Saturday, June 06, 2020

দুষ্টু-দুষ্টু গল্প




লকডাউন, তাই ঘরের মধ্যেই ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছি। আর ঘরের মধ্যেই বেড়াতে বেড়াতে হাঁপিয়ে যাচ্ছি। হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে পড়ছি, হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে ঘুমোচ্ছি, হাঁপিয়ে হাঁপিয়ে খাচ্ছি, আর খেয়ে খেয়ে মোটা হচ্ছি। ভালো ভালো খাবার পেলে না খেয়েও থাকা যায় না। তারিয়ে তারিয়ে খাই। খেয়ে শুয়ে শুয়ে ঘুমের চেষ্টা করি। ঘুমিয়ে ঘুমিয়ে স্বপ্ন দেখি। স্বপ্নেই দৌড়ে দৌড়ে খেলতে যাই। এমনিতেই রোজ খেলতে গেলে মা খালি না-না করে। বলে শুধু রবিবার রবিবার খেলতে যাবি। আর আজকাল খেলতে চাইলেই বলে, খবরদার, খবরদার – লকডাউন। খেলতে না গিয়ে গিয়ে আমি মোটা হয়ে যাচ্ছি। হাবভাবও কেমন বোকা বোকা হয়ে যাচ্ছে। খেলতে দেয় না বলে বাড়িতেই জোরে জোরে বল ছুঁড়ি। তাই দিদা সেদিন রাগ রাগ গলায় ডাকল। বলল, “দুম দুম করে বল ছুঁড়ছিস কেন? রোজ রোজ এত বকুনি খাস, শুধরোস না কেন?”
বললাম, “তোমরা শুধু শুধু বকো কেন?”
দিদা আরও রেগে গিয়ে বলল, “খালি মুখে মুখে তর্ক! মেরে মেরে মা বাবা শোধরাতে পারল না। আসলে তোর দাদুই তোকে মাথায় করে করে রেখে তোর ভবিষ্যৎ ঝাঁঝরা করে দিয়েছে।”
পরে মাকে জিজ্ঞেস করে জানলাম ঝাঁঝরা মানে ফুটো ফুটো। কোনও কিছুতে অনেক অনেক ফুটো থাকলে তাকে ঝাঁঝরা বলে। বড়দের কিছু কিছু কথা বুঝি না। কী কী করলে ভবিষ্যৎ ফুটো হবে? জানতে চেয়ে চেয়ে হাঁপিয়ে গেলাম, কেউ বলল না। জ্ঞানের কথা বলে বলে কানের পোকা নড়িয়ে দিল। তাই সব ছেড়ে ভাবতে বসলাম আর কী খারাপ খারাপ কাজ করা যায়? বড়োদের পাগল পাগল করে দিয়ে বেশ মজা লাগে।
অনেক ভেবে ভেবে ঠিক করলাম, একটু ঘুরে আসি। মাকে বললাম, সারাদিন পড়ে কেমন মাথা ভোঁ ভোঁ করছে। মা বিরক্ত হয়ে বলল, “খালি খালি অজুহাত। কোথায় টো টো করতে যাবি? তাড়াতাড়ি আসবি, তোর যা দেরি দেরি করা স্বভাব!”
পেছনের গেট দিয়ে বেরিয়ে চলে চলে এলাম খেলার মাঠে। বিকেল শেষ হচ্ছে, চারিদিক অন্ধকার অন্ধকার। ঝোপের মধ্যে টিপ-টিপ করে জ্বলছে অনেক জোনাকি। মনে হলো ধরে ধরে প্লাস্টিকের ব্যাগে করে বাড়ি নিয়ে যাই। রাত্তিরে ওরা জ্বললে ঘরটা আলো আলো হয়ে যাবে, কী মজা। ঘুরে ঘুরে জোনাকি ধরছি, আশেপাশে কী হচ্ছে দেখিনি। হঠাৎ শুনি, “অ্যাই, অ্যাই ছেলেটা... ওখানে কী হচ্ছে?”
চমকে তাকিয়ে দেখি একটা পুলিশ ড্যাব ড্যাব করে তাকিয়ে দেখছে। ওরে বাবা, রাস্তায় রাস্তায় পুলিশ টহল দিচ্ছে বটে, কিন্তু এখানে কেন? দেখি আবার হাত নেড়ে নেড়ে ডাকছে। ভয়ে ভয়ে এগিয়ে গেলাম। পুলিশটা বলল, “এখানে ঘুরঘুর করছ কেন?”
