Sunday, January 22, 2017

পুলুর দিদিমা


অনিরুদ্ধ দেব

প্রচ্ছদ ও অলংকরণ – সঞ্জয় ব্যানার্জী


অনাহিতাকে -

যে কিনা ছোটোবেলায় আমাকে বলেছিল,
বাবা, আমি বড়ো হয়ে রাক্ষস বিয়ে করব।”
পুলু সেই কবে ছোটোবেলায় মামাবাড়ি গিয়েছে, ওর মনেই নেই ও শুধু দাদার মুখে শুনেই জানে যে মামাবাড়িতে নাকি বড়োই মজাওর খুব সখ, মামাবাড়ি যাবে রেলগাড়ি চড়েদাদা গেছে, মাসতুতো দিদি কুট্টি গেছে, শুধু ওর বেলাই যত ঝঞ্ঝাট এসে খাড়া হয়পুলুর রাগ হয়মামাবাড়ি অনেক দূর – কিন্তু তাই বলে কখনোই যাওয়া যাবে না? সেবার পুজোর ছুটিতে টিকিট ক্যানসেল করতে হল – বন্যা হয়ে নাকি রেলব্রিজ ভেঙে গিয়েছেট্রেন চলছে নাআর তারপরের বার! সে তো আরও ভয়ানক! দাদার পরীক্ষার পর যাবার কথা, পুলুরই হতে হল চিকেন পক্সফলে দাদা গেল মাসি, মেসো আর কুট্টিদির সঙ্গেযাবার আগে আবার জানলা দিয়ে কাগজে ‘টা-----আ টা-----আ’ লিখে ছুঁড়ে দিয়ে গেলকে বলবে দাদা ওর চেয়ে আট বছরের বড়ো!
তাই, এবার যখন বাবা বলল, “শীতে ভাবছি আবার যাওয়া যাক হিমনগর!” তখন পুলু আনন্দে না নেচে, সো---জা ঠাকুরঘরে গিয়ে ঠাকুরকে বলতে শুরু করল, “এবার যেন কিছু গোলমাল না হয়…”
হল নাকারওর অসুখ করলনা, বাবার অফিসে জরুরি কাজ পড়ল না, বৃষ্টি হল না, রেললাইন জলে ডুবে গেল না… নির্দিষ্ট দিনে হিমসিটি এক্সপ্রেস ট্রেনে চড়ে ওরা সক্কলে রওয়ানা দিল সন্ধেবেলাপশ্চিমের আকাশ তখন লাল, শহরের বাইরে ধানক্ষেতে কুয়াশাড়োরা বই আর ম্যাগাজিন খুলে পড়তে বসলদাদাও আজকাল বড়োড়ো ভাব করে, পুলু আর কুট্টিকে পাত্তাই দেয় না, দেখাদেখি কুট্টিদিও পুলুকে পাত্তা দেয় না। ও আবার বুল্টুদা বলতে অজ্ঞান! ওরা দুজনেই বই খুলে বসলদাদা আবার আজকাল ইংরিজি বই পড়ে গম্ভীর মুখেগত কয়েকদিন ও যে বইগুলো পড়ছে, তার লেখকের নাম Neil Gaiman
পুলু প্রথম যখন দেখেছিল, জিজ্ঞেস করেছিল, “গোয়ালা?”
দাদা খুব রেগে বলেছিল, “ইংরিজি পড়তে পারিস না? গেইম্যান
বললেই হল ইংরিজি পড়তে পারে না? G-A-I কেন ‘গেই’ হবে? তাহলে G-E-I কী?
পুলু আর কী করে, প্ল্যাটফর্মে বইয়ের দোকান থেকে যে নতুন বইটা কিনেছে, সেটাই খুলল
কিন্তু ট্রেনে বসে বই পড়তে মন চায় না জানলা দিয়ে বাইরে তাকিয়ে রইল দূর দিগন্ত অবধি শুধু খোলা মাঠ, আর গাছপালা সূর্যের আলো আরও নিভে এসেছে এখন মেঘের ফাঁকে কেবল একটা বেগনে আভা রয়েছে সেই দিকে চেয়ে চেয়ে পুলুর চোখ জুড়িয়ে আসছিল, হঠাৎ কুট্টিদির কথায় চটকাটা কেটে গেল “ভূতের বই কিনেছিস?”
পুলুর কোলের বইটা ভূত-পেতনি-দত্যি-দানো সম্বন্ধেই বটে কুট্টিদি আবার জিগেস করল, “ভয় পাস না?”
কুট্টিদি যেন পুলুর চেয়ে বছর তিনেক না, তিরিশ বছরের বড়ো! পুলু বলল, “এখন আর করে না আগে করত ছোটোবেলায়
কুট্টিদি হেসে কুটিপাটি হল “ছোটোবেলায়? এখন কত বড়ো রে, তুই? কোন ক্লাস হল? টু?”
কুট্টিদি জানে তবুও পেছনে লাগে পুলু বলল, “এবারে ফাইভ হবে
কুট্টিদি এদিক ওদিক চেয়ে বলল, “মামাবাড়িতে ভূত আছে, জানিস?”
শুনেছে পুলু বলল, “তুমি দেখেছ?”
কুট্টিদি বলল, “এক দিন রান্নাঘরের দাওয়ায় বসেছিল সে এক বীভৎস দৃশ্য
কী দেখেছিলে?”
কুট্টিদি গলা নামিয়ে বলল, “সে এক সাংঘাতিক ব্যাপার, রাত্তির বেলায়, আমি বাথরুম করব বলে ঘর থেকে বেরিয়েছি, আর রান্নাঘরের দাওয়ায় উনুন জ্বেলে একটা বউ রান্না করছেযেই আমি বেরিয়েছি, মুখ তুলে তাকিয়েছে চোখ দুটো লাল, দাঁতের ফাঁক থেকে রক্ত গড়িয়ে পড়ছে...”
পুলুর একটু একটু বুক ধুকপুক করছিল, বলল, “কী রাঁধছিল?”
কুট্টিদি বলল, “কী রাঁধছিল কে জানে, কিন্তু কী বিচ্ছিরি গন্ধরে বাবা! আমি যেই এদিকের বারান্দার আলো জ্বেলেছি, ওমনি সব ফর্সা কিচ্ছুটি নেই গিয়ে দেখি রান্নাঘরের দাওয়া একেবারে সাফ সুতরো, কেউ নেই
তুমি গেলে? ভয় করল না?”
কুট্টিদি একটু ‘ধুস,’ টাইপের ঘাড় নেড়ে বলল, “নাঃ, ভূতকে ভয় পেলেই সর্বনাশ সাহস করে এগিয়ে যাবি, বুঝলি?”
দূর থেকে চা-ওয়ালার ডাক শুনে বড়োরা বই থেকে মুখ তুলল মাসি বলল, “তোরা কী ফুসফুস করছিস রে?”
পুলু বলল, “মামাবাড়িতে কুট্টিদি ভূত দেখেছিল, সেই গল্প শুনছি
মাসি চোখ পাকিয়ে বলল, “কুট্টি, তুই ওকে বাচ্চা পেয়ে ভয় দেখাচ্ছিস? কবে তুই মামাবাড়িতে ভূত দেখলি শুনি?”
পুলু বলল, “দেখেছে ছোটোমাসি, রান্নাঘরের দাওয়ায়...”
এবারে মেসোমশাই হা হা করে হেসে মাসিকে বলল, “আরে ভুলে গেলে মন্দিরা, সেই যে, রান্নাঘরের দাওয়ায় একটা কাগজ উড়ছিল, সেই দেখে মেয়ে ভয় পেয়ে, হাত-পা ছুঁড়ে, কেঁদেকেটে একশা!”

