডুব দিয়ে বাঁচতে পারে। তারা আটজন মারা গিয়েছে। একটা হাতি মরে গেছে বিষ্ফোরণের ধাক্কায়। জয়পুর গ্রামে পর্যন্ত ছোটো ছোটো বাড়ি ভেঙে
গিয়েছে! আমেরে কত গর্ভবতী মায়েদের বাচ্চা হয়ে গেছে!”
রাজা থেমে মুখ মুছল। বলল,
“জয়বাণ আর চলবে না। কিন্তু আমার আরও কামান চাই। এত বড় না। ছোটো।
মেবারের সঙ্গে যুদ্ধ হবে। তুমি আমের চল।”
বাবা হাত জোড় করে বলল, “যথা আজ্ঞা, মহারাজ।”
অলঙ্করণ - সুজিত রায়



2 comments:
Besh galpo..alonkaron o sundor.!
Besh galpo..alonkaron o sundor.!
Post a Comment