থলেটা তুলে দুলিয়ে দুলিয়ে বললাম, “জোনাকি ধরছি?”
পুলিশটা বলল, “জোনাকি ধরে ধরে ব্যাগে ভরছ?”
বললাম, “রাতে ঘরে ছেড়ে দেব, উড়ে উড়ে বেড়াবে আর জ্বলবে নিভবে।”
পুলিশটা মাথা নেড়ে নেড়ে বলল, “ঠিক করছ না, ওগুলো ছেড়ে দাও।”
কথা না শুনলে যদি হাতের লাঠি দিয়ে ধাঁই ধাঁই করে মারে? তাই একটা একটা করে ছেড়ে দিয়ে বাড়ি এলাম। পুলিশের গাড়িটা পেছন পেছন এল। মা বেরিয়ে এল দুম দুম করে। পুলিশ মা-কে বলল, “ছোটো ছোটো বাচ্চাকে এ সময়ে রাস্তায় ছাড়বেন না। জানেন না, ঘরে ঘরে বলা হয়েছে, লকডাউনে কেউ বেরোবে না?”
মা রাগে গনগন করতে করতে বলল, “একটা কথা শোনে না।”
পুলিশ হেসে বলল, “বাচ্চা বাচ্চা ছেলেরা কথা তো শুনবেই না।” তারপরে আমার দিকে তাকিয়ে মুখে মাস্ক পরতে পরতে বলল, “বাড়িতে থাকবে, বুঝলে?”
পুলিশের সামনে আমি গুডি গুডি বয়, তাই ঘাড় হেলালাম। পুলিশ জিজ্ঞেস করল, “স্কুলে স্কুলে তো ছুটি হয়ে গেছে - কোন ক্লাসে পড়? বড়ো হয়ে কী হবে?”
পুলিশকে খুশি করতে বললাম, “এখন ক্লাস ফোর, বড়ো হয়ে তোমার মতো পুলিশ হয়ে অ্যাত্তো অ্যাত্তো চোর ধরব।”
পুলিশটা হাসতে হাসতে বলল, “বেশ, তাই হবে। তার জন্য রোজ রোজ এক্সারসাইজ করতে হবে, আর বুদ্ধি বাড়াতে হবে। পড়াশোনাও করতে হবে অনেক অনেক।”
বললাম, “করব, করব।”
পুলিশ হেসে বলল, “ভেরি ভেরি গুড।”
চারিদিকে খালি ভাইরাস, ভাইরাস – তাই বাইরে যাওয়া বারণ। কিন্তু একটু একটু-ও বেরোন’ যাবে না শুনে মন খারাপ হলো। ঠিক করলাম, ভেবে ভেবে একটা রাস্তা বের করতে হবে যাতে বাইরে না গিয়েও মজা করা যায়।
পরদিন ভোর বেলা, কাকুর ঘরে গিয়ে খুঁজে খুঁজে বাইনোকুলারটা চুরি করলাম। কাকু আজকাল অফিসের কাজ রাত অবধি বাড়িতে করে বলে বেলা অবধি পড়ে পড়ে ঘুমোয়। চুপি চুপি নিজের বিছানার নিচে রেখে দিলাম। দুপুরে কাজ শেষ করে মা যখন ভোঁস ভোঁস করে ঘুমোচ্ছে, তখন ওটা নিয়ে ঘর থেকে বেরোলাম। পা টিপে টিপে ছাদে গেলাম। বাইনোকুলার ঘুরিয়ে ঘুরিয়ে ফোকাস করে হঠাৎ দেখি ওই দূরের ভাঙা বাড়িটার ঘরের মধ্যে কারা যেন নড়ছে। ওই বাড়িটা দেখলেই কেমন ভয় ভয় করে। আজ নড়াচড়া দেখে মনে মনে ভাবলাম কী ব্যাপার? এমনিতেই ওদিকটা ফাঁকা ফাঁকা। তাহলে ওখানে আজ কারা ঘুরে ঘুরে বেড়াচ্ছে?