মা বলল, “আরে বুল্টুও একবার ওই রান্নাঘরের দাওয়ায় রাত্তিরে কী দেখে ভয় পেয়েছিল কী ছিল যেন? বেড়াল, তাই না? কি রে বুল্টু? মনে আছে?”
দাদা কোন উত্তর দিল না, শুধু কটমট করে একবার পুলুর দিকে তাকাল এমন সময় চা-ওয়ালা এসে গেল, বড়োরাও ভূতের গল্প ভুলে গেল কুট্টিদি ফিসফিস করে বলল, “দাঁড়াও, তোমার হচ্ছে” পুলু দাদা-দিদিদের এই ব্যাপারটা বোঝে না ওর কী দোষ, কিন্তু দাদাও এমনভাবে তাকাল, যেন ও-ই সবাইকে বেড়াল দেখে ভয় পাবার গল্প বলে বেড়িয়েছে মন খারাপ হয়ে গেল তাই কুট্টিদির দিকে না তাকিয়ে জানলা দিয়ে বাইরে তাকাল বাইরে ঘন অন্ধকার ভূতের বই ছাড়া গতি নেই
মামাবাড়িতে এত মজা, ---ত্তো--ও মজা, পুলু জানত, কিন্তু জানতই না দিদিমা আর বড়োমামীমা, দুজনেই দারুণ রান্না করে আর দিদিমা আচার স্পেশালিস্ট, মামীমা মোরব্বা! পুলু যাওয়া মাত্র বাড়িতে হইচই পড়ে গেল পুলু ভাবেইনি ও এত দিন পরে মামাবাড়ি আসছে বলে সবাই ওকে এমন রানির মত মাথায় করে নাচবে! দিদিমা ভাঁড়ার ঘরের দরজা খুলে দিয়ে বলল, “যখন ইচ্ছে যে কোন আচার নিয়ে খাবি মোরব্বাও খেতে পারিসএখন তো এ বাড়িতে কেউ এসব নিয়ে মাথাও ঘামায় না আগে তোর মা আর মাসি যখন ছোটো ছিল, পাহারা দিয়ে রাখতে হত দেখি, পোনাটা বড়ো হোক
পোনা মামার মেয়ে, সবে ইশকুল যাচ্ছে
পুলু ঘুরে বেড়ায় মনের আনন্দে বিরাট জমিদার বাড়ি মামাদের এখন অবশ্য জমিদারি আর নেই, কিন্তু তাতে কী! বাড়ি তো বিশাল তিনটে মহল! তাতে বিরাট বিরাট ঘর সব ঘরেই কত ছবি, কত ঘড়ি, কত কার্পেট, পুরোনো দিনের কত বড়োড়ো আসবাব! ঠিক সিনেমার মত শীতকাল, সাপখোপের ভয় নেই যেখানে খুশি যেতে পারে, শুধু পুকুরপাড়ে যাওয়া মানা মামা বলে দিয়েছে, ঘাটের সিঁড়িগুলোয় শ্যাওলা আছে পুলু শহুরে মেয়ে, সাঁতার জানে না
অবশ্য আর একটা জায়গায় মামা যেতে বারণ করেছে এই তিনমহলা বাড়ি ছাড়াও আর একটা মহল আছে বাড়ি থেকে একটু দূরে সেটা ছিল বা’রবাড়ি সেখানে দাদামশাইয়ের বাবার বাবা অফিস করত তখন অফিসকে ব কাছারি সেটা আস্তে আস্তে ভেঙে গিয়েছে এখন একেবারে ভাঙা, শুধু একটা খোলস পড়ে আছে দুপুরবেলা দাদামশাই নিজের ঘরের জানলা দিয়ে সেই ভাঙা বাড়ি দেখিয়ে গল্প বলে, কেমন একদিন ছিল, দাদামশাই ছোটোবেলায় দেখেছে, লোকজন, ঘোড়ার গাড়ি, গরুর গাড়িতে ওই কাছারি বাড়ি গমগম করছে, কেমন কিছুদিন আগেও সিনেমায় পুরোনো রাজবাড়ি দেখাতে হলে ওখানেই ক্যামেরা নিয়ে আসত সবাই বড়ো বড়ো অ্যাকটররা সেখানে এসেছে ছবি করতে
আজ সেখানটা এতই ভাঙা যে বাচ্চা বুড়ো সকলেরই যাওয়া বারণ বাড়িটার অনেকগুলো অংশ নাকি প্রত্যেক বর্ষায় ভেঙে ভেঙে পড়ে বর্ষা ছাড়াও ভেঙে পড়ে তাই ছোটোমামা সেখানে এখন একটা পাঁচিল তুলেছে ছোটোমামা পুলুদের বলে দিয়েছে, ওই পাঁচিলের বাইরে যেখানে খুশি ওরা যেতে পারে, কিন্তু ভেতরে যেন না যায় পাঁচিল টপকেও না
দাদা আর কুট্টিদি ওকে বলেছে, “বুঝলি তো, ওখানেই থাকে ভূতটা সাহস আছে? যেতে পারবি?”
যেতে হয়ত পারবে, কিন্তু পুলু অত বোকা নয় বড়োদের কথা অমান্য করে একটা বিপদে পড়লে কী হতে পারে সে ও ভাল করেই জানে