ছাদের ধারে গিয়ে বাইনোকুলারটা দিয়ে অনেকক্ষণ তাকিয়ে তাকিয়ে দেখলাম। বুঝলাম, নড়াচড়া অনেক হলেও ওখানে দলে দলে লোক নেই। একটাই লোক যেন টুক টুক করে অনেক কাজ করেই চলেছে। অনেকক্ষণ দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে পায়ে ব্যথা হয়ে গেল, তাই নেমে এলাম। বেশি দেরি করলে সবাই ঘুম থেকে উঠে আমাকে ঘরে না পেয়ে হই হই করবে।
সারা রাত ভেবে ঠিক করলাম ব্যাপারটা বুঝতে গেলে ভোর ভোর গিয়ে দেখতে হবে। আমি আগে আগে ঘুম থেকে উঠি। তাই সকালে সময়টাও বেশি বেশি পাব। যেমন ভাবা, ঠিক তেমন তেমন করলাম। ঢুলু ঢুলু চোখ করে মাকে বললাম, খিদে পেয়েছে। মা অবাক হয়ে বলল, দেখেই ঘুমঘুম ভাব বুঝছি। খেয়েদেয়ে শুয়ে ভাবলাম, জোনাকিগুলো থাকলে ওদের আলোগুলো কী সুন্দর মিট মিট করত, তারপরে ঘুমিয়ে পড়লাম।
সকাল সকাল ঘুম ভেঙে দেখি সূর্য উঠেছে, কিন্তু বাড়িতে কেউ ওঠেনি। লকডাউনে সবাই দেরি দেরি করে গল্প করে, তাই আজকাল দিদাও দেরি করে ওঠে। বিছানার নিচ থেকে টেনে টেনে বাইনোকুলারটা বের করে এক দৌড়ে ছাদে। দরজার ওপরের ছিটকিনিটায় হাত যায় না বলে হেঁইয়ো হেঁইয়ো বলে ভারি টুলটা টেনে এনে ছিটকিনি খুললাম। তারপরে গুটি গুটি পায়ে হাজির হলাম ছাদের আলসের কাছে। বসে বসে বাইনোকুলার দিয়ে দেখলাম। আজও লোকটা ওখানে ঘুরঘুর করছে। কিন্তু আজ বাইনোকুলার তাক করেই আমার বুকটা ধড়াস ধড়াস করতে লেগেছে। কাল দুপুরে রোদ্দুর আমার সামনে থেকে ছিল বলে ঘরের ভেতরগুলো আধো আধো দেখতে পাচ্ছিলাম। কিন্তু সকালের রোদ্দুরে ভাঙা বাড়ির ঘরের ভেতরগুলো ঝকঝক করছে। সেই ঘরে খাঁচায় খাঁচায় অজস্র পাখি। কত রঙের পাখি, সব চকচক করছে! পাখিগুলো ডানা ফটফট করছে আর লোকটা ওদের খেতে দিচ্ছে। একটা ভাঙা বাড়িতে এত এত পাখি কেন? আমার বুকটা কেমন উত্তেজনায় দুর দুর করে উঠল। নিচে নেমে এলাম আস্তে আস্তে। আর ওমনি কাকা বাথরুম যাবে বলে চোখ ডলতে ডলতে বেরিয়েছে আর আমার হাতে বাইনোকুলার দেখে ফেলেছে।
আর যাবে কোথায়, সবাই বকতে বকতে ছুটে এসেছে। আমি যত বলি, “শোনো, শোনো, আমি কী দেখেছি,” কেউ কথাই বলতে দেয় না। মা টেনে টেনে নিয়ে গেছে পড়তে বসাতে। আমি পড়ছি, আর কান খাড়া রেখেছি, রাস্তায় কখন পুলিশের জিপ-এর ইঞ্জিনের গরগর শব্দ পাই। শেষে, অপেক্ষা করতে করতে প্রায় সকাল দশটার সময় জিপের শব্দ পেলাম। তড়াক করে খাট থেকে নেমে, ছুটে বাইরের দরজা খুলে বেরিয়ে গেছি, পেছনে মা, “ওরে, দাঁড়া, দাঁড়া, কোথায় যাচ্ছিস...” বলে ছুটছে।
গেটের বাইরে পুলিশের গাড়ি, ওরা সবাই এদিকেই চেয়ে চেয়ে দেখছে। আমি চেঁচিয়ে বলেছি, “পুলিশ কাকু, থামো, থামো...”