মামাবাড়ির বাগানের বাইরে আর একটা বাগান, সেখানে একটা মন্দির আর পুজো-টুজো হয় না, তাই বিগ্রহটা বড়োমামা বাড়ি ঠাকুরঘরে নিয়ে গিয়েছে মন্দিরটা পুলুর খুব ভাল লাগে চারিদিকে মামা বাগান করেছে, ভিতরটা পরিষ্কার করে রেখেছে পাথরের তৈরি, তাই দুপুরের পরে ভিতরটা বেশ ওম্‌ থাকে ঠাণ্ডার দিনেও পশ্চিমের দেওয়ালের লম্বা সরু ফাঁক দিয়ে রোদের চিলতে এসে পড়ে, সেই আলোতে ধুলো উড়ে বেড়ায়, চুপ করে বসে দেখে পুলু
মন্দিরের ভিতরে বাইরে হাজার হাজার মূর্তি মামা বলেছে, ওদের ঠাকুর্দারও ঠাকুর্দা, মানে পুলুর দাদুর ঠাকুর্দার বাবা ছিলেন মস্ত জমিদার রাজা তিনিই মন্দির বানিয়েছিলেন সারা দেশ থেকে কারিগর এনে নানা দেব দেবীর মূর্তি দিয়ে সাজিয়েছিলেন
মামা বলেছিল, “জানিস, সবাই বলে, এই যে যত ঠাকুর, দেব-দেবীর মূর্তি আছে, সব নাকি আমাদের বাড়িরই লোকের মুখের আদলে তৈরি করা কোনটা সেই ঠাকুর্দার ঠাকুর্দার মুখ, কোনটা ওনার বউয়ের, কোনটা বা ওনার ভাই বা বোন বা ছেলে-মেয়ের পুলু দেখতে দেখতে হঠাৎ দেখে দরজার ওপরে, দেবতার ঘরের দরজার দিকে মুখ করা, একটা ভয়াল রাক্ষসের মুখ! হঠাৎ দেখে ভয় পেয়ে গিয়েছিল শক্ত করে মামার হাত চেপে ধরেছিল মামা বলেছিল, “কী হল রে?”
পুলু রাক্ষসের মুখটা দেখিয়ে বলেছিল, “ওটা কোন ঠাকুর?”
মামা বলেছিল, “ওটা কী কেউ জানে না একবার একজন রিসার্চার এসেছিলেন... রিসার্চার কাকে বলে জানিস?”
রিসার্চার, মানে, ইয়ে... ওই যারা কোন কিছু নিয়ে অনেক পড়াশোনা করে, অনেক জানে, নতুন নতুন জিনিস বের করে, তেমন?”
বড়োমামা বলেছিল, “বা এমন সব জিনিস বের করে, যেটা কেউ জানে না, বা জানলেও সব্বাই ভুলে গিয়েছে
ও কী বলেছিল রাক্ষসটা দেখে?”
ড়োমামা মাথা নেড়ে বলল, “প্রথমত ওটা রাক্ষস না ওটা রাক্ষসী এর বেশি কিছু বলতে পারেনি বলেছিল, মেয়ে না হয়ে ছেলে হলে ওটাকে কুবেরের মূর্তি বলা যেত
কুবের কে?”
কুবের? কুবের হল যক্ষ দেবতাদের ব্যাঙ্কের মালিক সব টাকাকড়ি ওর হাতে থাকে
সেটা শুনে পুলুর অবশ্য আর অতটা ভয় করেনি
সে দিন দুপুরবেলাটায় কিছু করার ছিল না পুলু বেড়াচ্ছিল বাইরের বাগানে বেড়াতে বেড়াতে দেখল দূরে দাদা আর কুট্টিদি হাতে লাঠি নিয়ে যাচ্ছে কাছারি বাড়ির দিকে মনে হল, ওরা দুষ্টুমি করে কাছারি বাড়িতে ঢুকতে যাচ্ছে? তাহলে ওরা যদি পুলুকে দেখে ফেলে, ওকেও নিয়ে যাবে যাতে ও নালিশ না করতে পারে ওদের দৃষ্টি এড়াতে চট করে ঢুকে পড়ল মন্দিরে
মন্দিরে ঢুকলে আর ওদের দেখা যাবে না কারণ মন্দিরের তিন দিকের দেওয়ালে ফাঁক আছে কিন্তু যে দিকে কাছারি বাড়ি, সে দিকেই মন্দিরের পিছন দিক সে দিকেই ঠাকুরের ঘরটা বড়োমামা বলেছে গর্ভগৃহ এখন ঠাকুর নেই, তাই জুতো পরেও যাওয়া যায় তবে অন্ধকার বলে পুলু যায় না
হঠাৎ মনে হল, গিয়ে দেখলেই হয়, যদি থাকে একটা জানলা, বা সেরকম কিছু? বেশ চুপি চুপি স্পাইং করা যাবে দাদা আর কুট্টিদির ওপর পা টিপে টিপে গর্ভগৃহে ঢুকে বুঝল বড্ড অন্ধকার বাইরের আলো ঢোকার রাস্তা কেবল সামনের দিকের দরজাটাই বাকি ঘরটা পুরোটাই অন্ধকারে ঢাকা উল্টোদিকের কোনাগুলো দেখাও যাচ্ছে না
একটু দাঁড়াতেই চোখটা অন্ধকারে সয়ে গেল বুঝল অন্ধকার বেশি না হলেও, মন্দিরের পিছন দিকে কোন জানলাই নেই পেছন ফিরেছে বেরোবে বলে, আবার দাঁড়িয়ে গেল অন্ধকার কোনা থেকে একটু আলোর আভা দেখা যাচ্ছে মন্দিরের মেঝের তলা থেকে?
ছোট্ট হলে কী হবে, পুলু খুবই সাহসী আস্তে আস্তে এগিয়ে গিয়ে দেখল, আরে! মন্দিরের মেঝের দুটো পাথরের ফাঁক দিয়ে মাটির নিচ থেকে একটা আলো আসছে!
হামা দিয়ে সেখানে চোখ রাখল পুলু কিন্তু ফাঁকটা এতই সরু, যে কিছুই ঠাহর হল না এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল, কিছু কি আছে, যেটা দিয়ে আলগা পাথরটা চাড় দিয়ে আলাদা করা যেতে পারে? নেইআবার উঠে দাঁড়াতে গেছে, টলে পড়ে যাচ্ছিল বলে হাত দিয়ে ভর দিয়েছে দেওয়ালে দেওয়ালের পাথরটা কেমন ভেতর দিকে ঢুকে গেল, আর ওমনি মাটির আলগা পাথরটা সরে গেল, আর পুলু দেখল, সেখান দিয়ে একটা সিঁড়ি নেমে গিয়েছে, নিচের দিকে
খানিকক্ষণ ওখানেই দাঁড়িয়ে রইল পুলু তারপরে সাবধানে নিচের দিকে পা বাড়াল
বেশ লম্বা সিঁড়ি পুলু মার মুখে শুনেছে ওদের বাড়িতে অনেক লুকনো ঘর, মাটির তলায় সুড়ঙ্গ, এ সব ছিল, কিন্তু সে কোথায়, কী করে যেতে হয়, এখন কেউ আর জানে না বুঝল এটাও সেরকম কোন মাটির তলার ঘর বা সুড়ঙ্গ পায়ে পায়ে সিঁড়ি দিয়ে নেমে মাটিতে পৌঁছে পুলু হাঁ করে দেখল সেটা ঘরও না, সুড়ঙ্গও না রীতিমত একটা মহল লম্বা বারান্দা, তার এক দিকে দরজা, অন্যদিকে একটা উঠোন দেওয়ালে আঙটার গায়ে লম্বা লম্বা হাতলে লাগা মশাল জ্বলছে কেউ কোত্থাও নেই
পুলু পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে ঘরগুলোতে উঁকি মেরে মেরে দেখতে থাকল সব ঘরই খালি, কিন্তু কী সুন্দর করে সাজান’ দামী দামী আসবাব, কার্পেট, পর্দা... একটা একটা করে ঘর দেখতে দেখতে বারান্দার শেষ দরজায় দাঁড়িয়ে উঁকি মেরে দেখল একটা শোবার ঘর মস্ত খাট, ড্রেসিং টেবিল – ঠিক বাড়ির দোতলার মত – অবশ্য আয়নাটা আর নেই সব কিছুই অনেক পুরোনো দেওয়ালে একটা মস্ত পেন্টিং একজন রাজা দাঁড়িয়ে আছেন মামাবাড়িতে অনেক এমন পুরোনো ছবি আছেঅয়েল পেন্টিং পুলুর দাদু, তার বাবা, তারও বাবা, এমনকি তারও বাবার ছবি, আর তাদের সবার ভাই, বোন, বউ, ছেলেমেয়েদের রাজাদের বাড়িতে এমন থাকে, মামা বলেছে যদিও এখন আর ওরা রাজা, জমিদার কিছুই না, ছবিগুলো তবু রয়ে গিয়েছে
এই ছবিটাও অমনই কারওর হবে এরকম আর একটা ছবি কি ও বাড়িতেও রয়েছে? ছবিটাকে ভাল করে দেখবার জন্য ঘরের মধ্যে কয়েক পা ঢুকে গিয়েছিল পুলু হঠাৎ বিছানার দিকে চোখ পড়তেই, ভয়ে আঁতকে প্রায় চেঁচিয়ে উঠেছিলখাটে বসে ওর দিকে তাকিয়ে রয়েছে, বিশাল এক বুড়ি, যার মুখটা একেবারে ওই মন্দিরের সেই... সেই... মূর্তিটার মত... সেই... ও মা গো!
পুলুর চোখে চোখ পড়তে বুড়ি একগাল হেসে বলল, “তুই রাকা না? চন্দ্রিমার মেয়ে পুলু?”
পুলু ভাবল পালাবে, কিন্তু নড়তে পারছে না, হাপরের মত নিঃশ্বাস পড়ছে, বুকটা দৌড়চ্ছে মেল ট্রেনের স্পিডে ওর নাম জানল কী করে?
তুমি কে?” জানতে চাইল পুলু গলাটা কেঁপে গেল একটু
উত্তরে বুড়ি দুলে দুলে হাসল তারপরে হাত দিয়ে বিছানাটা চাপড়ে বলল, “আয়, এখানে আয়, বোস
পুলুর হাত পা ঠাণ্ডা মনে হচ্ছে মাথা ঘুরছে
বুড়ি বলল, “খাটটা খুব উঁচু, তুই উঠতে পারবি? না, পারবি না ওই দেখ, ওটাতে বোস
পুলু দেখল বুড়ি ওকে একটা টুল দেখাচ্ছে আঙুল দিয়েঘরের আরও ভেতরে, কিন্তু বিছানা থেকে অনেকটা দূরে গিয়ে বসল
বুড়ি বলল, “তুই এখানে এলি কী করে?”
পুলু বলল, “মন্দিরের মধ্যে একটা পাথর আলগা ছিল সরে ফাঁক হয়ে গেল
বুড়ি মাথা নাড়ল বুঝেছে বলল, “, ওই পথে
পুলু আবার জিজ্ঞেস করল, “তুমি কে?”
বুড়ি একটু ভেবে বলল, “আমি তোর এক রকম দিদিমা আমাকে দিদিমা বলেই ডাকবি, কেমন?”
পুলুর ভয়টা একটু একটু কমছে বুড়িকে দেখতে এখন অতটা ভয়ঙ্কর লাগছে না ঘাড় নাড়ল বলল, “কী রকম দিদিমা? আমার দিদিমাকে আমি দিয়া বলে ডাকি
বুড়ি আবার ভাবল একটু তারপরে বলল,“তুই যদি চন্দ্রিমার মেয়ে পুলু, তার মানে তোর বাবার নাম অরুণাভ সিংহ, তাই না?”
পুলু বলল, “হ্যাঁ
বুড়ি বলল, “তোর মায়ের বাবা, তোর দাদামশাইয়ের নাম তাহলে হেমেন্দ্রসুন্দর চৌধুরী
তাই পুলু বলল, “আমি দাদুকে দাদু বলি
বুড়ি বলল, “তাহলে ওই উনি কে জানিস?” বলে দেওয়ালে ঝোলান’ ছবিটা দেখাল
পুলু বলল, “ওরকম অনেক ছবি ও বাড়িতে আছে কে আমার মনে নেইকো
বুড়ি আঙুলে গুনে বলল, “উনি তোর দাদামশাইয়ের ঠাকুর্দার ঠাকুর্দার বাবা শ্রীল শ্রীযুক্ত মহারাজাধিরাজ অমেন্দ্রসুন্দরআমার উনি
বুড়ি দু হাত জোড় করে ছবিকে নমস্কার করল
পুলু অবাক হয়ে বলল, “বাবা! কতবড়ো নাম!”
বুড়ি একটু বিরক্ত হয়ে বলল, “আরে নামটা অত বড়ো না, উনি রাজা ছিলেন তাই ওরকমই বলে ওনার নাম অমেন্দ্রসুন্দর
পুলু খিলখিল করে হেসে বলল, “অমেন্দ্রসুন্দর আবার নাম হয় নাকি?”
বুড়ি মাথা নেড়ে বলল, “আঃ, তুই কিচ্ছু জানিস না নাকি? অমেন্দ্র না, অমেন্দ্র না – ---অমেন্দ্র ওই তোর দাদার যে নাম, সেই নাম
পুলু বলল, “আমার দাদার নাম তো রমেন্দ্র
বুড়ি হাততালি দিয়ে বলল, “হ্যাঁ, ওই, ওই
পুলু বলল, “তা হলে অমেন্দ্র বললে কেন?”
বুড়ি বলল, “বা রে, উনি আমার উনি না?”
পুলু এবার কিচ্ছু বুঝতে পারল না উনি কী?
বুড়ি বলল, ওই, তোর বাবা অরুণাভ সিংহ তোর মার যা, তাই
পুলু এই বারে বুঝল “বর?”
জোরে জোরে ওপরে নিচে মাথা নাড়ল বুড়ি বলল, “সেই জন্য আমি ওনার নাম নিই না” তারপর পুলুর মুখের ভাব দেখে বলল, “তোর মা কি তোর বাবার নাম নেয়?”
ঘাড় কাত করে পুলু বলল, “হ্যাঁ-অ্যা-অ্যা...”
সে কী রে,” বুড়ি অবাক! “কী অনাসৃষ্টি!”
অনাসৃষ্টি কেন হবে পুলু বুঝল না, তবে দিদিমার হাবভাব দেখে বুঝল মা যে বাবাকে মাঝে মাঝেই, “এই যে সিংহের বাচ্চা,” বলে ডাকে রাগ করে, সেটা বুড়িকে বলা যাবে না কিন্তু ততক্ষণে আর একটা চিন্তা মাথায় এসেছে
বলল, “তুমি আমার দাদুর ঠাকুর্দার বাবার... বউ? তাহলে তোমার বয়স কত?”
দিদিমা ঠোঁট উল্টে বলল, “কী জানি, অনেক হাজার বছর হবে
অনেক হাজার বছর আবার মানুষ বাঁচে নাকি?” দিদিমা পুলুকে বাচ্চা মনে করে ঠাট্টা করছে বুঝতে পেরে পুলু আবার খুব হাসলবুড়ি যে ওর প্রশ্নের উত্তর দিল না, সেটা খেয়ালও করল না তারপরে বলল, “কিন্তু ও বাড়িতে তো সব্বার ছবি আছে ওই বুড়ো রাজা রমেন্দ্রসুন্দরেরও আছে সব্বার বউ, ছেলে, মেয়ে – কই, তোমার ছবি তো নেই?”
বুড়ি খানিকক্ষণ চুপ করে রইল তারপরে বলল, “আমার ছবি নেই, আমার সতীনের আছে
সতীন?
দিদিমা বলল, “মহারাজাধিরাজ অমেন্দ্রসুন্দরের দুটো বউ ছিল জানিস না, আগেকার দিনের রাজাদের দুটো করে বউ থাকত?”
জানে, রূপকথায় পড়েছে পুলু এক রানি সুয়োরানি, এক রানি দুয়োরানি
বলল, “তুমি বুঝি দুয়োরানি?”
শুনে বুড়ির কী হাসি! মুখ খুলে হা হা করে হেসেই চলেছেবুড়ির খোলা মুখের দিকে তাকিয়ে পুলু দেখল ওর মুখের দুপাশের দুটো দাঁত কেমন বড়ো বড়ো! মুখের বাইরে বেরিয়ে এসেছে প্রায়আবার মনে পড়ল মন্দিরের সেই রাক্ষসীর মুখের কথা একটু একটু ভয় করতে শুরু করল আবার
বুড়ি বলল, “তুই যদি ভয় না পাস, তাহলে তোকে আসল কথাটা বলি ভয় পাবি না বল?”
এবার পুলুর সত্যিই ভয় করতে লেগেছে একবার ভাবল, পালায়, তারপরে আস্তে আস্তে মাথা নাড়ল
বুড়ি বলল, “অমেন্দ্রসুন্দরের দুই রানি এক রানি, যার ছবি ও বাড়িতে আছে, সে ছিল মানুষ রানি আর আমি হলাম রাক্ষসী রানি
পুলু অজ্ঞান হয়ে টুপ করে টুল থেকে পড়ে গেল
জ্ঞান ফিরলে পুলু বুঝল ও বিছানায় শুয়ে আছে প্রথমে কোথায় আছে মনে করতে পারছিল না, কিন্তু মাথা ঘোরাতেই দেখতে পেল রাজা রমেন্দ্রসুন্দরের ছবিটা ওমনি ভয়ে মাথা গুলিয়ে উঠল আবার তাড়াতাড়ি উঠে বসতে গিয়ে দেখল ওই বুড়ির বিছানাতেই শুয়ে! কিন্তু রাক্ষসী দিদিমা গেল কোথায়? ঘরে তো কেউ নেই! ওমনি দরজা দিয়ে ঢুকল দিদিমা এবার আর দিদিমাকে দেখে পুলুর মনে সন্দেহ রইল নাএ রাক্ষসীই বটে এমন মুলোর মত দাঁত, কুলোর মত পিঠ, ভাঁটার মত চোখ... আর কী দশাসই চেহারা! লম্বায় প্রায় দুটো মানুষের সমান, পাশেও বিশাল! হাতে কাঁসার বাটি নাকি কড়াই? কেন? কেটে খাবে নাকি? পুলুর কান্না পেতে লাগল আবার অজ্ঞান হবে কি না ভাবছে, রাক্ষসী এক গাল হেসে বলল, “যাক, জ্ঞান ফিরল তাহলে? এত ভয় পাবি জানলে বলতামই না ভাবলাম সাহসী বুঝি” কাঁসার বাটিটা খাটের পাশে একটা টেবিলে নামিয়ে রেখে বলল, “বুড়ো হয়েছি, মন্তর তন্তর মনেও থাকে না ছাই নইলে বাটিতে করে জল আনতে যেতাম? মন্তর পড়েই জ্ঞান ফিরিয়ে আনতাম
নারকোলের ছোবড়ার মত খড়খড়ে হাত কপালে বুলিয়ে দিয়ে বলল, “মাথা ঘুরছে না তো?”
পুলুর হঠাৎ মনে পড়ল, রাক্ষসীরা ওদের নিজেদে আত্মীয়দের মাংস খায় না তারপরে মনে পড়ল, নীলকমল লালকমলে রাক্ষসী রানি অজিত আর কুসুম দু’জনকেই খেয়েছিল
ধড়ফড় করে উঠে বসল রাক্ষসী বলল, “কী হল?”
পুলু জবাব না দিয়ে বলল, “তুমি এখানে কী কর?”
বুড়ি, না রাক্ষসী, না দিদিমা, না কী বলবে, একটু দুঃখের হাসি হেসে বলল, “কী আর করব? এখানে কেউ তো নেই, একা একা থাকি সারা দিন কথা বলার লোক নেই, কিচ্ছু না... তবে রাত্তির হলে আমি বাইরে যাই
পুলু বলল, “দিনে যাও না?”
রাক্ষসী মাথা নাড়ল “সেই জন্যই তো মাটির নিচে থাকি রাজাধিরাজ যখন বৃদ্ধ হলেন, আমাকে ডেকে বললেন, লোলজিহ্বা, আমি বৃদ্ধ হয়েছি আমি মারা গেলে তুমি কী করবে? তুমি কি নিজেদের লোকেদের মধ্যে ফিরে যাবে, নাকি এখানেই থাকবে?”
পুলু বলল, “তোমার দেশ কোথায়?”
রাক্ষসী বলল, “আমাদের দেশ তো আর নেই, সেই রাবণরাজা মারা যাবার পর থেকে বিভীষণ কিছু রাক্ষস নিয়ে নিজের রাজত্ব চালায়, কিন্তু আমরা বাকিরা সারা পৃথিবীতে নানা জায়গায় ছড়িয়ে পড়েছি
পুলু অবাক হয়ে বলল, “তুমি রাবণরাজার সময় থেকে বেঁচে আছ? বিভীষণও বেঁচে আছে?”
রাক্ষসী বলল, “বিভীষণ তো থাকবেই ও তো অমর
পুলু বলল, “আর তুমি?”
রাক্ষসী মাথা নেড়ে বলল, “আমি অমর না, তবে রাক্ষসরা তো এমনিই অনেক হাজার বছর বাঁচে, তার ওপর আমাদের মারা বড়ো কঠিন কারও প্রাণ থাকে বট গাছের ফলে, কারও প্রাণ থাকে মাছের পেটে...”
পুলু শুনেছে বটে জিয়নকাঠি আর মরণকাঠি ভোমরার কথাও জানে। বলল, “তারপর কী হল?”
রাক্ষসী বলল, “রাজাধিরাজ বললেন, ‘লোলজিহ্বা, তুমি যদি এখানে থাকতে চাও, আমি ব্যবস্থা করে দেব’ তারপরে মাটির নিচে এই বিশাল মহল তৈরি করলেন, আর ওপরে বানালেন মন্দির
পুলু বলল, “কিন্তু এখানে কেন? ও বাড়িতে তোমার ঘর ছিল না?”
রাক্ষসী বলল, “ছিল বইকি! তেতলায় মস্ত মহল ছিল আমার কিন্তু আমি তো রাক্ষসী আমাকে মানুষ সেজে থাকতে হত যত বয়স বাড়ে তত আমাদের জাদু কমে আসে তখনই আর সব সময় সুন্দরী সেজে থাকতে পারতাম না রাজাধিরাজ বললেন, ‘তোমায় দেখে লোকে ভয় পাবে, তার চেয়ে এখানে থেকো, যত দিন চাও, তারপরে মন চাইলে চলে যেও’ তবে আমি আর যাইনি