গেট-টা পেরিয়ে গাড়িটা ঘ্যাঁচ করে দাঁড়িয়ে আবার ব্যাক করেছে ভস ভস করে ধোঁয়া ছাড়তে ছাড়তে। পুলিশ কাকু জিপ থেকে নামতে নামতে বলল, “কী হয়েছে? আবার ছুটে ছুটে বেড়াচ্ছ?”
পাছে মা-বাবা আবার টানতে টানতে নিয়ে যায়, তাই আমি তাড়াতাড়ি বলতে শুরু করে দিলাম। বললাম, “কাকু, ওই দূরের ভাঙা বাড়িতে এত্তো এত্তো রঙিন পাখি। ওদের খাঁচায় খাঁচায় ভরে রেখেছে একটা লোক। কিন্তু বাড়িটাতে তো কেউ থাকে না, বছর বছর খালি পড়ে আছে... তাই...”
তখন সবাই বক বক বন্ধ করে আমার দিকে চেয়ে আছে। পুলিশ কাকু ভুরু কুঁচকে বলল, “তুমি আবার বেড়াতে বেড়াতে ওখানে গেছিলে নাকি?”
আমি বললাম, “দেখবে এসো, কাকুর দূরবীণ দিয়ে ছাদ থেকে সাফ সাফ দেখা যাচ্ছে।”
পুলিশ কাকু হাঁটতে হাঁটতে আমাদের সামনে একটু ঘুরল। তারপরে বলল, “না, এই লকডাউনের সময়ে তোমাদের বাড়ির ঘরের ভিতরে ভিতরে আমরা হাঁটাহাঁটি করব না। বরং হু হু করে জিপ চালিয়ে ওই ভাঙা বাড়িটায় চলে যাই।”
আমিও আবার ছুটে ছুটে ছাদে যেতে গেছি, বাবা ঝপ করে আমাকে কোলে তুলে নিয়েছে। আমি কত্তো ভ্যাঁ ভ্যাঁ করে কাঁদলাম, ছাড়লই না। কেবল কাকু একা একা বাইনোকুলার নিয়ে দেখে এসে বলল, পুলিশ গিয়েছে কিন্তু আর কিচ্ছু বোঝা যায়নি।
আমি দুপুরে খেলাম না, কেঁদে কেঁদে ঘুমিয়ে পড়লাম। সন্ধেবেলা বসে বসে টিভিতে কার্টুন দেখছি, এমন সময় বাইরের রাস্তায় পুলিশের জিপ দাঁড়ানোর শব্দ পেলাম। সবাই মিলে দরজা খুলে বাগানে গিয়ে দেখি পুলিশ কাকু বাইরে দাঁড়িয়ে দাঁড়িয়ে হাসছে। বলল, “দারুণ দারুণ সব ব্যাপার হলো। ওরা পাখি চুরি করে করে আনছিল পাখি বাজার থেকে। এই লকডাউনে সব বন্ধ বলে রোজ রোজ রাতে ওরা পাখি বাজার থেকে চুরি করে নিয়ে আসত এখানে।”
বাবা বলল, “কিন্তু রাস্তায় পুলিশ খপ খপ করে ধরত না?”
পুলিশ কাকু বলল, “আরে, ভীষণ ভীষণ চালাক ওরা। একটা ভ্যান নিয়ে তাতে সাদা সাদা রং লাগিয়ে অ্যামবুলেনস লিখে রেখেছিল। ভোর ভোর নিয়ে আসত। পরে পাখি মালিকরা খেতে দিতে গিয়ে দেখত বাজারে থরে থরে খালি খাঁচা পড়ে আছে, পাখি নেই। ওরা রোজ রোজ থানায় যেত, কিন্তু কিছুই হত না।”
তারপরে টেরিয়ে টেরিয়ে আমাকে দেখে বলল, “লকডাউন উঠে যাক, তুমি প্রাইজ পাবে। ওরা মহা দুষ্টু, অনেক দিন ধরে আমরা তক্কে তক্কে ছিলাম কবে বাগে পাই। গুড, গুড, ভেরি গুড।” বলে জুতোয় খট খট শব্দ করে পুলিশরা আমাকে স্যালুট করল। আমি মার কোলে মুখ ঢুকিয়ে লুকিয়ে লুকিয়ে দেখলাম, ওরা সবাই গাড়ি করে চলে গেল।

1 comment:

m sayef said...

DOCTOR SAB
GOLPO GULO PORLAM, BHALO LEGECHE.