পুলুর কী মনে হল, বলল, “এখানে সবকটা ঘরই আমি দেখেছি – রান্নাঘর নেই কেন? তোমার খাবার রান্না কর কোথায়?”
রাক্ষসী হেসে বলল, “আমি রান্না করা খাবার খাই নাকি? আমি তো কাঁচা খাই জানিস না, রাক্ষসরা কাঁচা খায়? তবে অনেক দিন মানুষের মধ্যে আছি তো, মাঝে মাঝে রান্না খেতে ইচ্ছে করে, তখন ওবাড়ির রান্নাঘরে গিয়ে কিছু একটা বানিয়ে নিই উনুন জ্বেলে
পুলুর মনে পড়ল কুট্টিদির কথা বলল, “আর তখনই তোমাকে লোকে দেখতে পেয়ে ভয় পায়?”
রাক্ষসী বার খুব হাসল বলল, “ঠিক ধরেছিস খাওয়া দাওয়া হাওয়ায় মিলিয়ে দিই, তারপরে হয় কুকুর, নয় বেড়াল হয়ে পালিয়ে যাই
এবার পুলু ভুরু কুঁচকোল “তাহলে দাদা যে ভয় পেয়েছিল, মা বলল বেড়াল দেখে, সেটা বেড়াল ছিল না?”
মাথা নাড়ল রাক্ষসী বলল, “আমিই ছিলামরেকবার কী হয়েছে, মন্দিরার মেয়েটা... মণিদীপা – ডাক নাম কী যেন? কুট্টি, তাই না? দেখে ফেলেছে আমাকে! সে কী চিল চিৎকার! আমি ঘাবড়ে গিয়ে মন্ত্র বলে উনুন আর কড়াইটা খবরের কাগজ করে দিয়েছি, এমন মন্ত্র বলেছি যে পরে আর সেটা ঠিকই করতে পারলাম না! কাগজটা ওখানেই ফেলে চলে এলাম
কুট্টিদিকে বলতে হবে, ভূত না রাক্ষসী ছিল পুলু মনে মনে একটু হাসল তারপর বলল, “বেরোও কী করে তুমি? ওই সিঁড়ির মাথার ছোট্ট গর্ত দিয়ে তো তোমার মাথাই গলবে না
রাক্ষসী অবাক হয়ে বলল, “ও মা, সে কী কথা? আমি ছোট্ট প্রাণী হয়ে যে কোন কিছুর মধ্যে দিয়ে গলে যেতে পারি তবে আমি মন্দিরের পথে যাওয়া আসা করি না আমার ওদিক দিয়ে অন্য পথ আছে মন্দিরে পুজো আচ্চা হয় – হত, ওখানে সবসময় লোক থাকত, তাই
পুলু বলল, “তুমি যে কোন ছোটো প্রাণী হতে পার?”
বটেই তো, হাতিও হতে পারি, মশাও হতে পারি দেখবি?”
পুলু কিছু বলার আগেই চোখের সামনে বুড়ি রাক্ষসী মিলিয়ে গেল, আর কানের কাছে, পুঁ---উ করে উড়তে লাগল একটা মশা তারপরেই আবার যে কে সেই, খাটের ওপর বাবু হয়ে বসে রাক্ষসী দিদিমা!
পুলু বলল, “আচ্ছা, তাহলে মন্দিরে ওই রাক্ষসী মূর্তিটা সত্যিই তোমার?”
ভুরু কুঁচকে রাক্ষসী বলল, “মন্দিরে মূর্তি? কোথায়?”
পুলু বলল, “কেন, মন্দিরে একটা – মাত্র একটা রাক্ষসীর মুণ্ডু আছে তুমি জানো না?”
রাক্ষসী মাথা নেড়ে বলল, “কই না তো, তবে আমি তো মন্দিরের ভিতরটা কোনদিন দেখিইনি আগে তো পুজো হত, লোকজন থাকত, তাই ওদিকে যেতাম না
পুলু বলল, “মন্দিরে সব দেব দেবীর মূর্তি নাকি রাজা, রানি, তাঁর ছেলে মেয়ের মুখের আদলে তৈরি তুমি জানতে না?”
আবার মাথা নাড়ল রাক্ষসী বলল, “কত দিন নিজের চেহারা দেখিনি, চল, দেখে আসি
পুলু বলল, “সেকি! তুমি নিজের চেহারা দেখনি? কেন? তোমার আয়না নেই?”
রাক্ষসী বলল, “কাচের আয়নায় আমাদের ছায়া পড়ে না তাই স্ফটিকের আয়না তৈরি করতে হয় আমার ছিল কয়েকটা – কিন্তু একে একে ভেঙে গিয়েছেবলে আয়না ভাঙা টেবিলটা দেখাল
পুলু বলল, “এখন যাবে? এর পরে যদি রাত্তির হয়ে যায়, তাহলে অন্ধকার হয়ে যাবে
রাক্ষসী বলল, “রাত্তিরেই যাব আমি অন্ধকারে পরিষ্কার দেখতে পাই, তাছাড়া কেউ এখন দেখতে পেলে হট্টগোল হবে কিন্তু মূর্তিটা খুঁজে পাব?”
বাড়ি ফিরে অনেক ভাবল পুলু কাউকে কিছু বলতে বারণ করে দিয়েছে বুড়ি রাক্ষসী, কিন্তু পুলু যাবার আগে বার বার করে ওকে দিয়ে প্রতিজ্ঞা করিয়ে নিয়েছে, “আবার আসবি, বল?” কত দিন কারওর সঙ্গে কথাই বলেনি স্বজাতি, স্বজন কোথায় আছে কিচ্ছু জানে না কী কষ্ট, কী দুঃখ! পুলুর কান্না পাচ্ছিল
বাড়ি ফিরে বড়োমামার মহলে গেল ওখানেই সব পুরোনো রাজাদের ছবি একটু খুঁজতেই বসার ঘরে দেখতে পেল সেই ছবিটা – যেটা মন্দিরের নিচের মহলে দেখে এসেছে বড়োমামাকে বলল, “তোমার ওই বংশপঞ্জীটা দেখাবে?”
বংশপঞ্জীটা মামা খুব যত্ন করে তৈরি করেছে, তাই কেউ দেখতে চাইলে খুব খুশি হয় মস্ত কাগজটা বের করে বসল সবার নাম লেখা আছে, সবার স্ত্রী বা স্বামীর নাম লেখা আছে, ছেলে-মেয়ের নাম লেখা আছে
পুলু আঙুল দিয়ে রমেন্দ্রসুন্দরের নাম দেখিয়ে বলল, “এনার একজন স্ত্রীর নাম লিখেছ, নিভারানিরেকজন স্ত্রীর নাম লেখনি, জায়গাটা ফাঁকা রেখেছ কেন?”
মামা একটু ভেবে বলল, “কী হয়েছিল জানিস? রাজা রমেন্দ্রসুন্দরের একজন স্ত্রীর নামই সব জায়গায় লেখা আছে, কিন্তু কোনও কোনও জায়গায় দেখেছি একজনের কথা ছে, সেটা স্ত্রী না হয়ে যায় না হিসেবের খাতায় টাতায় নামটা রয়েছে, কিন্তু নামটা এমন অদ্ভুত, যে আমি লিখব লিখব করেও লিখতে পারিনি
পুলু ভাবল, নামটা বলে মামাকে চমকে দেবে কি? কিন্তু বলল নামামা বলল, “কী নাম জানিস? দাঁড়া, লেখা আছে” বলে একটা দুটো কাগজ উলটে পালটে বলল, “এই যে, দেখ – লোলজিহ্বা! লোলজিহ্বা কারওর নাম হয়?”
মামীমা এর মধ্যে মামার জন্য চা-জলখাবার নিয়ে এসেছে বলল, “বাবা! কেমন রাক্ষসী-রাক্ষসী নাম! লোলজিহ্বা, ত্রিজটা, হিড়িম্বা! আর কী কী সব ছিল?”
পুলু বলল, “আচ্ছা, যদি সত্যিই রাজা রমেন্দ্রসুন্দরের এক রানি রাক্ষসী হয়? হতে পারে না?”
বড়োমামা আর মামীমা হেসেই কুটিপাটি “রাক্ষস আবার হয় নাকি?”
পুলু বলল, “কেন? রাম যে রাবণবধ করল, সে তো রাক্ষস ছিল আবার রাবণের বাবা তো মুনি ছিলেন মা বলেছে, আমি নাম ভুলে গেছি
মামীমা আস্তে আস্তে চায়ের কাপটা নামিয়ে রেখে বলল, “পুলস্ত্য কিন্তু সে কি সত্যি কথা?”
মামা সব বিষয়ে পণ্ডিত চায়ে চুমুক দিয়ে বলল, “উঁহু, পুলস্ত্য রাবণের বাবা না, ঠাকুর্দা রাবণের বাবা বিশ্রবা মুনি
পুলু দেখল আলোচনাটা অন্য দিকে চলে যাচ্ছে, তাই তাড়াতাড়ি বলল, “যাই হোক, কিন্তু মানুষের বউ তো রাক্ষস হতেপারে, তাই না? রূপকথাতেও তো লেখা আছে…”
বড়োমামা হঠাৎ থমকে গিয়ে বলল, “তুই কী বলছিস ঠিক করে বলবি? আমার খালি মনে হচ্ছে তুই কিছু একটা বলতে চাইছিস, কিন্তু বলছিস না বা বলতে গিয়েও আটকে যাচ্ছিস
পুলু বলল, “কিন্তু তোমাদের কথা দিতে হবে, কাউকে বলতে পারবে না কথা দাও?”
মামীমার হাত থেকে চায়ের কাপটা পড়ে চুরমার হয়ে গেল বড়োমামা বলল, “তুই কী বলছিস? আমি কিচ্ছু বুঝতে পারছি না!”
পুলু বলল, “কিন্তু তোমরা কথা দিয়েছ, কাউকে বলবে না...”
মামীমা বলল, “তোর সাহস তো কম না, সারা দুপুর রাক্ষসীর সঙ্গে গল্প করে এলি, কাউকে কিছু বললিও না?”
মামা মামীমাকে বলল, “তুমি একটু আমার সঙ্গে এসো তো এই ঘরে, পুলু, তুই কোত্থাও যাবি না এখানেই থাক
পুলু ঘাড় নেড়ে হ্যাঁ বলল, মামা মামী উঠে পাশের ঘরে গেল পুলু খানিকক্ষণ চুপ করে বসে বসে এদিক ওদিক দেখল। তারপরে উঠে মামার জায়গায় বসে বংশপঞ্জীটা দেখল, তারপরে চেয়ার ছেড়ে উঠে গিয়ে রাজা রমেন্দ্রসুন্দরের ছবিটার সামনে দাঁড়িয়ে রইল কিছুক্ষণ মামার ঘড়িটা খারাপ হয়ে দশটা বেজে থেমে আছে। এত পুরোনো ঘড়ি সারানর লোক নেই। হঠাৎ মনে হল, পাশের ঘর থেকে মামা-মামীর গলা শোনা যাচ্ছে পায়ে পায়ে এগিয়ে গিয়ে চুপ করে শুনল – দু’জনে ঝগড়া মতো হচ্ছে মামা বকে বকে বলছে যে পুলুর নির্ঘাত মাথা খারাপ হয়ে গিয়েছে, ওর কথা না শুনে এখন ছোটোমামার হোমিওপ্যাথি ওষুধ খাইয়ে ওকে ঘুম পাড়িয়ে রাখা উচি, আর মামীমার বক্তব্য হল, পুলু নিশ্চয়ই কিছু একটা দেখেছে, যেটা তদন্ত করা দরকার
পুলুর মনে হল, ওদের বলাটা হয়ত ঠিক হয়নি একটু পরে বুঝল মামা আর মামীমা আরও গলা নামিয়ে আলোচনা করছে, যেটা শুনতে গেলে দরজার আরও কাছে যেতে হবে, কিন্তু সেটা সাহসে কুলোল না তাই আবার চেয়ারে এসে বসল
ভাগ্যিস! বসতে না বসতেই পর্দা সরিয়ে ঘরে ঢুকল বড়োমামা আর মামীমা বড়োমামা একগাল হেসে বলল, “এই তো, বসে আছিস আচ্ছা, রাক্ষসীটাকে দেখতে কেমন বলতো?”
এই প্রশ্নটার উত্তর সহজ, পুলু বলল, “মন্দিরের ওই রাক্ষসীর মুণ্ডুটা? ওর তো কিন্তু আর একটু বুড়ি জান মামা, তুমি বলেছিলে না, মন্দিরের সব মূর্তিই রাজা রমেন্দ্রসুন্দরের বউ-ছেলে-মেয়ের মুখের মত – ওই রাক্ষসীটা নিশ্চয়ই লোলজিহ্বা…” বলে মনে হল নাম ধরে ডাকাটা উচিহবে না, তাই বলল, “লোলজিহ্বা দিদার
মামা-মামী মুখ তাকাতাকি করল মামীমা উঠে এসে হাত দিয়ে পুলুর কপাল ছুঁয়ে বলল, “বেশ তো, আজ রাত্তির হয়ে গিয়েছে, এখন খেয়েদেয়ে শো তো দেখি, কাল সকালে দেখা যাবে
সিঁড়ি দিয়ে নামতে নামতে পুলু থেমে কান খাড়া করল মামীমা বলছে, “ডাক্তার দেখাতে হলেও কাল সকাল অবধি অপেক্ষা করা যাবে নিশ্চয়ই
খেয়ে দেয়ে শুতে গিয়েও পুলুর ঘুম এল না খালি ভয় করছে, যদি মামা বা মামী গিয়ে মা বাবাকে বলে দেয়? যদি ওরা কিছু করে লোলজিহ্বা দিদার বিরুদ্ধে? পাশে কুট্টিদি ঘুমিয়ে কাদা আস্তে আস্তে উঠে গিয়ে খাবার ঘরের বাইরে দাঁড়াল বড়োরা সবাই খেতে বসেছে এক সঙ্গে কিন্তু অন্য কী সব বিষয়ে আলোচনা হচ্ছে সবাই কথা বলছে, তবে বড়োমামা আর মামীমার গলা পাওয়া যাচ্ছে না পুলু আবার গিয়ে শুল একটু পরে মা বাবা শুতে গেল, মাসি মেসোও মামারা আর দাদু দিদা অন্য দিক দিয়ে যায়, তাই ওদের পায়ের শব্দ পাওয়া গেল না মন্দিরের দিকে কি কেউ যাচ্ছে? একবার ভাবল এখনই উঠবে, তারপরে ভাবল একটু পরে উঠবে
তারপরে দেখল ভোর হয়ে গেছে বাইরে কাজের লোকেদের আনাগোনা শুরু হয়েছে মা বাবা দেরি করে উঠবে, মাসি মেসো তো আরও দেরি করে পাশে কুট্টিদি এখনও ভোঁস-ভোঁসিয়ে ঘুমোচ্ছে দাদাও নিশ্চয়ই ওঠেনি দাদু নিশ্চয়ই বাগানে হাঁটছে, আর দিদা রান্নাঘরে ঢুকে গেছে মামীমারাও এল বলে কিন্তু বড়োমামা?
করে উঠে বিছানা ছেড়ে নেমে এক ছুট্টে বাড়ি থেকে বেরিয়ে, বাগান পেরিয়ে, দাদুর ডাক, “দিদুভাই, কোথায় যাচ্ছ?”-র উত্তরে, “আসছি,” বলে না দাঁড়িয়ে, বাগানের পাশের গেট দিয়ে বেরিয়ে, আমবাগান পার করে, মন্দিরের বাগানে ঢুকে কাউকে না দেখে, মন্দিরে ঢুকে দেওয়ালের পাথরে জোরে চেপে মেঝেপাথর সরিয়ে হাঁপাতে হাঁপাতে সিঁড়ি দিয়ে নিচে নেমে দৌড়ে বারান্দা পার করে লোলজিহ্বা দিদার শোবার ঘরের দরজায় পৌঁছে গেল কেউ নেই কোথায় গেল? চারিদিকে সব যেমনটা ছিল তেমন ঘরদোর সাজানো তক তক করছে, দেওয়ালে দেওয়ালে মশাল, ঘরের মধ্যে বাতি জ্বলছে, শানবাঁধানো উঠোন চকচক করছে – রাক্ষসী দিদা কোথায়?
আস্তে আস্তে দিদার ঘরে ঢুকে পুলু প্রথমে টুলটায়, তারপরে ঘুম ঘুম লাগায় বিছানায় উঠে বসল তারপরে কখন ঘুমিয়ে পড়েছে
এবার ঘুম ভাঙল, “এ কী! তুই কখন এলি?” ডাকে চমকে দেখে দরজায় দাঁড়িয়ে আছে লোলজিহ্বা জিভ কেটে বলল, “ঘুমিয়ে পড়েছিলি? এ মা, ঘুম ভাঙালাম?”
জিভ, দাঁত আর ঠোঁট লাল কেন বুড়ির? পুলুর আবার বুক দুরদুর করে উঠল
লোলজিহ্বা বলল, “এত সক্কালে এলি যে? খেয়েছিস? না? সবাই খুঁজবে না? দাঁড়া, আমার হাতে মাটি একটু হাত পা ধুয়ে আসি” বলে আবার বেরিয়ে গেল
এই মহলটা মাটির তলায় বাইরে কত সকাল বোঝার উপায় নেই কতক্ষণ ঘুমিয়েছে পুলু? ভয়ে ভয়ে খাট থেকে নেমে দাঁড়াল এত তাড়াহুড়ো করে এসেছে যে পায়ে চটিটাও গলায়নি এখন খেয়াল হল খালি পা রাক্ষসী দিদা ফিরে এল বলল, “খিদে পেয়েছে নিশ্চয়ই? কী করি এখন? আমার তো আবার খাওয়া দাওয়ার পাট এখানে না…
ভয় বাড়ছে ভাবল বলে, “তুমি কোথায় খেতে যাও? কী খেয়ে এসেছ? তোমার জিভ, ঠোঁট, সব লাল কেন?”
কিন্তু জিজ্ঞেস করা হল না, হঠাৎ বাইরে একটা হইচইয়ের শব্দ, কে যেন “পুলু, পুলু,” ডাকতে ডাকতে এগিয়ে আসছে পুলু দরজার দিকে যাওয়ার আগেই শোবার ঘরের দরজা দিয়ে ঢুকল মা, বড়োমামা, ছোটোমামা, মেসোমশাই, বাবা, মাসিব্বা!
তুই এখানে কী করছিস?” রাগ রাগ গলায় বলল বাবা “কাল থেকে তুই নাকি এখানে ঘুরে বেড়াচ্ছিস?”
মামীমা এদিক ওদিক দেখে বলল, “এখানেই কি তুই…?”
মা বলল, “এখানেই কী, অরুণা?”
পুলু এদিক ওদিক তাকিয়ে দেখল রাক্ষসী দিদাকে দেখা যাচ্ছে না মামীমাকে বলল, “উনিও এখানেই আছেন তোমাদের দেখে লুকিয়েছেন, নইলে তোমরা ভয় পাবে
অবাক হয়ে বাবা বলল, “কী বলছিস? কে লুকিয়েছেন?”
মা বলল, “কাকে দেখে ভয় পাব?”
অন্য সবাই তখন ঘুরে ঘুরে ঘরটা দেখছে বড়োমামা বলল, “ইয়ে, চন্দ্রিমা, আসলে, তোকে বলিনি… পুলু কাল এখানে এসেছিল… তারপর থেকে বলছে… মানে, ইয়ে, এখানে নাকি একটা রাক্ষসী আছে, যে নাকি আমাদের পূর্বপুরুষ… ইয়ে…” আমতা আমতা করে মামা থেমে গেল
বড়োমামার কথায় সবাই হাঁ করে কেউ মামার দিকে, কেউ পুলুর দিকে তাকিয়ে আছে, পুলু একবার ভাবল চিৎকার করে বলে, “আছে, আছে, এক্ষুনি ছিল” কিন্তু হঠাৎ হাতে সুড়সুড়ি লাগাতে তাকিয়ে দেখল একটা দারুণ সুন্দর কাচপোকা ওর বাঁ-হাতের কবজির একটু উপরে উড়ে এসে বসেছে বলল, “উনি যদি এখনি এখানে আসেন, তোমরা কথা দাও, ভয় পেয়ে হুড়োহুড়ি করবে না?”
কেউ কিছু বলল না, ছোটোমামা একটু হেসে বলল, “এখানে রাক্ষসী আসবে?”
ছোটোমামীমা বলল, “রাক্ষসী এখানে থাকে?”
বাবা হাত নেড়ে বলল, “রাক্ষসী-টাক্ষসি আবার কী কথা! বাচ্চা মেয়ে একা একা মাটির নিচের ঘরে এসে ঢুকেছে, ভয় পেয়েছে, রাক্ষসের গল্প বানিয়েছে মনে মনে চল, পুলু চলে এস, এখানে আর থাকতে হবে না
বড়োমামীমা মাথা নেড়ে বলল, “না, জামাইবাবু, ব্যাপার অত সহজ নয় তাকিয়ে দেখুন, এটা মাটির নিচের পোড়ো বাড়ি না এখানে কেউ থাকে প্রত্যেকটা জিনিস পুরোনো হলেও ব্যবহার করা সাফ সুতরো পরিষ্কার এই পানের বাটাটায় দেখুন, বানানো পান পর্যন্ত রয়েছে...”
সবাই আবার পুলুর দিকে ফিরল পুলু বলল, “তোমরা ভয় পাবে দেখেছ, খাটটা কী বড়ো, কত উঁচু? আমি এমনি চড়তেই পারি না মা বাবারও চড়তে অসুবিধা হবে
মা একটু ভয়ে ভয়ে এদিক ওদিক দেখে বলল, “কে থাকে এখানে?”
পুলু বলল, “দাদুর ঠাকুর্দার বাবার দ্বিতীয় স্ত্রী আমাদের সকলের দিদা – দিদিমা হন তোমাদের ঠাকুমা উনি রাক্ষসী তাই উনি এখানে থাকেন
এবারে আর কেউ হাসল না
বাবা বলল, “কোথায়... উনি?”
পুলু বলল, “আমার কাছে উনি নিজের চেহারা বদলাতে পারেন, আগে মানুষের মত দেখতে হতে পারতেন, এখন বয়েস হয়েছে বলে আর পারেন না তবে ছোটো প্রাণী হতে পারেন” কাচপোকাটা ওর জামার হাতা বেয়ে আড়ালে চলে গেছে হঠাৎ মনে হল, যদি খান থেকে দিদা সোজা নিজের রূপ ধারণ করেন, তাহলে ওর জামাটা ছিঁড়ে যাবে কিন্তু কী আর করা, বলল, “দিদা, তুমি যদি দেখা না দাও, ওরা আমাকে ধরে ডাক্তারের কাছে নিয়ে যাবে কিন্তু!”
কোন সাড়াশব্দ নেই বাবা এবার রেগে বলল, “অনেক হয়েছে, লো এখন গিয়ে দাঁত মেজে খেয়ে নাও মামাবাড়ি বেড়ান’ আজই শেষ – চলো আজই ফিরে যাই আমরা চন্দ্রিমা
পুলুর চোখ জলে ভরে এল কে জানে কাচপোকাটা দিদা তো নাও হতে পারে, হয়ত সে কালকের মত মশা বা অন্য কিছু হয়ে উড়ে চলেই গেছে আর সব্বাই পুলুকে মিথ্যাবাদী ভাবছে
পুলুর মা বলল, “মামাবাড়ি এসে তোমার ধিঙ্গিপনা বেড়ে সীমা ছাড়িয়ে গেছে এখন আবার বানিয়ে বানিয়ে রাক্ষসীর গল্প!”
পুলুর জামার হাতার নিচে একটু সুড়সুড়ি লাগল কাচপোকাটা উড়ে বেরিয়ে এসে পুলুর মুখের সামনে উড়তে লাগল সেই সঙ্গে শোনা গেল গমগম করছে লোলজিহ্বা দিদার গলা “কেন রে তোরা মেয়েটাকে বিশ্বাস করছিস না? অরুণা কী বলল সেটাও তো শুনবি একটু মন দিয়ে, বলল যে এখানে কেউ থাকে, এমনকি আমার পানের বাটাটা পর্যন্ত দেখে নিল মেয়েটা...”
এবং, সেই সঙ্গে একটা হুশ্‌ শব্দ হল, আর পুলুর সামনে, পুলুকে ওর মা বাবা মামাদের থেকে আড়াল করে এসে দাঁড়াল রাক্ষসী দিদা
তখন আর কেউ রাক্ষসীর কথা শুনছে না মাসি আর ছোটোমামী আঁ-আঁ করে অজ্ঞান, ছোটোমামা মামীকে পাঁজাকোলা করার চেষ্টা করছে, বড়োমামা দরজার বাইরে, চেঁচাচ্ছে, “অরুণা, অরুণা... চলে এস, অরুণা...”
মা চেঁচাচ্ছে, “পুলু, পুলু... এই রাক্ষসী, আমার মেয়েকে ছেড়ে দে বলছি... ছেড়ে দে...” বলে ছুটে আসার চেষ্টা করছে, আর বাবা মাকে ধরে রেখেছে, আসতে দিচ্ছে না, আর বলছে, “এই এই, পুলুকে ছেড়ে দাও, ইয়ে... দিন, নইলে কিন্তু...”
নইলে কী, আর জানা হল না বাজখাঁই গলায় রাক্ষসী বলল, “চুপ!”
সবাই চুপ
রাক্ষসী বলল, “বাইরে দেখ, একটা চৌবাচ্চা আছে, তাতে পরিষ্কার জল আছে দুজনে যা, সুরেন্দ্র আর সৈকত, গিয়ে ওখানেই মালসা আছে, জল নিয়ে এসে রঞ্জা আর মন্দিরার জ্ঞান ফেরা
বড়োমামা আর মেসোমশাই দরজার সবচেয়ে কাছে ওরা বাইরের দিকে তাকাল, কিন্তু গেল না কেউ রাক্ষসী দিদা এবার ঝুঁকে পড়ে বিছানা থেকে দুটো বালিশ নিয়ে ছোটোমামার দিকে ছুঁড়ে দিয়ে বলল, “অমরেন্দ্র, মেয়েদুটোর মাথার নিচে বালিশ দে শানবাঁধানো মেঝেতে পড়ে আছে
ছোটোমামা বালিশ দুটো নিয়ে বলল, “আমার নাম জানলেন কী করে?”
রাক্ষসী সবে বলতে গিয়েছে, “আমি তোদের সবার নাম...” এমন সময় মা চিলের মত চেঁচিয়ে বলেছে, “অ্যাই, অ্যাই, রাক্ষসী, আমার মেয়েকে ছেড়ে দে, খাবি না, খাবি না বলছি...”
এক লহমায় রাক্ষসী কেমন যেন চুপসে গেল তারপরে, খুব আস্তে আস্তে বলল, “কী বললি?”
নিজের দু’হাতের মধ্যে রাক্ষসী দিদার ডান হাতটা চেপে ধরে পুলু ওর পাশে এসে দাঁড়িয়ে বলল, “কী বলছ মা, উনি আমাদের দিদিমা হ’ন না? উনি আমাকে খাবেন কেন?”
হাঁটু গেড়ে রাক্ষসী পুলুর পাশে বসে পড়ে বলল, “কী বলছিস কী! আমি তোকে খাব এমন কথা বলছিস কেন তোরা?”
পুলু ওর হাত দিয়ে রাক্ষসীর হাতে আস্তে আস্তে বুলিয়ে দিল বলল, “আসলে তুমি কাঁচা খাও তো, তাই মা ভয় পাচ্ছে...”
রাক্ষসী অবাক হয়ে বলল, “কাঁচা খাই বলে তোকে খাব... এ আবার কী কথা? আমি কি কাঁচা মানুষ খাই?”
সবাই চুপ পুলু অবাক হয়ে বলল, “খাও না?”
এবার রাক্ষসী দিদা বাঁ হাত দিয়ে বুকটা চেপে প্রায় কান্নার মত সুরে বলল, “আমি তো রাক্ষসী... আমি... আমি... মানুষ খাই?”
কেউ কোন কথা বলছে না পুলু আস্তে আস্তে আবার বলল, “খাও না?”
রাক্ষসীও আস্তে আস্তে মাথা নেড়ে বলল, “তোরা জানিস না, রাক্ষসরা সবাই নিরামিষাশী?”
নিরামিষাশী!
এ আবার কী কথা!
সবাই মুখ তাকাতাকি করছে, এমন সময়ে প্রথম জ্ঞান ফিরল ছোটোমামীমার চোখ খুলে এদিক ওদিক তাকিয়েই হাউ-হাউ করে কেঁদে উঠল মামীমা ছোটোমামা পিঠে থাবড়ে থাবড়ে বলতে লাগল, “আহা, রঞ্জা, রঞ্জা, সব ঠিক আছে, কেঁদো না, রঞ্জা...” 
পুলু বলল, “কিন্তু তাহলে তোমার ঠোঁটে, জিভে, লাল লাল রং কেন? কী খেয়েছ তুমি?”
জিভ দিয়ে ঠোঁট চাটল রাক্ষসী দিদা এখন অবশ্য লাল রংটা কমে এসেছে পুলুর দিকে চেয়ে হাসল বলল, “ওটা তো বীট খেয়েছি বলে ওই জঙ্গলের মধ্যে আমার ক্ষেত ওই যেখানে লেখা আছে সংরক্ষিত অরণ্য এখন তো শীতকাল, তাই শীতের তরকারি ফলাই আর বীট... আমার খু----ব ভাল লাগে ওই জন্যই তো হাতে মাটি লেগে ছিল, ধুলাম...
আরও সাতদিন কেটে গেছে কাল পুলুদের ফেরা সবার খুব মন খারাপ পুলু, কুট্টি আর বুল্টু সেই সে দিন থেকে উত্তরের মহলের তিনতলার ঘরেই বসে আছে “আরও গল্প বল দিদিমা!” আর দিদিমাও সারাক্ষণ ওদের হাজার হাজার বছরের পুরোনো গল্প বলেই চলেছে, বলেই চলেছে, শেষ আর হয় নাসেই সঙ্গে বড়োমামার রিসার্চ। মামা আজকাল সারাদিন লাইব্রেরিতে বসে থাকে, আর নানা মোটা মোটা বই, আর আদ্যিকালের পুঁথি ঘাঁটে, আর মাঝে মাঝে চুল ভর্তি ধুলো আর মাকড়সার জাল নিয়ে বেরিয়ে এসে তিনতলার মহলে গিয়ে চোখ গোল গোল করে বলে, “ঠিক কথা, সব্বাই নিরামিষাশী ছিল! কত মিথ্যেই না লেখা আছে ইতিহাসে... কিন্তু দিদিমা...” বলে কিছু একটা জানতে চায়। সবাই চায় লোলজিহ্বা দিদার কাছে যেতে, শুধু পোনা তো খুব ছোটো, দিদিমার মুখ দেখলেই ভয় পায়, কাঁদে আসতে চায় না
লোলজিহ্বা দিদিমাকে আনা সহজ হয়নি কত বছরের অভ্যেস, কেনই বা যাবে ওই মাটির নিচের ঘর ছেড়ে? মা, মাসি, মামীমারা, এমনকি দিয়া পর্যন্ত এসে ঝুলোঝুলি দিয়া বলেছিল, “তুমি আমার শাশুড়ি, তুমি এই বাড়িতে আছ, আর আমি জেনেশুনে তোমাকে ঘরে নিচ্ছি না, কেমন কথা?” তাতেও মানে না বলে, “এটাও ওই একই বাড়ি, এই মহলই আমার ঘর।” শেষে দাদু এসে যখন বলল, “বড়ো ঠাম্মা, আমার ঠাকুমা আমার জন্মের আগে মরে গেছে আমি কোনদিন ঠাম্মার আদর পাইনি তুমি না বোলো না তোমার ওখানেও বাড়ি হবে, এবাড়িও রইল তুমি যখন ইচ্ছে যেখানে খুশি থাকবে” তখন বুড়ি রাজি হল
তাতেও কি হয়? বাড়ির সবাই না হয় জানল কিন্তু গাঁয়ের লোক যদি জানতে পারে? কাজের লোকজনের চোখে পড়লে তো রক্ষা নেই তার জন্য নানা রকম ব্যবস্থা হল কাজের লোকেদের বলা হল, তারা যেন কেউ তিনতলায় না যায় দিয়া একটু কিন্তু কিন্তু করে বলেছিল, “সাফ-সুতরো করা... পরিষ্কার... ঝাঁট-পো...” লোলজিহ্বা দিদিমা থামিয়ে দিয়ে বলেছিল, “আমরা রাক্ষসরা কক্ষনও কাজের লোক দিয়ে নিজের কাজ করাই না ওই মন্দিরের নিচের বাড়িও তো এত বছর আমিই সাফ করেছি কই, খারাপ করেছি?”
তাই রাক্ষসী বুড়ি লোলজিহ্বার এখন থাকার জায়গা, আদর, কোনটারই অভাব নেই যদিও মা, মাসি আর মামীমাদের ফিসফিস করে বলাবলি করতে শুনেছে, “একটু যদি কম ভয়াবহ দেখতে হত...”
আর লোলজিহ্বা দিদা মাঝে মাঝে পুলুর সঙ্গে গিয়ে মন্দিরে নিজের মুখের মূর্তিটার সামনে দাঁড়িয়ে থাকে আর বলে, “বয়সকালে দেখতে খারাপ ছিলাম না, কী বল, পুলু?



পরিচিতি


অনিরুদ্ধ দেব পেশায় মনোরোগবিশেষজ্ঞ ছোটোদের জন্য লিখছেন প্রায় কুড়ি বছর। সারাদিনের কাজ সেরে বাড়ি ফিরে প্রতিদিন লেখেন নিয়ম করে, পড়তে বসার মতো নয় – আরাম করে, আনন্দ করে। সন্দেশ, মণ্ডামিঠাই, ইচ্ছে, আমপাতা জামপাতা, হুটোপাটি, প্রভৃতি পত্রিকার পাশাপাশি, তাঁর লেখা প্রকাশিত হয়েছে অর্যমা, সৃষ্টির একুশ শতক, আন্তর্জাতিক পাঠশালা, ইন্ডিয়া টুডে এবং রবিবাসরীয় আনন্দবাজার পত্রিকাতে। অর্থাৎ, বড়দের জন্যও লেখেন। এছাড়া উৎসাহ ছবি তোলা আর পাখি দেখায় (বার্ডিং)

এই বইয়ে ছবি এঁকেছেন ডাঃ সঞ্জয় ব্যানার্জী।
সঞ্জয় ব্যানার্জীও পেশায় চিকিৎসক। ছোটোবেলায় ছবি আঁকতেন। লেখকের অনুরোধে নেক বছর পর আবার তুলি ধরেছেন । ছবি আঁকা ছাড়া ছবি তোলা, এবং পাখি দেখাতেও তিনি উৎসাহী।

প্রকাশকের রাম-কাহিনী..
এই বই এর রকমসকম দেখে পাঠকের মনে প্রশ্ন জাগতেই পারে, এমন ধারা বই কেন? কাগজ, পাতা, ছাপাই, বাঁধাই কিস্যুই নেই, একে বলছে বই! এর উত্তরে জানিয়ে রাখি, কাগজ, পাতা, ছাপাই, বাঁধাই ইচ্ছে করেই বাদ দেওয়া হয়েছে। কারণ, ছাপতে গেলেই চাই প্রকাশক, চাই প্রিন্টার, চাই বাঁধাইওয়ালা, চাই বই-এর দোকান বা পরিবেশক। যাঁরা এই গাড্ডায় পড়েননি, তাঁরা জানেনও না, কী ভালো আছেন, কিন্তু বিভিন্ন সময়ে যাঁরা এসব নিয়ে, বা এঁদের নিয়ে কাজ করেছেন, তাঁরা জানেন, সে কত শ্রম ও ধৈর্যের ব্যাপার। টাকা পয়সার কথা বাদই দিচ্ছি। সে এক ঠগ-বাছতে-গাঁ-উজাড় কাহিনী হবে। কখনও হঠা করে কাগজের দাম বাড়ে তো কখনও প্রকাশকের সময়ের দাম, বই যদি বা বেরোয় বইপাড়ায় তার দেখা মেলে না, যদি বা মেলে, একটা সময়ের পর প্রথম মুদ্রণ শেষ হলেই বই বাজার থেকে হাওয়া।
আজব বইঘরের এই আজব প্রকাশনায় এসবের প্রায় কোনও বালাই থাকল না। প্রকাশক একজন আছে বটে। তবে সে নামেমাত্র এবং সার্থকনামা। একেবারেই ভুতো। সব কাজ লেখকই করে আর প্রকাশক খালি মাথা চুলকোয় আর লেখকের কাছেকা খায়!
সে যা হোক, কাগজ, ছাপা, বাঁধাই, দোকান, পরিবেশক এসব বাদ দিয়েই আমাদের এই আজব বইঘর। আজব বইঘরের প্রথম প্রকাশনা অনিরুদ্ধ দেবের ‘পুলুর দিদিমা’এটি আজব গ্রন্থমালা সিরিজের প্রথম বই। ছবি এঁকেছেন সঞ্জয় ব্যানার্জি। ছোটোদের কথা ভেবে লেখা এই বইয়ের পাঠক হোক ছোটো-বড় সকলেই।
এই বই পড়তে লাগবে একটা ফোন বা ট্যাব, বা কম্প্যুটার বা ল্যাপটপ। সফট কপি হিসেবে প্রকাশ করে বৈদ্যুতিন মাধ্যমে এই বইকে সকলের কাছে পৌঁছে দেওয়াই আজব বইঘরের সকলের আজব মতলব! আজব বইয়ে কোনও আর্থিক মূল্য নেই। আপনারা স্বচ্ছন্দে সবরকম বৈদ্যুতিন মাধ্যমে এই বই সব পরিচিতর কাছে পৌঁছে দিতে পারেনচাইলে প্রিন্ট করে, বই আকারে বাঁধিয়ে নিতে পারেন, অন্যকে দিতে পারেন। একটাই অনুরোধ, ভেতরের কিছু বদল করবেন না। এটাই আজব বইঘরের একমাত্র শর্ত। আজব বই পড়ুন ও সকলকে পড়ান মনের আনন্দে।
ভুতোরামপ্রকাশ
(নামে-মাত্র) প্রকাশক, আজব বইঘর
ডিসেম্বর, ২০১৬

2 comments:

mmghosh said...

Wah!

m sayef said...

Dujon doctor babukei selam. Porer prokashonar jonne apekhai roilam.